অর্থ লোপাট করতেই উত্তরা হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজে অবৈধভাবে অধ্যক্ষ নিয়োগ!

Send
এস এম আববাস
প্রকাশিত : ১৯:০৭, জুলাই ১৩, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:০৯, জুলাই ১৩, ২০২০

অর্থ লোপাট করতেই সরকারি পরিপত্র লঙ্ঘন করে অধ্যক্ষ নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল উত্তরা হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজে। শুধু তাই নয়, নিয়োগ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হলেও ফেল করা প্রার্থীকে নিয়োগের জন্য মনোনীতও করা হয়। তদন্ত প্রতিবেদন ও অভিযোগ সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
সূত্রমতে ২০১৬ সালে অধ্যক্ষ নিয়োগের প্রক্রিয়া হাতে নেয় রাজধানীর উত্তরা স্কুল অ্যান্ড কলেজ কর্তৃপক্ষ। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত এমপিওভুক্ত। তাই ২০১৬ সালের ৪ সেপ্টেম্বর অধ্যক্ষ নিয়োগ না নেওয়ার জন্য নির্দেশ দেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। নির্দেশে বলা হয়, একাদশ ও দ্বাদশ এমপিওভুক্ত না হওয়ায় অধ্যক্ষ নিয়োগ জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা অনুযায়ী বিবেচ্য নয়। যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা অনুযায়ী এমপিওভুক্ত অংশের (মাধ্যমিক) জন্য একজন প্রধান শিক্ষক নিয়োগের নির্দেশ দেওয়া হয় ওই আদেশে।


কিন্তু ২০১৯ সালে গভর্নিং বডির সভাপতি মো. আফসার উদ্দিন খান আবার নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করেন। আনুষ্ঠানিকতা শেষে ওই বছর ৪ মে নিয়োগ পরীক্ষা নিয়ে অবৈধভাবে অধ্যক্ষ নিয়োগ দেওয়া হয়।
নিয়োগ পরীক্ষার ফলাফলে দেখা গেছে অধ্যক্ষ মো. হাফিজুর রহমান মোল্লা লিখিত পরীক্ষায় ৫০ নম্বরের পরীক্ষায় মাত্র ১০ নম্বর পেয়েছেন। অথচ ২০ নম্বরের মৌখিক পরীক্ষায় ১৬ নম্বর দেওয়া হয়েছে তাকে। তারপরও পাসের জন্য ৩৩ নম্বর পাননি তিনি। ২৬ নম্বর পেয়ে তিনি ফেল করেছেন নিয়োগ পরীক্ষায়।
ফেল করার পরও গভর্নিং বডির সভাপতি ও প্রভাবশালীদের চাপে নিয়োগ কমিটি প্রতিষ্ঠানের ব্যয়ে অধ্যক্ষ নিয়োগের জন্য মো. হাফিজুর রহমান মোল্লাকে সুপারিশ করে ২০১৯ সালের ৪ মে। নিয়োগ পরীক্ষার পরদিন ৫ মে অধ্যক্ষ হিসেবে তাকে নিয়োগ দেন গভর্নিং বডির সভাপতি সভাপতি। নিয়োগের দিনই অধ্যক্ষ হিসেবে কলেজে যোগদান করেন হাফিজুর রহমান মোল্লা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে অধ্যক্ষ মো. হাফিজুর রহমান বলেন, ‘আমাকে নিয়োগ দিয়েছে গভর্নিং বডি। আমি তো প্রার্থী ছিলাম। এ বিষয়ে গভর্নিং বডির সভাপতি ভালো বলতে পারবেন। ’ গভর্নিং বডির সভাপতি মো. আফসার উদ্দিন খানের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ডিজি অফিস নিয়োগ দিয়েছেন। নিয়োগ বোর্ডে ডিজির প্রতিনিধি ছিলেন ডিরেক্টর।’

নিয়োগ পাওয়ার পর উচ্চ আদালতের নির্দেশ ও সরকারি বিধিবিধান অমান্য করে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ফি আদায়সহ নানা আর্থিক দুর্নীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন বলে অভিযোগ ওঠে।
প্রতিষ্ঠানটির এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক সোহেল সরকার ২০১৯ সালের ১৮ ডিসেম্বর ঢাকার জেলা প্রশাসকের কাছে এবং ২৯ ডিসেম্বর ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের কলেজ পরিদর্শকের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন। অভিযোগে তিনি উল্লেখ করেন ,বিনা রশিদে ১ হাজার ৫৩ জন এসএসসি পরীক্ষার্থীর কাছ থেকে তিন হাজার করে ৩১ লাখের বেশি (৩১ লাখ ৫ হাজার ৯০০) টাকা উত্তোলন করেন অধ্যক্ষ। শিক্ষার্থীপ্রতি ১ হাজার ৯৭০ টাকা আদায় লিখে শ্রেণি শিক্ষকদের স্বাক্ষরের জন্য চাপ সৃষ্টি করেন। বিষয়টি ঢাকা জেলা শিক্ষা অফিসারকে জানান সোহেল সরকার।
লিখিত অভিযোগে আরও বলা হয়, প্রতি বছর মিলাদ মাহফিলের জন্য প্রতিষ্ঠানের ১১ হাজার শিক্ষার্থীর কাছ থেকে ২০০ টাকা করে ফি নেওয়া হয় ২৩ লাখ টাকা। অথচ শুধু এসএসসি পরীক্ষার্থীদের নিয়ে মিলাদ মাহফিল করা হয়। এছাড়া গত ১০ বছরে ম্যাগাজিন বের করা না হলেও প্রতি বছর ২৩ লাখ টাকা করে উত্তোলন করা হয় শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে। আর হোল্ডিং ট্যাক্সের নামে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে প্রতি বছর ২০০ টাকা করে আরও ২৩ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়। যদিও প্রতিষ্ঠানের হোল্ডিং ট্যাক্স বকেয়া রয়েছে ৫০ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে অবৈধভাবে এক কোটি টাকার বেশি শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে প্রতিবছর এক কোটির মতো টাকা হিসেবে তুলে ধরা হয় অভিযোগে। আর অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় ৬৫ লাখ টাকা অধ্যক্ষ ব্যয় করেছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
অভিযোগের পর ২০১৯ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ঢাকার জেলা প্রশাসন অবৈধভাবে অধ্যক্ষ নিয়োগের বিষয়ে তদন্ত করার জন্য ঢাকা জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারকে তদন্তের নির্দেশ দেয়। জেলা শিক্ষা অফিসার তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, সরকারি পরিপত্র লঙ্ঘন করে অধ্যক্ষ নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অধ্যক্ষের নিয়োগ বাতিলসহ নিয়োগের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয় প্রতিবেদনে।
জানতে চাইলে ঢাকার জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার বেনজীর আহমেদ বলেন, ‘অবৈধভাবে নিয়োগ পাওয়া অধ্যক্ষ জানিয়েছেন সভাপতির অনুমতি ছাড়া কোনও তথ্য দেওয়া যাবে না। আমি অধ্যক্ষের অবৈধ নিয়োগ প্রদান ও নিয়োগ সংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য দিয়ে সহযোগিতা না করার বিষয়ে জেলা প্রশাসনকে প্রতিবেদনে জানিয়েছি। ’


এদিকে এসব অভিযোগে ২০১৯ সালের ২৪ ডিসেম্বর ঢাকা শিক্ষা বোর্ড তদন্ত কমিটি গঠন করে। তদন্তে নিয়োগ অবৈধ প্রমাণের পর গত ১ জুলাই অবৈধভাবে নিয়োগ করার বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে গভর্নিং বডির সভাপতিকে নির্দেশ দেয় শিক্ষা বোর্ড।
শিক্ষা বোর্ডের কলেজ পরিদর্শক অধ্যাপক ড. মো. হারুন-অর-রশীদ বলেন, ‘সরকারি পরিপত্র লঙ্ঘন করে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আপনারা দেখেছেন যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’
অন্যদিকে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ সম্পর্কে শিক্ষা বোর্ডের কলেজ পরিদর্শক গত ২০ জানুয়ারি অধ্যক্ষের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে কলেজ পরিদর্শক অধ্যাপক ড. মো. হারুন-অর-রশীদ বলেন, ‘তদন্তে অভিযোগের প্রমাণ পেলে আইনি প্রক্রিয়ায় যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

/এমআর/

লাইভ

টপ