হেফাজতের বিক্ষোভে অস্ত্র সংবলিত ব্যানার, ফেস্টুনে ‘উই ওয়ান্ট টু কিল ম্যাক্রো’

Send
সালমান তারেক শাকিল
প্রকাশিত : ২২:৪০, অক্টোবর ২৭, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২৩:১২, অক্টোবর ২৭, ২০২০

ফেস্টুনে ‘উই ওয়ান্ট টু কিল ম্যাক্রো’ফ্রান্সে ইসলামের শেষ নবী হজরত মোহাম্মদ (সা.)-এর ‘ব্যঙ্গচিত্র’ প্রদর্শনের প্রতিবাদে বিক্ষোভ করেছে বাংলাদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সংগঠন। ঢাকায়ও বিক্ষোভ হচ্ছে কয়েকদিন ধরে। এসব বিক্ষোভে মহানবী (সা.)-কে নিয়ে ‘ব্যঙ্গচিত্র’ প্রদর্শনের প্রতিবাদ করা হয়েছে। বলা হচ্ছে ফ্রান্সের রাষ্ট্রপতি ম্যাক্রোকে ক্ষমা চাইতেও। তবে মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সব প্রতিবাদ ছাপিয়ে আলোচনায় এসেছে হেফাজতে ইসলামের বিক্ষোভে ব্যবহৃত একটি ব্যানার ও কিছু সংখ্যক মাদ্রাসা শিক্ষার্থীর স্লোগান। সংগঠনটি আজ চট্টগ্রামের হাটহাজারী এলাকায় বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। ওই বিক্ষোভে অস্ত্রের ছবিযুক্ত ব্যানার ব্যবহার করেছে হাটহাজারী দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম মাদ্রাসার কিছু শিক্ষার্থী। একইসঙ্গে ‘ফ্রান্সের রাষ্ট্রপতি ম্যাক্রোকে হত্যা করার’ প্রত্যাশা জানিয়ে ফেস্টুনও ব্যবহার করেছেন বিক্ষোভকারীরা। এসব ফেস্টুন মাদ্রাসার ভেতরেই তৈরি করেন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন শিক্ষার্থী।

ফেস্টুনে ‘উই ওয়ান্ট টু কিল ম্যাক্রো’
প্রত্যক্ষদর্শী একাধিক মাদ্রাসাছাত্র জানান, অনেকটাই জঙ্গিগোষ্ঠী আইএস-এর পতাকার আদলে তৈরি এই ব্যানারে ইসলামের ‘কালেমায়ে শাহাদাত’কে ব্যবহার করা হয়েছে। একটি রাইফেলের ছবি ব্যানারের ডানদিকে ও ব্যানারের নিচের অংশে একটি তরবারিতে একটি হাদিস উদ্ধৃত করা হয়েছে, যার অর্থ ‘আমরা মোহাম্মদের (সা.) হাতে বায়াত হয়েছি, যতদিন বেঁচে থাকবো ততদিন জিহাদ করে যাবো’। কওমি মাদ্রাসার একাধিক শিক্ষার্থী জানান, স্লোগানটি আল কায়েদার স্লোগান ছিল, এখনও বিশ্বের জিহাদপন্থীরা এটি ব্যবহার করে।
কওমি মাদ্রাসার সাধারণ শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, হেফাজতে ইসলামের কর্মসূচিতে প্রথমবারের মতো আইএসের পতাকার মতো ব্যানার ব্যবহার করা হয়েছে।

হেফাজতের বিক্ষোভে অস্ত্র সম্বলিত ব্যানার, ফেস্টুনে ‘উই ওয়ান্ট টু কিল ম্যাক্রো’

প্রত্যক্ষদর্শী হাটহাজারী মাদ্রাসার একাধিক শিক্ষার্থী জানান, ব্যানার-ফেস্টুনের মতো হেফাজতের মিছিলে স্লোগান ছিল ‘সাবিলুনা সাবিলুনা -আল জিহাদ আল জিহাদ’। শিক্ষার্থীরা বলছেন, সাধারণত বাংলাদেশে আল কায়েদা ও তালেবানদের সমর্থক কিছু মাদ্রাসা শিক্ষার্থী এসব স্লোগান ও জিহাদের বিষয়ে আগ্রহী। কিন্তু হেফাজতে ইসলামের কোনও অনুষ্ঠানে এমন প্রচারণা এই প্রথম।

হেফাজতের বিক্ষোভে অস্ত্র সংবলিত ব্যানার

খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, মঙ্গলবার আছরের নামাজের পর হাটহাজারী উপজেলার ডাকবাংলোর সামনে থেকে বিক্ষোভ শুরু হয়। এই বিক্ষোভে হেফাজতের মহাসচিব জুনায়েদ বাবুনগরী উপস্থিত ছিলেন এবং আগামী শুক্রবার সারাদেশে বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা করেন তিনি।

আইএস-এর পতাকার আদলে তৈরি হেফাজতের ব্যানারটি আগ্রহভরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করেন হাটহাজারী মাদ্রাসার শিক্ষার্থী হাবিব আনোয়ার। তিনি হেফাজতের বিক্ষোভেও অংশগ্রহণ করেছেন। জানতে চাইলে মঙ্গলবার রাত সাড়ে আটটার দিকে বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘বিক্ষোভে প্রায় ত্রিশ হাজারের মতো ছাত্র উপস্থিত ছিলেন।’ সংশ্লিষ্ট ব্যানারের বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় লেখক পরিষদ হাটহাজারী শাখার এই সাংগঠনিক সম্পাদক বলেন, ‘ব্যানারটি ছাত্ররা তৈরি করেছে। তৌহিদি জনতা করেছে আর কী।’

হেফাজতের বিক্ষোভে অস্ত্র সংবলিত ব্যানার

হাটহাজারী থেকে ব্যানার ছাপানোর বিষয়ে তিনি বলেন, ‘হয়তো’। তবে ব্যানার কারা তৈরি করেছেন এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমার আশপাশে কেউ নেই, তাদের খুঁজে বের করতে হবে।’

হেফাজতের বিক্ষোভে হাটহাজারী মাদ্রাসার কিছু শিক্ষার্থী ফ্রান্সের রাষ্ট্রপতি ম্যাক্রোকে হত্যা করার ইচ্ছায় ফেস্টুন তৈরি করেছেন। মাদ্রাসার ভেতরেই একটি কক্ষে এসব ফেস্টুন লেখা হয়। একটি ফেস্টুনের ভাষা, ‘উই ওয়ান্ট টু কিল ম্যাক্রো’।

হেফাজতের বিক্ষোভে অস্ত্র সম্বলিত ব্যানার, ফেস্টুনে ‘উই ওয়ান্ট টু কিল ম্যাক্রো’

হেফাজতের সমাবেশের বিক্ষোভের ব্যানারটি নিজের ফেসবুক পেজে ও আইডিতে শেয়ার করেছেন সংগঠনের কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার সদস্য ও ইসলামী ঐক্যজোটের নেতা মুফতি সাখাওয়াত হোসাইন। জানতে চাইলে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের দেশে এটা স্পর্শকাতর মনে করি। কিন্তু পৃথিবীর অনেক দেশেই বন্দুক নিয়েই মিছিল করে। মিছিলে ফায়ারিং চলতেছে না? সৌদি আরবে তো প্রকাশ্যে তরবারি নিয়ে ইয়ে করতেছে না? এটা প্রতীকী প্রতিবাদ। লাঠি তো আর তরবারি না।’

হাটহাজারী উপজেলা হেফাজতের সাধারণ সম্পাদক মাওলানা জাকারিয়া নোমান ফয়জীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সংগঠনের প্রতিবাদ সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন হাটহাজারী উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান ও হেফাজতের শুরা সদস্য মাওলানা নাছির উদ্দিন মুনির, হাটহাজারী ওলামা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মাওলানা জাফর আহমদ, হেফাজত হাটহাজারী পৌরসভা শাখার সভাপতি মাওলানা মীর ইদ্রিস প্রমুখ।

বিক্ষোভে হাটহাজারী মাদ্রাসা, মেখল মাদ্রাসা, ফতেহপুর, বাতোয়াসহ অত্র এলাকার কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থী ও সাধারণ তৌহিদি জনতা অংশগ্রহণ করেছেন বলে জানান জাকারিয়া নোমান ফয়জী।

হেফাজতের ব্যানারে আয়োজিত সমাবেশে উগ্রপন্থী ব্যানার-ফেস্টুনের প্রচারণা সম্পর্কে জানতে চাইলে মঙ্গলবার সমাবেশের সভাপতি উপজেলা হেফাজতের সাধারণ সম্পাদক মাওলানা জাকারিয়া নোমান ফয়জী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এইটা একটা গ্রুপ করেছে, আজকে সন্ধ্যায় খবর পেয়েছি। কারা করেছে আমরা তদন্ত করে বের করবো। হেফাজতের সমাবেশ বা কর্মসূচিতে ভিন্ন কোনও ব্যানার ব্যবহারের সুযোগ নেই, নিয়মও নেই। কারা ব্যানার করেছে, আমিও শুনেছি, খোঁজ নেবো, তদন্ত করবো।’

জাকারিয়া নোমান ফয়জী জানান, এর আগেও হেফাজতের কিছু প্রোগ্রামে এসব ব্যানার-ফেস্টুন ব্যবহারের চেষ্টা করেছে একটি গ্রুপ। তিনি বলেন, ‘আগেও এক-দুবার এই গ্রুপটা চেষ্টা করেছে। আজকে যাদের স্বেচ্ছাসেবার দায়িত্ব দিয়েছিলাম, তারাই অবহেলা করেছে। এগুলো আমরা ঠিক করে দেবো।’ মঙ্গলবার রাত সাড়ে নয়টা পর্যন্ত ব্যানার ব্যবহারকারীদের চিহ্নিত করার চেষ্টা চলছে বলে জানান জাকারিয়া নোমান।

চট্টগ্রামের পুলিশের ঊর্ধ্বতন একটি সূত্র জানায়, বিষয়টির নিয়ে তারা খোঁজ-খবর করছেন। এরপরই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানায় সূত্রটি।

হাটহাজারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মাসুদ আলম বলেন, ‘ফ্রান্সে হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর অবমাননা হয়েছে। ওই বিষয়ে প্রতিবাদ ছিল। আমি বিক্ষোভের সামনের দিকে ছিলাম। সে কারণে এমন কোনও ব্যানার-ফেস্টুনের প্রচারণা চোখে পড়েনি।’

হেফাজতে ইসলামের ঢাকার একাধিক নেতার সঙ্গে মঙ্গলবার হেফাজতের বিক্ষোভে ব্যবহৃত ব্যানার ও ফেস্টুনের বিষয়ে কথা হয়। তারা প্রাথমিকভাবে বিষয়টি না জানলেও হেফাজতে ইসলামকে নিয়ে একটি পক্ষ বিতর্কিত উদ্যোগ নিচ্ছে, এমন তথ্য তারা পেয়েছেন বলে দাবি করেন।

/এমআর/এমওএফ/

লাইভ

টপ