অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট নাজিমুদ্দিন হত্যাকাণ্ডে আনসারুল্লাহ জড়িত থাকলেও মুয়াজ্জিন বেলাল হোসেন হত্যাকাণ্ড পূর্ব বিরোধের জের ধরে হয়েছে বলে প্রাথমিক তদন্তে জানতে পেরেছে পুলিশ। হত্যাকাণ্ড দু’টির ভিন্ন কোনও কারণ থাকতে পারে বলেও তাদের ধারণা। তবে দু’টি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত কোনও খুনিকেই এখনও চিহ্নিত করতে পারেনি পুলিশ। মুয়াজ্জিন হত্যাকাণ্ডে সন্দেহভাজন হিসেবে ইমাম তাজুল ইসলামসহ দু’জনকে ৫৪ ধারায় গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে পাঠালে আদালত তাদের কারাগারে পাঠান।
তদন্তে সংশ্লিষ্টরা জানান, ব্লগার নাজিমুদ্দিন ও মুয়াজ্জিন বেলাল হোসেন হত্যাকাণ্ডের তদন্তে বলার মতো কোনও অগ্রগতি এখনও হয়নি। নাজিমুদ্দিন আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের জঙ্গিদের হাতে এবং মুয়াজ্জিন বেলাল হোসেন চাঁদা ও লেনদেনকে কেন্দ্র করেই খুন হয়েছেন। এই দু’টি কারণকে প্রাধান্য দিয়ে আরও কিছু বিষয়কে সামনে রেখে দুই হত্যাকাণ্ডের তদন্ত চলছে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেন, হত্যাকাণ্ড দু’টি পৃথক কারণে হয়েছে। একটির সঙ্গে আরেকটির কোনও যোগসূত্র নেই, মিল নেই। অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট নাজিমুদ্দিন সামাদকে ধর্মীয় উগ্রবাদী জঙ্গিগোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবেই হত্যা করেছে। অপরদিকে, পুরান ঢাকার ইসলামপুরের ঝব্বু খানম জামে মসজিদের মুয়াজ্জিন বেলাল হোসেন হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় স্থানীয় সন্ত্রাসীরা জড়িত। তবে ওই ঘটনায় খুনিদের এখনও চিহ্নিত করতে পারেনি পুলিশ। মুয়াজ্জিন হত্যার ঘটনায় মসজিদটির ইমামসহ দু’জনকে গ্রেফতার দেখিয়েছে পুলিশ। তারা বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। মামলার তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এই দু’জনকে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করা হয়েছে। তিনি বলেন, মসজিদকেন্দ্রিক বিষয় ছাড়াও আর্থিক ও ব্যক্তিগত বিষয় প্রাধান্য দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। তবে এর সঙ্গে জঙ্গি সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় একটি সূত্র জানিয়েছে, মুয়াজ্জিনের কাছে মসজিদ কালেকশন ও মার্কেটের দোকানের ভাড়ার টাকা থাকতো বলে স্থানীয় ইসলামপুর ও জিন্দাবাহার লেনের সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজরা জানতো। ওই কারণে গত রমজানেও তাকে মারধর করে মসজিদের প্রায় দুই লাখ টাকা নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। এরপর তার কাছে দীর্ঘদিন থেকে চাঁদাদাবি করে আসছিলো চাঁদাবাজরা। কিন্তু সন্ত্রাসীদের তিনি জানান তার কাছে বর্তমানে কোনও ক্যাশ থাকে না, যা বিশ্বাস করতে পারেনি তারা। ফলে দুর্বৃত্তরা তাকে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করে।
নিহত মুয়াজ্জিনের ছেলে ও মামলার বাদী হাফেজ মো. ইয়াছিন বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, এখন পর্যন্ত তার বাবা হত্যার কোনও অগ্রগতি সম্পর্কে তারা কিছুই জানেন না। মসজিদের ইমামসহ দু’জন এ মামলায় গ্রেফতার হয়ে কারাগারে গেছেন সেই তথ্যও তিনি জানেন না বলে জানান।
এ বিষয়ে কোতোয়ালি থানার ওসি আবুল হাসান বলেন,মুয়াজ্জিন বেলাল হোসেন হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ঝব্বু খানম জামে মসজিদের ইমাম তাজুল ইসলাম ও মুসল্লি সারোয়ার হালিমকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের ৫৪ ধারায় গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে পাঠানোর পর আদালত তাদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
ব্লগার নাজিমুদ্দিন সামাদ হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেন, প্রাথমিক তদন্তে তারা জানতে পেরেছেন, নাজিমুদ্দিন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকেই শুধু লেখালেখি করতেন। তার কোনও ব্লগ পাওয়া যায়নি। নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সিলেটভিত্তিক একটি স্লিপার সেল নাজিমুদ্দিন হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। ওই গ্রুপটিকে চিহ্নিত করার চেষ্টা চলছে। তবে এখনও এ হত্যাকাণ্ডের উল্লেখযোগ্য কোনও অগ্রগতি নেই।
মনিরুল ইসলাম আরও বলেন,আনসারুল্লাহ একটি আগ্নেয়াস্ত্র তাদের সঙ্গে সব সময়ই রাখে। যাতে টার্গেট মিস না হয়। দ্রুত মৃত্যু নিশ্চিত করতে তারা এখন চাপাতির সঙ্গে গুলির ব্যবহারও শুরু করেছে। তবে তাদের মূল অস্ত্র দেশীয় ধারালো চাপাতি। আগ্নেয়াস্ত্র তারা সাধারণত ব্যবহার করে না। আতঙ্ক ছড়িয়ে নির্বিঘ্নে পালিয়ে যেতে তারা আগ্নেয়াস্ত্র সঙ্গে রাখে।
তদন্তে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, নাজিমুদ্দিনকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। গত বছর সিলেটে একইভাবে হত্যাকাণ্ডের শিকার ব্লগার অনন্ত বিজয় দাশ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে নাজিম হত্যার মিল রয়েছে। অনন্ত হত্যাকারীদের মধ্যে এখনও কয়েকজন পলাতক রয়েছে। পলাতকরাই নাজিমকে হত্যা করেছে কিনা সে বিষয়েও অনুসন্ধান চলছে। নাজিম হত্যার বিষয়ে ধারণা পেতে অনন্ত হত্যায় গ্রেফতার হয়ে যারা কারাগারে আছেন তাদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারেন তারা।
এদিকে নাজিম হত্যায় জড়িতরা গ্রেফতার না হওয়ায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন ও শিক্ষার্থীরা আন্দোলন অব্যাহত রেখেছে। হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের মঙ্গলবারের মধ্যে গ্রেফতার করতে না পারলে বুধবার উপাচার্য ভবন ঘেরাও কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছেন তারা।
গত ৩ এপ্রিল রবিবার রাতের কোনও একসময়ে পুরান ঢাকার ঝব্বু খানম জামে মসজিদের দ্বিতীয় তলার সিড়িতে এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাতে মুয়াজ্জিন বেলাল হোসেনকে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। পরদিন সকালে সেখান থেকে নিহতের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। অপরদিকে বুধবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে রাজধানীর সূত্রাপুরের হৃষিকেশ দাস লেনের একরামপুর মোড়ে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা করা হয় ব্লগার নাজিমুদ্দিনকে।
জেইউ/এআরআর/ এমএসএম /








