এন৯৫ মাস্ক বিতর্কের নেপথ্যে

Send
বাংলা ট্রিবিউন ডেস্ক
প্রকাশিত : ২৩:১৮, এপ্রিল ২১, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:০৩, এপ্রিল ২৩, ২০২০

এন৯৫ মাস্কস্বাস্থ্য অধিদফতরের আওতাধীন কেন্দ্রীয় ঔষধাগারে (সিএমএসডি) সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীর ভুলে এন৯৫ মাস্কের মোড়কে সাধারণ মাস্ক চলে যায়। করোনাভাইরাসের কারণে তড়িঘড়ি বিভিন্ন হাসপাতালে সেই মাস্কই সরবরাহ করে সিএমএসডি। কিন্তু এন৯৫-এর মোড়কে সাধারণ মাস্ক পাওয়ার বিষয়ে অভিযোগ ওঠার পরপরই সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয় সিএমএসডি। স্বল্প সময়ের ব্যবধানে অনিচ্ছাকৃত ভুলের জন্য ক্ষমা চেয়ে নিজেদের সরবরাহ করা প্রায় সব পণ্যই ফেরত নেয় জেএমআই গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান জেএমআই হসপিটাল রিকুইজিট ম্যানুফ্যাকচারিং লিমিটেড। যেসব পণ্য সরবরাহ করা সম্ভব হয়নি সেগুলো সাধারণ মাস্ক হিসেবে ব্যবহার করতে হাসপাতালগুলোকে চিঠি দিয়ে জানিয়ে দেয় সিএমএসডি।

কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু ব্যক্তি ও গোষ্ঠী গত সপ্তাহ থেকে বিষয়টিকে অতিরঞ্জিত করে উদ্দেশ্যমূলক ও ভিত্তিহীন তথ্য ছড়িয়ে দেয়। এ কারণে বিভ্রান্তিমূলক সংবাদ প্রকাশ করে দুয়েকটি সংবাদমাধ্যম। তাই চলমান কঠিন পরিস্থিতিতে সামনের সারির যোদ্ধা, চিকিৎসক ও নার্সদের মধ্যে ভীতি ও আস্থাহীনতার সৃষ্টি হয়েছে; যা দেশের করোনা পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার অন্তরায় হিসেবে কাজ করছে। এ অবস্থায় সরকারি হাসপাতালগুলোতে সরবরাহ করা মাস্ক নিয়ে অসত্য তথ্য প্রচার বা অপপ্রচার বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে সিএমএসডি। এর ব্যতিক্রম হলে ‘ডিজিটাল তথ্য আইন’ অনুযায়ী মামলা করা হবে বলেও হুঁশিয়ার দিয়েছে সরকারি সংস্থাটি। আর অসত্য তথ্য প্রকাশ করে প্রতিষ্ঠানের সুনাম ক্ষুণ্ণ না করার অনুরোধ জানিয়েছে জেএমআই গ্রুপ।

সিএমএসডি'র বক্তব্য
‘এন৯৫ মাস্ক বিষয়ে প্রকাশিত সংবাদের প্রতিবাদ’ শিরোনামে গত ১৭ এপ্রিল এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘সিএমএসডি বর্তমান কোভিড-১৯ বৈশ্বিক দুর্যোগকালে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারি ক্রয় আইন অনুযায়ী পুরো প্রক্রিয়া অনুসরণ করছে। অথচ বিভ্রান্তিমূলকভাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী, স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ছেলে, স্বাস্থ্যসেবা সচিব ও স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালককে জড়িয়ে মানহানিকর সংবাদ প্রকাশিত হচ্ছে। সিএমএসডি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় চলতে চায়, এই ক্রয় প্রক্রিয়ায় উপরোক্ত ব্যক্তিবর্গের কোনও সংশ্লেষ নেই এবং তাদের আর্থিক বা অন্যান্যভাবে লাভবান হওয়ার কোনও সুযোগ নেই।’

সিএমএসডি মনে করে, এ ধরনের খবর পরিবেশনকে রাজনৈতিক ও চরিত্রগত রটনার অবকাশ। তাই এমন সংবাদ পরিবেশন থেকে বিরত থাকার জন্য ‘হুঁশিয়ার’ করা হয়েছে। সংস্থাটির পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. শহিদ উল্লাহ স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘সিএমএসডি কোনও দেশীয় চিকিৎসা সামগ্রী প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে এন৯৫ মাস্ক সরবরাহের জন্য কার্যাদেশ দেয়নি। দেশে চিকিৎসা সামগ্রী প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান জেএমআই করোনা সংক্রমণের আগে থেকেই সিএমএসডিতে হ্যান্ড গ্লাভস, স্যানিটাইজার, সাধারণ মাস্ক সরবরাহ করে আসছে। জেএমআই যে মোড়কে সাধারণ মাস্ক সরবরাহ করেছিল সেগুলোতে এন৯৫ লেখা ছিল। সিএমএসডি ভুলে সাধারণ মাস্ক হিসেবেই পণ্যগুলো সরবরাহ করে। বিষয়টি প্রথমে নজরে আসে। পরে সেগুলো জেএমআইকে ফেরত দেওয়া হয়। সেই সঙ্গে লিখিত জবাব চাওয়া হয়, কেন তারা এই কাজ করলো? প্রতিষ্ঠানটি তাদের ভুলের ব্যাখ্যা দেয়, যা সিএমএসডির পরিচালক গণমাধ্যমে সরাসরি ব্যাখ্যা করেছেন। সিএমএসডি কর্তৃপক্ষ মনে করে, বিষয়টি সেখানেই শেষ হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু পরে এ নিয়ে ফের স্বাস্থ্যখাতের ঊর্ধ্বতনদের জড়িয়ে সংবাদ প্রকাশ ‘রটনার’ অংশ বলে মনে করে সংস্থাটি।

২১ এপ্রিল আরেকটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে সিএমএসডি। এতে বলা হয়, ‘সিএমএসডির ক্রয় ও সরবরাহ প্রক্রিয়ার বাইরে অনুমোদনহীন ও নিম্নমানের সরবরাহকৃত চিকিৎসা সামগ্রীর উৎস সম্পর্কে সঠিক তথ্য সংগ্রহ না করে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বানোয়াট, কাল্পনিক ও ভিত্তিহীন সংবাদ পরিবেশন করে আসছে। নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে তথ্য সংগ্রহ না করে সংবাদ পরিবেশন দুঃখজনক ও মানহানিকর এবং তথ্য আইনে অপরাধ।’

কী বলছে জেএমআই
এদিকে এন৯৫ মাস্ক বিতর্ক নিয়ে মুখ খুলেছেন জেএমআই গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক। সংবাদকর্মীদের উদ্দেশে নিজের প্রতিষ্ঠানের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে এক ভিডিও বার্তায় তিনি জানান, ২১ বছর ধরে সুনামের সঙ্গে দেশে ব্যবসা করছে জেএমআই। তার প্রতিষ্ঠানে উৎপাদিত মেডিক্যাল ডিভাইস ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকাসহ ৩১টিরও বেশি দেশে নিয়মিত রফতানি হচ্ছে। বর্তমানে জেএমআই গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ফার্মাসিস্ট, কেমিস্ট, মাইক্রোবায়োলজিস্ট, বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারসহ মোট সাত হাজারেরও বেশি কর্মকর্তা-কর্মচারী কাজ করছে। বিগত বছরগুলোতে সুনাম ও স্বচ্ছতার সুবাদে জেএমআই গ্রুপের ১০টি অঙ্গ প্রতিষ্ঠানে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, তুরস্ক ও চীন থেকে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) এসেছে।

এন৯৫-এর মোড়কে সাধারণ মাস্ক সরবরাহ প্রসঙ্গে জেএমআই গ্রুপের এমডি বলেন, ‘গবেষণার মাধ্যমে উন্নয়নের পর বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানের পণ্য এদেশে উৎপাদন করে জেএমআই। উৎপাদিত পণ্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের মান সনদ পেলে তবেই বাজারজাত করি আমরা।’

এর ধারাবাহিকতায় এন৯৫ মানের মাস্ক তৈরির প্রক্রিয়া শুরু করে জেএমআই। তাদের দাবি, করোনাভাইরাসের কারণে বৈশ্বিক অচলাবস্থা তৈরি না হলে এতদিনে চূড়ান্ত পর্যায়ে থাকতো এই উদ্যোগ। মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাকের কথায়, ‘যেকোনও নতুন পণ্য গবেষণা ও উন্নয়ন (আরঅ্যান্ডডি) পর্যায়ে থাকা অবস্থায় কার্টুন, প্যাকেট, লিফলেট ইত্যাদি তৈরির মতো সাপ্লাই চেইনের কাজ আগাম করে রাখি আমরা। পণ্য উৎপাদনের পর বাজারজাতের সনদ ও অনুমতি পাওয়ার পরপরই সরবরাহ করার সুবিধার্থে এসব ব্যবস্থা রাখা হয়। তবে কোনও কারণে পণ্য সরবরাহের অনুমতি না পেলে এসব কার্টুন কিংবা মোড়ক আমরা ধ্বংস করে ফেলি।’

জেএমআই গ্রুপের এমডি পুরো ভুলের চিত্র তুলে ধরেন এভাবে– “আমাদের এন৯৫ মাস্ক উৎপাদন আরঅ্যান্ডডি পর্যায়ে থাকলেও এক দশকেরও বেশি সময় ধরে আমরা সার্জিক্যাল বা অন্যান্য সাধারণ মাস্ক প্রস্তুত করে আসছি। এরই অংশ হিসেবে সিএমএসডির মোট ৫০ লাখ পিস চাহিদার বিপরীতে ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি থেকে প্রতিদিন সার্জিক্যাল মাস্ক সরবরাহ করছি, যা এখনও চলমান আছে। এক্ষেত্রে বলতে চাই, করোনাভাইরাসের কারণে সারাদেশে সাধারণ ছুটি ঘোষণার পর আমাদের প্রতিষ্ঠানের গুদামের নিয়মিত দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা কোভিডে আক্রান্ত হওয়ার ভয়ে অফিসে যোগ দেননি। উল্টোদিকে মাস্ক সরবরাহে সিএমএসডির চাহিদা বৃদ্ধি পায়। এ অবস্থায় সাধারণ কর্মচারীরা গুদাম থেকে মাস্ক সরবরাহ করতে থাকে। তারাই আরঅ্যান্ডডির জন্য প্রস্তুত রাখা এন৯৫ মাস্কের মোড়কে ২০ হাজার ৬০০ পিস সাধারণ মাস্ক সরবরাহ করে। এটি আমরা তখন টের পাইনি। এমনকি যে বিল আমরা দাখিল করেছি, তাতেও কোথাও এন৯৫ মাস্কের কথা উল্লেখ নেই। অর্থাৎ আমরা এন৯৫ মাস্কের ক্রয়াদেশ যেমন পাইনি সিএমএসডির কাছ থেকে, তেমনই আমরা এন৯৫ হিসেবে কোনও মাস্ক সিএমএসডির কাছে বিক্রিও করিনি। মুগদা হাসপাতালের অভিযোগের ভিত্তিতে সিএমএসডি থেকে আমাদের কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়ার পর আমরা বিষয়টি টের পাই। তাৎক্ষণিকভাবে অনাকাঙ্ক্ষিত ভুলের জন্য ক্ষমা চেয়ে আমাদের সরবরাহ করা এন৯৫ মোড়কে থাকা প্রায় সব মাস্ক ফেরত নিয়েছি। অল্প কিছু বিভিন্ন হাসপাতালে চলে যাওয়ায় সেগুলো সাধারণ মাস্ক হিসেবে ব্যবহার করতে নির্দেশ দেয় সিএমএসডি। তাই একটি কথা স্পষ্ট করে বলতে চাই, জেএমআইয়ের সরবরাহ করা মাস্ক ‘এন৯৫ মাস্ক’ হিসেবে ব্যবহার করে কোনও স্বাস্থ্যকর্মী করোনা আক্রান্ত রোগীকে চিকিৎসা দেয়নি। সুতরাং জেএমআই এক্ষেত্রে কোনও ধরনের দুর্নীতির আশ্রয় নেয়নি। যা হয়েছে তা কেবল কিছু কর্মীর ভুলেই হয়েছে। এজন্য যারা দায়ী তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।”

জেএমআইয়ের বিরুদ্ধে ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের ৭০ ভাগ কার্যাদেশ পাওয়ার অভিযোগের প্রতিক্রিয়ায় প্রতিষ্ঠানটির এমডি বলেন, ‘আমরা যথযথ দরপত্র মেনে সব কাজ করে থাকি। সিএমএসডিতে সব কাগজপত্র আছে। আপনারা চাইলে যাচাই করে দেখতে পারেন। আমরা সর্বোচ্চ ২-৩ শতাংশ কাজের আদেশ পেয়েছি, তাও যথাযথ দরপত্র প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই।’

মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাকের দাবি, ‘পুরো ঘটনাকে সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যমূলকভাবে অতিরঞ্জিত করা হচ্ছে। তার প্রমাণ ব্যবসায়িক পরিচয়ের বাইরে কোনও রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আমার যোগাযোগ না থাকার পরও একটি বিতর্কিত রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সঙ্গে আমাকে জড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে বিভিন্ন মাধ্যমে। বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকে আজ পর্যন্ত আমার যারা বন্ধু আছেন, তারা সবাই প্রগতিশীল রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। কেউ তাদের সঙ্গে কথা বলে এর প্রমাণ পাবেন।’

শুধু ব্যবসায়িক সুনাম ক্ষুণ্ণ করতেই একটি গোষ্ঠী জেএমআই গ্রুপের বিরুদ্ধে গুজব ছড়াচ্ছে বলে মনে করেন প্রতিষ্ঠানটির এমডি। তার অনুরোধ, ‘দেশে ও দেশের বাইরে সবাই সত্য জানুন, সত্য প্রচার করুন।’
* জেএমআই গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাকের ভিডিও বার্তা:

/জেএইচ/

লাইভ

টপ