উসামা আমিনের অনুমোদনহীন হাসপাতাল শেয়ার বিক্রির ফাঁদ

Send
আমানুর রহমান রনি
প্রকাশিত : ২০:২৫, আগস্ট ০৬, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২১:১২, আগস্ট ০৬, ২০২০

উসামা আমিন ও তার আল আশরাফ জেনারেল হাসপাতাল রাজধানীর উত্তরার অনুমোদনহীন আল আশরাফ জেনারেল হাসপাতাল। নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে তিন বছর ধরে এই হাসপাতালটির শেয়ার বিক্রি এবং পরে খোদ হাসপাতাল ভাড়া দিয়ে প্রায় এক কোটি ১৪ লাখ টাকার বেশি আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) উসামা আমিনের বিরুদ্ধে। অভিযোগকারীরা বলছেন, হাসপাতালের শেয়ার কেনার পর আর উসামার নাগাল পায় না কেউ। স্বাস্থ্য অধিদফতর ও উত্তরা পশ্চিম থানায় ভুক্তভোগীদের কেউ কেউ অভিযোগ দিলেও মেলেনি সহযোগিতা। উল্টো পুলিশের হয়রানির শিকার হয়েছেন অনেক পাওনাদার। উসামা আমিন নিজেকে রাষ্ট্রের ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের ঘনিষ্ঠ ও আত্মীয় হিসেবে পরিচয় দিয়ে পাওনাদারদের ভয় ভীতি দেখান বলেও অভিযোগ রয়েছে।

এদিকে স্বাস্থ্য অধিদফতর জানিয়েছে, চার বছরের মধ্যে প্রতিষ্ঠানটির অনুমোদনের জন্য কখনও আবেদন করেনি মালিক। বর্তমানে নোটিশ দিয়ে হাসপাতালের কার্যক্রম বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদফতর।

অন্যের নির্মাণাধীন ভবন দেখিয়ে হাসপাতাল শেয়ার বিক্রির প্রতারণা শুরু

পটুয়াখালী মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের সাবেক উপাধ্যক্ষ ডা. মাহবুবর রহমান সিকদার। ২০১৬ সালের দিকে তখনও তিনি অবসরে যাননি। তার পূর্বপরিচিত এক চিকিৎসকের মাধ্যমে জানতে পারেন উত্তরায় এক মাওলানা হাসপাতাল তৈরি করবেন। তিনি শেয়ার বিক্রি করবেন। এরপর ২০১৬ সালের ২১ জুলাই মাহবুবর রহমান তার চিকিৎসক মেয়ে ডা. শারমিন আক্তারের নামে ২৫ লাখ টাকা দিয়ে আল আশরাফ হাসপাতালের শেয়ার কেনেন। উসামা এসময় ১১ নম্বর সেক্টরের একটি নির্মাণাধীন ৯ তলা ভবন দেখিয়ে মাহবুবর রহমানকে বলেন, এটিই হবে আল আশরাফ হাসপাতাল।

কিছুদিন পরও ওই ভবনটিতে ‘টু-লেট’ লেখা ঝুলছে দেখে উসামা আমিনকে ফোন দেন মাহবুবর রহমান। উসামা তখন জানান, বাড়ির মালিকের সঙ্গে ঝামেলা হয়েছে, তাই বাড়িটি ভাড়া নেবেন না। অন্য একটি বাড়ি নেবেন।

মাহবুবর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘উসামার চালাকি আমি তখন ধরে ফেলি। উসামাকে জিজ্ঞেস করলাম কী ব্যাপার? তিনি আমাকে বললেন, আপনাকে সারপ্রাইজ দেবো বলে কিছু জানাইনি। অন্য বাড়িতে হাসপাতাল করবো, মন্ত্রীকে দিয়ে উদ্বোধন করাবো।’

২০১৭ সালের দিকে উত্তরা ১১ নম্বর সেক্টরের গরীবি নেওয়াজ সড়কের ২৭ নম্বর বাড়িটি ভাড়া নেন উসামা। তবে এরপর থেকে মাহবুবর রহমানের ফোন ধরা বন্ধ করে দেন তিনি। শেয়ার প্রত্যাহার চেয়ে চিঠি দেন মাহবুবর রহমান। কিন্তু উসামা আমিন আর ধরেননি। উপায় না পেয়ে উত্তরা ১১ নম্বর সেক্টর কল্যাণ সমিতির কাছে লিখিত অভিযোগ দেন ডা. মাহবুবর। সমিতির সাধারণ সম্পাদক শরীফুর রহমান একটি নোটিশ দেন উসামা আমিনকে। সালিশ বৈঠকের জন্য তাকে ডাকেন। কিন্তু তিনি আসেননি। এভাবে অনেক সময় চলে যায়। এরপর ২০১৮ সালের ২৯ মে মাহবুবর রহমানের মেয়ে শারমীন আক্তার রীমা উত্তরা পশ্চিম থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। টাকা ফেরত দেওয়া দূরের কথা, তাদের সঙ্গে আজ পর্যন্ত উসামা আমিন আর দেখা করেননি।

দুই চিকিৎসকের ১৪ লাখ টাকা আত্মসাৎ

কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের অর্থোপেডিকস সার্জন হুমায়ুন কবীর ওয়াফি। আল আশরাফ হাসপাতালে অনুরোধে মাঝে মাঝে রোগী দেখতে যেতেন। হাসপাতালের কয়েক মাসের বাড়ি ভাড়া আটকে যায়। তাই ২০১৭ সালের দিকে উসামা আমিনের ম্যানেজার মাসুম বিল্লাহ এই চিকিৎসকের কাছে হাসপাতালে বিনিয়োগের অনুরোধ করেন। ম্যানেজারের কথা শুনে উসামা আমিনের সঙ্গে দেখা করেন চিকিৎসক ওয়াফি। তিনি বলেন, ‘উসামা আমিনের সঙ্গে দেখা করে তার ধর্মীয় বেশভুসা ও কথাবার্তা শুনে তাকে বিশ্বাস করি। তিন দফা বৈঠক করে আমার বন্ধু ও শিশু বিশেষজ্ঞ কুমার বিশ্বজিৎ পাল ও আমার স্ত্রী চুক্তি করে সাত লাখ টাকা করে মোট ১৪ লাখ টাকা দেন। চুক্তি অনুযায়ী হাসপাতালের মোট আয়ের দুই শতাংশ করে অর্থ তাদের পাওয়ার কথা, কিন্তু তারা কিছুই পায়নি। এখন উসমা আমিন ফোনও রিসিভ করেন না।’

অবসরের শেষ সম্বল বিনিয়োগ করে প্রতারিত

ইদ্রিস আলী অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা। চাকরি জীবনের আয় ও অবসরের এককালীন টাকা বিনিয়োগ করেন আল আশরাফ জেনারেল হাসপাতালে। ইদ্রিস আলী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘২০১৭ সালের ৭ আগস্ট আমি উসামা আমিনের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হই। হাসপাতালের কিছু জিনিসপত্র চট্টগ্রাম বন্দরে আটকা পড়ে, সেগুলো ছাড়ানোর জন্য তার জরুরি কিছু টাকার দরকার হয়। এজন্য হাসপাতালের শেয়ার বিক্রি করবেন। আমার অ্যাম্বুলেন্স ব্যবসায়ী ভাগ্নে আমাকে এখানে বিনিয়োগ করতে বললো। আমাদের হাসপাতালের সাত শতাংশ শেয়ার দেওয়া হলো এবং আমাকে পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হলো। প্রতিমাসে ৫০ হাজার টাকা সম্মানী। এছাড়া শেয়ার অনুযায়ী হাসপাতালের লভ্যাংশ দেওয়ার কথা। আমাকে সেপ্টেম্বর মাসে একবার ৫০ হাজার টাকা দেয়। এরপর থেকে আর টাকা দেয়নি। হঠাৎ উধাও উসামা আমিন। আমাকে উসামা আমিনের ম্যানেজার মাসুম বিল্লাহ বলে, সরকার রোহিঙ্গাদের দায়িত্ব দিয়েছে উসামা আমিনকে। এখন তিনি কক্সবাজারে আছেন, তাকে বিরক্ত করবেন না। পরে আসেন। এরপর থেকে আর ফোনও রিসিভ করে না উসামা আমিন। তিনিও থানায় একটি জিডি করে রেখেছেন।’

আরও তিন চিকিৎসকের ২৫ লাখ টাকা আত্মসাৎ

চিকিৎসক ফয়জুর হাসান চৌধুরী ২০১৮ সালের দিকে আল আশরাফ হাসপাতালের দোতালায় উসামা আমিনের অফিস কক্ষে বসে পাঁচ লাখ টাকা দেন। এভাবে চিকিৎসক বনি আমিন পাঁচ লাখ এবং শফিকুল ইসলাম ১৫ লাখ টাকা দিয়েছেন। তবে এসব শেয়ার কেনার সময় কেউ কারও কথা জানতেন না। যখন প্রতারিত হন, তখন জানতে পারেন। তারা জানান, উসামা আমিনের ম্যানেজার মাসুম বিল্লাহ মূলত বিভিন্ন চিকিৎসকে উসামার কাছে নিয়ে আসেন। এরপর উসামা নিজেই শেয়ার বিক্রির নামে টাকা নিয়ে থাকেন।

চিকিৎসক ফয়জুর হাসান চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘উসামা আমিনের এটা একটা ব্যবসা। কিছুদিন পরপর হাসপাতালের সাইনবোর্ড দেখিয়ে শেয়ার বিক্রি করে মানুষের কাছ থেকে টাকা আত্মসাৎ করে। এরপর সে আর ফোন ধরে না।’

অ্যাম্বুলেন্স ব্যবসায়ীর পাঁচ লাখ টাকা ও দুই অ্যাম্বুলেন্স আত্মসাৎ

অ্যাম্বুলেন্স ব্যবসায়ী এনায়েত হোসেন তার মামা ইদ্রিস আলীকে আল আশরাফ হাসপাতালে বিনিয়োগ করতে নিয়ে যান। এনায়েত নিজেও এই হাসপাতালে পাঁচ লাখ টাকা দিয়ে প্রতারিত হন। তার দুটি অ্যাম্বুলেন্সও নিয়েছে আল আশরাফ হাসপাতাল।

অনুমোদনহীন হাসপাতালটিই ভাড়া দেয় উসামা

২০১৬ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত একের পর এক শেয়ার বিক্রি করে প্রায় কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়ে গেছে। এরপরও থামেননি উসামা। ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুমোদনহীর এই হাসপাতালটি আরেক দল চিকিৎসকের কাছে তিন বছরের চুক্তিতে মাসিক দেড় লাখ টাকায় ভাড়া দিয়ে দেন। আগের শেয়ার হোল্ডারদের না জানিয়ে এই কাজটি করেন উসামা। 

চিকিৎসক হুমায়ুন কবীর, তার স্ত্রী চিকিৎসক তামীমা আক্তার ও চিকিৎসক শফিকুল ইসলাম, এই তিন জন মিলে ২০১৯ সালের ১ ফেব্রুয়ারি ১৫ লাখ টাকা অগ্রিম দিয়ে চুক্তিপত্র করে তিন বছরের জন্য হাসপাতালটি ভাড়া নেন। চুক্তি অনুযায়ী উসামাকে তারা প্রথম বছর প্রতি মাসে দেড় লাখ এবং শেষের দুই বছর দুই লাখ করে টাকা দেবেন। চুক্তির সময় এই চিকিৎসকদের একটি ট্রেড লাইসেন্স দেওয়া হয়। এছাড়াও জানানো হয় স্বাস্থ্য অধিদফতরে আবেদন করা হয়েছে, কোনও সমস্যা নেই। এরপর এই তিন চিকিৎসক হাসপাতালে ল্যাবের জন্য ১৫ লাখ টাকার মেডিক্যাল ইনস্ট্রুমেন্ট কেনেন।

তবে উসামার বিভিন্ন পাওনাদারদের কারণে তারা হাসপাতালটি পরিচালনা করতে ব্যর্থ হন বলে জানান। তাদের অভিযোগ, উসামাকে বিষয়গুলো জানালেও তিনি কোনও ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। এই তিন চিকিৎসক বাধ্য হয়ে ২০১৯ সালের ১৫ নভেম্বর হাসপাতালটির ভাড়া চুক্তি থেকে বের হওয়ার জন্য এর চেয়ারম্যান রুহুল আমিনকে চিঠি লিখেন। লিখিত আবেদনে তারা উল্লেখ করেন, ‘পাওনাদার ব্যক্তিরা হাসপাতালের ফটকে কেউ তালা দিচ্ছে, কেউ সাইনবোর্ড খুলে ফেলে দিচ্ছে, কেউ বিদ্যুৎ ও পানির লাইন বিচ্ছন্ন করছে। এই ভীতিকর পরিস্থিতিতে এখানে সম্মানিত চিকিৎসকরা কাজ করতে পারছেন না।’

এরপর ওই বছরের ২৫ নভেম্বর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তিন চিকিৎসক বসে একটি হিসাব করেন। হিসাব অনুযায়ী আল আশরাফ হাসপাতাল এই তিন চিকিৎসককে ২৭ লাখ টাকা ফেরত দেওয়ার কথা হয়। ১ ডিসেম্বর তাদের টাকা দেওয়ার তারিখ উসামার। তবে এরপর থেকে আর উসামা আমিন তাদের সঙ্গে কথা বলছেন না। এই তিন চিকিৎসকের কারও ফোন রিসিভ করছেন না। উত্তরা যে বাসায় ছিলেন, সেই বাসাও পরিবর্তন করেছেন। উল্টো চিকিৎসকদের একজন প্রভাবশালী ব্যক্তিকে দিয়ে ফোন দিয়ে বলা হয়েছে, তারা যেন হাসপাতালের ওদিকে না যান।

ডাক্তার হুমায়ুন কবীর বলেন, ‘আমরা হিসাব নিকাশ করে চলে এসেছি মানসম্মান নিয়ে। কিন্ত আমাদের একটি টাকাও দেয়নি উসামা আমিন। আমাদের ফোনও রেসপন্স করে না, দেখাও করে না। আমাদের বলা হয়েছিল হাসপাতালের অনুমোদনের জন্য আবেদন করা হয়েছে। অনুমোদন হয়ে যাবে। এতো মানুষের কাছে হাসপাতালের শেয়ার বিক্রি হয়েছে, তাও আমরা জানতাম না। হাসপাতালটি আমরা চালু করার পর পাওনাদার আসতে শুরু করে। এসি ওয়ালার টাকাও বাকি ছিল। আমরা হাসপাতালের বেড, আইসিইউ বেড ও ল্যাবের জিনিসপত্র কিনেছি। সব সেখানে রেখে এসেছি। আমাদের টাকা দেওয়ার কথা, কিন্তু দিচ্ছে না।’

অর্থ আত্মসাতের খবর জানে বাড়িমালিক সমিতি

আল আশরাফ জেনারেল হাসপাতালের মালিকপক্ষের মাধ্যমে প্রতারিত হয়ে ২০১৮ সালে ডা. মাহবুবর রহমানসহ একাধিক ভুক্তোভোগী উত্তরা ১১ নম্বর সেক্টর বাড়িমালিক সমিতির কাছে লিখিত অভিযোগ করেন। সমিতির সাধারণ সম্পাদক শরীফুর রহমান ২০১৮ সালের ৫ মে উসামা আমিনকে চিঠি দিয়ে ঝামেলা নিরসনের জন্য বৈঠকে ডাকেন। তবে সেই ডাকে সারা দেননি উসামা। তাকে তিন বার চিঠি দিয়েছিলেন ডিএনসিসি’র ৫১ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও বাড়ির মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক শরীফুর রহমান। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘উসামা আমীন তার দাদা ও বাবার সুনামকে কাজে লাগিয়ে প্রতারণা করে যাচ্ছেন। আমি তাকে তিন বার চিঠি দিয়েছি, তিনি নিজে ওয়াদা দিয়েছেন সবার পাওনা দিয়ে দিবেন। কিন্তু  তিনি ওয়াদা রাখেননি। ফোন রিসিভ করেন না। অনেক মানুষের সঙ্গে তিনি প্রতারণা করেছেন।’

বাড়ি ভাড়া পরিশোধও বন্ধ

যে ভবনে হাসপাতাল সেই বাড়ির মালিক নাসিমা বেগম যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী। মাসুদুর রহমান নামে একজন কেয়ারটেকার দেখাশোনা করেন। মাসুদুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘উসামা আমিন নিয়মিত ভাড়া দিত না। এজন্য কয়েকবার তাদের বাড়ি ছাড়ার নোটিশ দিয়েছি। এমনকি হাসপাতালের বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছি। কিন্তু তারা যায় না। আমাদের অনেক টাকা বকেয়া জমে ছিল। পরবর্তিতে কয়েক মাসের টাকা আদায় করা হয়েছে। তারপরও দুই মাসের বকেয়া রয়েছে। হাসপাতালে প্রতিদিন অনেক পাওনাদার আসে। এদের কাছ থেকে ব্যবসার কথা বলে উসামা আমিন টাকা নিয়েছে। আমাকে অনেকে ফোনও দেয়। তবে আমি তাদের বলেছি, আমরা কিছু জানি না।’

উসামা আমিনের বক্তব্য

হাসপাতালের যে কোনও অনুমোদন নেই সেই বিষয়টি স্বীকার করেছেন উসামা আমিন। তিনি বলেন, ‘আমাদের লাইসেন্স জটিলতার কারণে স্বাস্থ্য অধিদফতরে অনুমোদনের আবেদন করা হয়নি। আমাদের লাইসেন্স করতে হবে। আমাদের যে লাইসেন্স রয়েছে সেটি হরিরামপুর ইউনিয়নের লাইসেন্স। সিটি করপোরেশনের আওতায় আসার পর নতুন লাইসেন্স করা হয়নি। তাই হাসপাতালের অনুমোদনও করা হয়নি।’

বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে শেয়ার বিক্রি ও কয়েকজন তার কাছে টাকা পান বলেও তিনি স্বীকার করেছেন। চিকিৎসক ওয়াফি, মাহবুবর রহমান, ইদ্রিস আলীর কাছ থেকে টাকা নেওয়ার বিষয়টি তিনি স্বীকার করে বলেন, ‘অবশ্যই এটা ঠিক। এরকম কিছু মানুষের সঙ্গে আমার হাসপাতালের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। তারা অনেকেই পয়সা দিয়ে শেয়ার কিনেছে। তারা আমাকে সুদে পয়সা দেয়নি। তারা ব্যবসায় বিনিয়োগ করেছেন। একটি চক্র দুই-তিন বছর ধরে এরকম করেই হয়রানি করছে। তারা চেয়েছে আমার হাসপাতালের দখল নিতে। তারা এককভাবে দখল নিতে চেয়েছিল।’

তিনি বলেন, ‘অন্যরা যে টাকা পাবে না, সেটা আমি বলছি না। কিন্তু আমার বাড়ির মালিক ও মেশিনারিজের টাকা পরিশোধ আগে অগ্রাধিকার।’

শেয়ার হোল্ডারদের অগোচরে কীভাবে পুরো হাসপাতাল অন্য একটি গ্রুপের কাছে ভাড়া দিয়ে দিলেন? এর জবাবে তিনি বলেন, ‘তারা কেউ হাসপাতালে আসতো না। তাই ভাড়া দিয়েছি।’

চার বছর ধরে অনুমোদন না নিয়ে হাসপাতালটি অবৈধভাবে পরিচালনার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন থেকে আমরা হাসপাতালের ট্রেড লাইসেন্সটি পেতে দেরি হওয়ায় আমরা স্বাস্থ্য অধিদফতরে আবেদন করতে পারিনি।’

117388583_662758260993767_2040982277933566946_n

স্বাস্থ্য অধিদফতরের বক্তব্য

গত ১৮ জুলাই আল আশরাফ জেনারেল হাসপাতালটির কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করে নোটিশ দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদফতর। নোটিশে বলা হয় হাসপাতালটি কখনও অনুমোদনের জন্য আবেদন করেনি। হাসপাতালটির ল্যাব ও রক্ত পরিসঞ্চালনার কোনও অনুমোদন নেই। এটির আইসিইউ নিম্নমানের, কোনোভাবেই আইসিইউ পরিচালনা গ্রহণযোগ্য নয়। অনুমোদনহীন ল্যাবে অবৈধভাবে রক্ত পরিসঞ্চালনা কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে। তাই হাসপাতালটির কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের হাসপাতাল বিভাগের সহকারী পরিচালক মোজাফফর হোসেন জানান, হাসপাতালটি কখনোই অনুমোদন নেওয়ার জন্য আবেদন করেনি। তারা অনুমোদন না নিয়েই কার্যক্রম পরিচালনা করছিল।

আইনের দৃষ্টিতে পুরো বিষয়টি জালিয়াতি

আইনজীবী জীবননান্দ জয়ন্ত বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘পুরো বিষয়টিতে জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছে হাসপাতালের মালিক। যেখানে মানুষের জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন, সেখানে অনুমোদন ছাড়াই হাসপাতালটি চার বছর ধরে পরিচালনা করেছেন। যা অপরাধ। এছাড়া অনুমোদনহীন একটি হাসপাতালের শেয়ার বিক্রি করেও জালিয়াতি করেছে মালিক। ভুক্তোভোগীরা এক্ষেত্রে মালিকের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাৎ ও প্রতারণার অভিযোগ আনতে পারেন।’

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইশরাত হাসান জানান, ‘মেডিক্যাল প্র্যাকটিস, প্রাইভেট ক্লিনিক এবং ল্যাবরেটরিস অর্ডিন্যান্স,  ১৯৮২  অনুযায়ী প্রাইভেট ক্লিনিক পরিচালনা করতে অবশ্যই লাইসেন্স থাকতে হবে। আইন ভেঙে লাইসেন্সবিহীন ক্লিনিক চালানো শাস্তিযোগ্য অপরাধ। উত্তরার আল আশরাফ হাসপাতাল যদি অনুমতি ছাড়া পরিচালনা করে থাকে তবে এর সংশ্লিষ্ট পরিচালকবৃন্দ ও জড়িতদের বিরুদ্ধে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ দায়ের করতে হবে। এছাড়া এই ক্লিনিকের চিকিৎসায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারবেন।’

শেয়ার হোল্ডারদেরও আইনের আশ্রয় নেওয়া উচিত বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, ‘যেহেতু কোম্পানি একটি আইন সৃষ্ট যৌথ মালিকানার ব্যবসায় সংগঠন, তাই ব্যবসায়ী হিসেবে  টাকা আত্নসাৎ দণ্ডবিধির ৪০৯ ধারার অপরাধ, যার শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড অথবা ১০ বছর এর জেল এবং অর্থদণ্ড। এছাড়াও শুধু মালিক ব্যক্তিগতভাবে প্রতারণা করে থাকলে সরাসরি তার বিরুদ্ধে প্রতারণার মামলা করা যাবে। পরিশেষে, প্রতারিত করে যে অর্থ নিয়েছে তা ফেরত পাবার জন্য দেওয়ানি মোকাদ্দমা দায়ের করতে হবে।’

উত্তরা পশ্চিম থানার বক্তব্য

আল আশরাফ হাসপাতালের মালিকের বিরুদ্ধে জিডির বিষয়ে উত্তরা পশ্চিম থানার পরিদর্শক (অপারেশনস) আলমগীর গাজী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘জিডি হলে সাধারণত প্রাথমিক তদন্ত হয়। তবে আল আশরাফের বিষয়ে কী ঘটেছিল তা আমি জানি না। কারণ আমি ২০১৮ সালের দিকে এই থানায় যোগদান করেছি।’

 

/এফএস/এফএএন/

সম্পর্কিত

লাইভ

টপ