কামারপট্টিতে ত্রিমুখী প্রভাবে ক্রেতা কম (ভিডিও)

আদিত্য রিমন
৩০ জুলাই ২০২০, ১০:০২আপডেট : ৩০ জুলাই ২০২০, ১৩:৩৭

রাজধানীর কাওরান বাজার কামারপট্টির দোকানিদের অলস সময় কাটছে। ঈদের মাত্র দুই দিন বাকি থাকলেও বেচাকেনা না থাকায় কামারদের চোখেমুখে হতাশা। দোকানিদের দাবি–করোনাভাইরাস মহামারি, বন্যা ও বিদেশি সরঞ্জামের জনপ্রিয়তার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে তাদের ব্যবসায়।
সরেজমিনে দেখা গেছে, কামারদের তৈরি পণ্যের বাজারে ক্রেতার চেয়ে বিক্রেতাই এখন বেশি। দোকানগুলোতে ছোট-বড় ছুরি, চাপাতি, দা-বঁটির পসরা সাজিয়ে রাখা হয়েছে। আশানুরূপ ক্রেতা না থাকায় দোকানিরা কেউ দাঁড়িয়ে, কেউবা টুলে বসে ঝিমোচ্ছেন। দোকানের সামনে দিয়ে কেউ হেঁটে গেলেই ক্রেতা ভেবে হাঁকডাক দেওয়া হচ্ছে।
একটি দোকানের সামনে ছোট কাঠের টুলে বসে মোবাইল ফোন ব্যবহার করছেন মো. সুজন। তার সামনে যেতেই এই প্রতিবেদককে উদ্দেশ করে তার জিজ্ঞাসা, ‘মামা কী লাগবে? দেখেন সব ধরনের ছুরি, চাপাতি আছে। দামও কম রাখবো। চাইনিজও আছে। আসেন, দেখেন।’

ক্রেতা না থাকায় অলস সময় পার করছেন দোকানী মো. সুজন প্রতিবেদকের পরিচয় পাওয়ার পর সুজন জানান, তারা দুই ভাই এই দোকান চালান। গত বছরের তুলনায় বিক্রি অস্বাভাবিক হারে কমে গেছে এবার। সাধারণত ঈদুল আজহার ১০-১৫ দিন আগে থেকেই দোকানের বিক্রি কয়েক গুণ বেড়ে যেতো। তারা দুই ভাইয়ের দম ফেলার সময় থাকতো না। অথচ এখন অলস সময় কাটাতে হচ্ছে। তাই তার বড় ভাই দোকানে তেমন একটা বসেন না।
নতুন কেনার চেয়ে পুরনো দা-বঁটিতে শান দেওয়ার চিত্র এবার বেশি। দোকানি ইদ্রিস আলী এই তথ্য জানান। তার মন্তব্য, ‘মানুষের আয় কমে যাওয়ায় পুরনোগুলো দিয়ে কাজ চালিয়ে নেওয়ার কথা ভাবছে।’
গত বছর কোরবানি ঈদের আগে দিনে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে। এবার তা নেমে এসেছে ৩ হাজার টাকায়। কাওরান বাজার কর্মকার মার্কেটের রফিক এন্টারপ্রাইজের মালিক মো. রফিকুল ইসলামের দাবি, এ বছর কামারপট্টিতে বিক্রি ৭০ শতাংশ কমে গেছে। তার দোকানে গত বছর ঈদুল আজহার সময় নয়জন কর্মচারী ছিল। এবার তিনি ছাড়া আছেন মাত্র একজন কর্মচারী। এতেই বোঝা যায় ব্যবসার কতটা বেহাল দশা। দোকানে সাজিয়ে রাথা হয়েছে বিভিন্ন ধরণের ছুরি, চাপাতি দা, বঁটি
করোনার কারণে মানুষের আয় কমেছে। বন্যার কবলে পড়েছে দেশের বিভিন্ন এলাকা। করোনা ও বন্যার কারণে এবার কোরবানি দাতার সংখ্যা কম হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাই গরু জবাই ও মাংস কাটার সরঞ্জাম বিক্রি নেই বললেই চলে।
রফিক এন্টারপ্রাইজের মালিকের কথায়, ‘কীভাবে বিক্রি হবে? করোনার কারণে অনেক মানুষ বেকার হয়ে গেছে, অনেকের ব্যবসা বন্ধ। এসব লোক তো চাইলেও এবার কোরবানি দিতে পারছে না। এর সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে বন্যা। দেশের বিভিন্ন এলাকা পানির নিচে ডুবে আছে। মানুষ কীভাবে জীবন বাঁচাবে সেই চিন্তা করে কূল পাচ্ছে না। আমার তো ধারণা, এবার দেশে কোরবানি দাতার সংখ্যা অন্যান্য বছরের তুলনায় অর্ধেক কমবে।’
চাইনিজ সরঞ্জাম সস্তা হওয়ায় কামারদের তৈরি পণ্যের চাহিদা কমেছে। এর সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকতে হচ্ছে কামার শিল্পকে। এ প্রসঙ্গে ব্যবসায়ী আনোয়ারের ভাষ্য, ‘কামারদের তৈরি পণ্যের বাজার ধীরে ধীরে দখল করে নিচ্ছে চাইনিজ যন্ত্র। আমাদের দেশি ছুরি ও চাপাতির চেয়ে সেগুলো দামে সস্তা। দেখতেও সুন্দর হওয়ায় মানুষ এসব কিনছে। বাধ্য হয়ে আমরাও কিছু চাইনিজ যন্ত্র বিক্রির জন্য দোকানে রেখেছি। কিন্তু আমাদের মূল ব্যবসা তো দেশি সরঞ্জামের। এভাবে চলতে থাকলে একদিন হয়তো কামার পেশাই আর থাকবে না।’ কাজের ব্যস্ততা না থাকায় গল্প করছে কামররা

জানা গেছে, কামাররা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে কাজ করে। একটি অংশ ভবন নির্মাণের হ্যান্ডেল, হামার, তারকাঁটার বড় প্লাস প্রভৃতি জিনিস বানায়। কিন্তু করোনার কারণে দেশের সরকারি-বেসরকারি নির্মাণ প্রকল্পগুলো পাঁচ মাস ধরে বন্ধ।
কামার আলাউদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা মেট্রো রেলসহ বিভিন্ন প্রকল্পের হাতুড়ি ও হ্যান্ডেল তৈরি করি। কিন্তু করোনার কারণে এখন এসব প্রকল্প বন্ধ। এ কারণে আমরা অনেকটা বেকার। তারপরও অল্প কিছু কাজ হচ্ছে। এসব কাজ ছাড়া তো অন্য কিছু জানি না, তাই চাইলেও ছেড়ে চলে যেতে পারছি না।’

দামা তৈরিতে ব্যস্ত কামার ও তার সহযোগীরা
কামারদের আরেকটি অংশ তৈরি করেন দা, বঁটি, ছুরি, চাপাতি ও কুড়াল। এগুলো মূলত কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়। একজন কামার এখন দৈনিক ৭০০-৮০০ টাকা মজুরি পান। এছাড়া চা-পান, নাশতা পেয়ে থাকেন তারা।

কামার মো. জসিমের কথায়, ‘চার-পাঁচ মাস খুব খারাপ অবস্থায় ছিলাম। আত্মীয়-স্বজনদের কাছ থেকে ধার-দেনা করে কোনোরকম চলেছি। সামনে ঈদ বলে টুকটাক কিছু কাজ পাচ্ছি এখন। তবে আগের মতো বেশি হবে না জানি।’ কয়লায় লোহা পুড়াচ্ছেন কামার জসিম

কামার শিল্পের কাঁচামালের দাম বেড়ে চলেছে
এদিকে কামার শিল্পের মূল উপকরণ লোহা, ইস্পাত ও কয়লার দাম প্রতি বছর বেড়েই চলছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, প্রতি বছর লোহা কেজিতে ৫-১০ টাকা বাড়ে। ইস্পাতের ক্ষেত্রে একই অবস্থা। আর ৫০ কেজি ওজনের কয়লার বস্তায় ৬০০-৮০০ টাকা বেড়েছে গত দুই বছরে।
আগে খনির কয়লা পাওয়া গেলেও বর্তমানে গাছের কয়লা দিয়ে কাজ করতে হচ্ছে। এতে কয়লার অপচয় হয় বেশি। কারণ গাছের কয়লা খুব দ্রুত পুড়ে যায়। একইসঙ্গে কামারদের মজুরি বেড়েছে। কিন্তু সেই তুলনায় তৈরি পণ্যের দাম বৃদ্ধি পায়নি। এবার তো তেমন বিক্রি নেই। এ কারণে কেউ দাম বাড়াতে পারছে না। ভালো মানের একটি ছুরি আগের মতোই ২ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
কামার মোহাম্মদ জসিম জানিয়েছেন, ২৫ কেজির কয়লার বস্তায় গত বছরের তুলনায় এবার ২০০ টাকা বেড়েছে। লোহার দাম আগের মতোই আছে। তবে ভালো মানের লোহার (স্প্রিং লোহা) দাম একটু বেড়েছে।
তবুও সুদিন ফেরার আশায় দোকানিরা ব্যবসা ও কামাররা পেশা ধরে রেখেছেন।
ছবি: বাংলা ট্রিবিউন

/জেএইচ/এমএমজে/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
মতিঝিল আইডিয়ালে সরকারি অধ্যক্ষ নিয়োগ
মতিঝিল আইডিয়ালে সরকারি অধ্যক্ষ নিয়োগ
লড়াই জমিয়ে দেওয়া হাইতিকে হারিয়ে নকআউটে মরক্কো
লড়াই জমিয়ে দেওয়া হাইতিকে হারিয়ে নকআউটে মরক্কো
স্কটল্যান্ডকে হারিয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল
স্কটল্যান্ডকে হারিয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল
টিভিতে আজকের খেলা (২৫ জুন, ২০২৬)
টিভিতে আজকের খেলা (২৫ জুন, ২০২৬)
সর্বাধিক পঠিত
‘পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন’ জানেন না অনেকেই, সচেতনতা বাড়ানোর তাগিদ
‘পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন’ জানেন না অনেকেই, সচেতনতা বাড়ানোর তাগিদ
মোটরযান বিক্রির পর মালিকানা পরিবর্তন বিষয়ে সতর্ক করলো বিআরটিএ
মোটরযান বিক্রির পর মালিকানা পরিবর্তন বিষয়ে সতর্ক করলো বিআরটিএ
মির্জা আব্বাসের সংসদে ফেরা নিয়ে প্রশ্ন
মির্জা আব্বাসের সংসদে ফেরা নিয়ে প্রশ্ন
২৫ শীর্ষ নেতাকে বিদায় জানিয়ে নতুন কমিটি করলো জাতীয় পার্টি
যশোর জেলা জাতীয় পার্টি২৫ শীর্ষ নেতাকে বিদায় জানিয়ে নতুন কমিটি করলো জাতীয় পার্টি
কম দামে আনঅফিসিয়াল ফোন কেনা কি নিরাপদ
কম দামে আনঅফিসিয়াল ফোন কেনা কি নিরাপদ