‘মৃত বাবার সন্তানের চোখে যে প্রশ্ন, তার জবাব হয় না’

Send
জাকিয়া আহমেদ
প্রকাশিত : ১৭:৫৬, জুন ২৬, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ০৮:২৪, জুন ২৮, ২০২০

পবন দাসের মৃতদেহের পাশে তার ছেলে ও ডাক্তার নিজামএকজন চিকিৎসক কখনোই চান না তার রোগী মারা যাক। তারপরেও সবকিছু আমাদের নিয়ন্ত্রণে থাকে না। তবে যে বাবাকে বহুদূর থেকে কিশোর সন্তান কোলে করে হাসপাতালে পৌঁছান, সে বাবা মারা গেলে সন্তানের চোখে যে প্রশ্ন থাকে, তার কোনও জবাব হয় না। কথাগুলো ডা. নিজাম উদ্দিনের।

সম্প্রতি করোনা উপসর্গ নিয়ে মুমূর্ষু এক রোগীকে বাঁচাতে চেষ্টা চালিয়ে আলোচনায় আসেন ডা. নিজাম। নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কর্মরত এ চিকিৎসক উপজেলার করোনার ফোকাল পার্সন হিসেবে কাজ করছেন গত মার্চ থেকে।

ওই রোগীর মৃত্যুর পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি ছবি ভাইরাল হয়ে যায়। যেখানে দেখা যায়, একজন মারা যাওয়া মানুষের পাশে হাত-পা ছড়িয়ে অসহায় অবস্থায় বসে আছেন পিপিপি পরা একজন চিকিৎসক। স্বাস্থ্য ব্যবস্থার নানা ভঙ্গুর চিত্রের উদাহরণের পাশাপাশি আলোচনায় উঠে আসেন সে চিকিৎসক, কী হয়েছিল সেদিন। কেনই বা তিনি এভাবে বসেছিলেন।

মোবাইল ফোনে কথা হয় চিকিৎসক নিজামের সঙ্গে। স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করে ৩৯তম বিসিএসে উত্তীর্ণ হয়ে তিনি ২০১৯ সালের ১২ ডিসেম্বর হাতিয়াতে যোগ দেন। চাকরি জীবনের শুরুতেই প্যান্ডেমিক মোকাবিলা করার মতো অভিজ্ঞতা হচ্ছে তার। তাতে বিচিত্র অভিজ্ঞতার পাশাপাশি রয়েছে সেদিন পবন দাসের মৃত্যুর মতো অভিজ্ঞতা। যা হয়তো সারা জীবন মনে থাকবে তার।

হাতিয়ার মতো একটা দ্বীপে কাজ করার অভিজ্ঞতা কেমন জানতে চাইলে ডা. নিজাম উদ্দিন বলেন, খুব টাফ, প্রকৃতির সঙ্গে বসবাস করা মানুষগুলো প্রকৃতির সারল্য নিয়ে বেড়ে ওঠে, এতটাই সরল যে, তারা লক্ষণ নিয়ে ঘুরে বেড়ায়, কিন্তু নমুনা দেয় না। পুলিশ, নেভির সহযোগিতায় আমরা গিয়ে বাড়ি থেকে নমুনা নিয়ে আসতাম অথবা ধরে নিয়ে আসতাম। দুর্গম একটা এলাকাতে এসব পরিস্থিতি মোকাবিলা করেই চলতে হচ্ছে।

জানালেন, দ্বীপ এলাকা হাতিয়ায় দুই দিন করোনার নমুনা সংগ্রহ করা হয়। যেদিন নমুনা সংগ্রহ করা হয়, সেদিন পাঠানো যায় না। পরের দিন ট্রলার কিংবা স্পিডবোটে করে পরীক্ষার জন্য নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠানো হয়।

পবন দাসের মৃত্যুর বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সেদিন ছিল মঙ্গলবার (২৩ জুন), নমুনা নেওয়ার দিন। সারা দিন নমুনা নেওয়ার পর তার আগের শনিবারের নমুনার রিপোর্ট আসে, তাতে তিন জন পজিটিভ হন। সে সুবাদে প্রশাসনের সহযোগিতায় পজিটিভ হওয়া রোগীদের বাড়ি লকডাউনের কাজ করি, রোগীদের ওষুধ নিয়ে বাড়ি যাই।

পবন দাসের মরদেহের পাশে অসহায় অবস্থায় হাত-পা ছড়িয়ে বসে পড়েন ডাক্তার নিজামসংবাদ আসে করোনা পজিটিভ তিন জনের মধ্যে একজনের শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। প্রায় ২০ কিলোমিটার রাস্তা পার হয়ে সেখানে যাওয়ার পর দেখা গেল রোগীর অক্সিজেন সেচুরেশন ৩৫ শতাংশ। রোগীর এ অবস্থা দেখে একজন চিকিৎসকের রিঅ্যাকশন কী হতে পারে সেটা কেবল সংশ্লিষ্টরাই বুঝবেন। সঙ্গে সঙ্গে অ্যাম্বুলেন্স চালককে বললাম হাসপাতাল থেকে অক্সিজেন সিলিন্ডার নিয়ে যাওয়ার জন্য। সিলিন্ডার পাবার পর তাকে অক্সিজেন দেওয়া হয়, সেচুরেশন বাড়লো। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে অক্সিজেন দিলে তার অবস্থা ঠিক থাকলেও অক্সিজেন খুলে নিলে সেচুরেশন কমে যাচ্ছে, শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। পরে তাকে হাসপাতালে নিয়ে এলাম। হাসপাতালে এসেও তার চিকিৎসা নিয়ে বেগ পেতে হয়েছে। কেবল হেলথ ইন্সপেক্টর জাফরুল আমিন মন্টু ছিলেন আমার সঙ্গে পুরো প্রক্রিয়াতে। আর অফিস সহকারী ছিলেন টুকটাক কাজের জন্য, এই তিন জন মিলেই রোগীকে নিয়ে পুরো ঝক্কির কাজটা করছিলাম, আর কেউ ভয়ে কাছে আসছিলেন না। এই রোগী নিয়ে যুদ্ধ করতে করতে বেজে যায় রাত ১১টা।

ডা. নিজাম বলেন, সারা দিনের ক্লান্ত শরীর যখন বিছানায় এলিয়ে পড়তে চাইছে, তখনই অফিস সহকারী ফোন করে আমাকে জানান, তীব্র শ্বাসকষ্ট নিয়ে একজন রোগী আসতেছেন। তার আট-দশ দিন ধরে জ্বর, কাশি। আগে শ্বাসকষ্ট না থাকলেও এখন হচ্ছে। অফিস সহকারী ফোনেই বললেন, তাকে আগেও নমুনা দেওয়ার জন্য বলা হয়েছিল, কিন্তু তিনি রাজি হননি। কথা বলেই নিচে নামার সঙ্গে সঙ্গে আমার সাব স্টেশন কমিউনিটি মেডিক্যাল অফিসার বলেন, স্যার একজন রোগী এসেছে, দেখতে হবে। আমি ভেবেছি জরুরি বিভাগে হবে যথারীতি। কিন্তু তিনি জানালেন রাস্তায়। রাস্তায় দৌড়ে গিয়ে দেখি, ১৯ থেকে ২০ বছরের একটা ছেলের কোলে বয়স্ক একজন মানুষ, চোখ বন্ধ করে আছে। বোঝা যাচ্ছে না বেঁচে আছেন, নাকি মারা গেছেন।

ওই রোগীই পান বিক্রেতা পবন দাস। তার স্বজনদের থেকে শুনলাম শ্বাসকষ্ট হচ্ছে বিকাল থেকেই, এতটা পথ হেঁটে এলেও হাসপাতালের সামনে এসে পড়ে গেছেন। বুঝলাম কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হয়ে গেছে, চেষ্টা করলাম প্রথমেই তাকে ধরে ভেতরে নিয়ে আসার জন্য। পাশে কিন্তু অনেক মানুষ ছিলেন, কিন্তু কাছে আসছিলেন না। আমি আর তার ছেলে মিলে চেষ্টা করলাম, কিন্তু পারলাম না। পরে তাকে মাটিতে শুইয়ে সিপিআর (কার্ডিও-পালমোনারি রিসাসিটেশন-সিপিআর, জীবন রক্ষাকারী চিকিৎসা কৌশল) দেওয়া শুরু করলাম। কিন্তু সিপিআর দিতে হলেও অন্তত দুই জন দরকার। কিন্তু ক্লান্ত শরীর নিয়ে আমি প্রায় ১৫ থেকে ২০ মিনিট সিপিআর দিলাম, একসময় আমার শ্বাস নিতে কষ্ট শুরু হয়। একইসঙ্গে এন-৯৫, গগলস, পিপিই- সবকিছু মিলিয়ে আমি ভীষণভাবে ক্লান্ত হয়ে যাই। বুঝতে পারছিলাম অক্সিজেনের অভাব হচ্ছে, শক্তি পাচ্ছিলাম না।

ডা. নিজামতিনি আরও বলেন, ‘সিপিআর দেওয়ার পর দেখতে পাচ্ছিলাম তার পালস ব্যাক করছে, অক্সিজেন বাড়ছে…। কিছুটা আশার আলো দেখলাম, রোগী ব্যাক করছে, তাকে বাঁচানো সম্ভব। ইনজেকশন আনার জন্য বললাম, কিন্তু ততক্ষণে আমি ভীষণ ক্লান্ত, অসহায়ের মতো বসে পড়লাম। তার কিশোর ছেলে অজিত দাস পার্থ। এতক্ষণ দেখছিলো, সে আমার মতো করে বাবাকে সিপিআর দেওয়ার চেষ্টা করছে, আমি বসে পড়লেও চোখ খোলা, দেখতে পাচ্ছি সবকিছু। হঠাৎ করেই দেখতে পেলাম, রোগীর চোখ স্থির হয়ে গেল, মুখ দিয়ে ফেনা বের হচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে পালস চেক করলাম…পেলাম না, অক্সিজেন সেচুরেশন নাই। কিন্তু তার সঙ্গে যে আত্মীয়রা এসেছিলেন, সবাই পালিয়ে গেলেন। দাঁড়িয়ে ছিলেন হাসপাতালের কয়েকজন আর আমরা।

কিশোর ছেলেটা যখন দেখলো, আমি হাত-পা ছড়িয়ে দিয়ে বসে গেছি, সে আমার দিকে তাকালো। ছেলেটা কিন্তু তখনও বাবাকে বাঁচানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে, আমার দিকে তাকাতেই তাকে থামার জন্য ইশারা করলাম, তিনি আর নেই। …ছেলেটা আমার দিকে শূন্য দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে থাকলো…। আমি পারিনি, মানুষটাকে ধরে রাখতে। যে কিশোর ছেলেটা তার বয়স্ক বাবাকে এতটা পথ পেরিয়ে চিকিৎসার জন্য নিয়ে এলো, সেই বাবা মারা যাবার পর তার চোখের প্রশ্নের জবাব দেওয়া যায় না।’

সে সময়ের পরিস্থিতি বোঝাতে ডা. নিজাম বলেন, ‘বাবাকে সিপিআর দিতে দিতে অজিত আমার পাশে বসে একবার শুধু জিজ্ঞেস করলো, বাবা কি নেই…? অনেকক্ষণ চুপ করে থাকার পর বললাম নেই। … তখনই সবচেয়ে বড় হতাশা ঘিরে ধরলো, এতগুলো মানুষ এখানে ছিল, কেউ কাছে এগিয়ে এলো না…। ওদিকে অজিতের মায়ের মাতম…সবকিছু মিলিয়ে সে রাত…।’

ওই অবস্থাতেই পবন দাস ও তার ছেলের নমুনা সংগ্রহ করা হয় বলে জানান তিনি। তবে রেজাল্ট এখনও পাওয়া যায়নি।

/টিটি/এমওএফ/

লাইভ

টপ