জাপানের ক্যাম্পাস যেভাবে হয়ে উঠেছিল এক টুকরো বাংলাদেশ

বাংলা ট্রিবিউন ডেস্ক
১৩ জুলাই ২০২৬, ১৬:৪৫আপডেট : ১৩ জুলাই ২০২৬, ১৬:৪৫

জাপানের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকতেই যদি চোখে পড়ে ক্যাম্পাসজুড়ে উড়ছে বাংলাদেশের পতাকা, অবাক হতেই হয়। আর একটু ভেতরে গেলেই দেখা যায় বিশাল এক তাঁবুর নিচে বিক্রি হচ্ছে খিচুড়ি, শিঙাড়া, ফুচকা, চা, লাড্ডু, সেমাই বরফি ও নানা ধরনের মিষ্টান্ন। খাবারের জন্য লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীরা—কারও পরনে শাড়ি, কারও পাঞ্জাবি। পাশেই মেহেদির বুথ, যেখানে হাত রাঙাতে অপেক্ষা করছেন অসংখ্য শিক্ষার্থী। ক্যাম্পাসের আরেক পাশে দাঁড়িয়ে আছে রঙিন রিকশা আর ঐতিহ্যবাহী বায়োস্কোপ। চারপাশের দৃশ্য যেন বলে দিচ্ছিল—এটি জাপান নয়, এক টুকরো বাংলাদেশ।

৬ থেকে ১০ জুলাই জাপানের রিতসুমেইকান এশিয়া প্যাসিফিক ইউনিভার্সিটিতে (এপিইউ) অনুষ্ঠিত ‘বাংলাদেশ উইক ২০২৬’-এ ঠিক এমনই এক পরিবেশ তৈরি করেছিলেন বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা। বাংলাদেশি সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও সৃজনশীলতাকে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের সামনে তুলে ধরার লক্ষ্যেই বিশ্ববিদ্যালয়টিতে অনুষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ উইকের ১৩তম আসর। আয়োজনে বসানো ছিল প্রতীকী রিকশা। ছবি: শিক্ষার্থীদের সৌজন্যে

জাপানের দক্ষিণাঞ্চলীয় কিউশু দ্বীপের বেপ্পু শহরের পাহাড়ঘেরা পরিবেশে অবস্থিত এপিইউতে বর্তমানে ৩২৪ জন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছেন। বিশ্বের শতাধিক দেশের শিক্ষার্থীর এই বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবছর আয়োজন করা হয় ‘মাল্টিকালচারাল উইক’। বাংলাদেশ উইক সেই আয়োজনেরই একটি অংশ। এবারের আয়োজনের মূল প্রতিপাদ্য ছিল বাংলাদেশের বর্ষাকাল ও বৃষ্টিকেন্দ্রিক জীবনধারা।

বৃষ্টির মধ্যে উদ্বোধন

৬ জুলাই ‘ওপেনিং প্যারেড’-এর মধ্য দিয়ে শুরু হয় সপ্তাহব্যাপী উৎসব। দুই ক্লাসের মাঝের ১৫ মিনিটের বিরতিতে এপিইউ ফাউন্টেনের সামনে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির মধ্যেই নাচ-গান আর সাংস্কৃতিক পরিবেশনার মাধ্যমে বাংলাদেশ উইকের আনুষ্ঠানিক সূচনা করেন বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা।

গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির মধ্যেই নাচ-গান আর সাংস্কৃতিক পরিবেশনার মাধ্যমে বাংলাদেশ উইকের আনুষ্ঠানিক সূচনা করেন বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা

সেই আয়োজনের অন্যতম আকর্ষণ ছিল বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী বায়োস্কোপ এবং বিশাল একটি রিকশার প্রতিকৃতি। ক্যাম্পাসে যাতায়াত করা শিক্ষার্থীদের অনেকেই সেখানে থেমে ছবি তোলেন, বাংলাদেশ সম্পর্কে জানার চেষ্টা করেন।

খাবারের গন্ধে জমজমাট ক্যাম্পাস

উদ্বোধনের পরই বসে খাদ্য উৎসব। চিকেন খিচুড়ি, শিঙাড়া, ফুচকা, চা, লাড্ডু, সেমাই বরফিসহ নানা বাংলাদেশি খাবার পরিবেশন করা হয়।

বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও স্থানীয় দর্শনার্থীরা এসব খাবারের স্বাদ নেন। ইউরোপীয় অধ্যাপক থেকে শুরু করে মা-বাবার সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘুরতে আসা জাপানি শিশুও বাংলাদেশি খিচুড়ি উপভোগ করে।

ছিল নানান বাংলাদেশি খাবারের আয়োজন। ছবি: শিক্ষার্থীদের সৌজন্যে

পরদিনও চা আর সেমাই বরফির জন্য ছিল দীর্ঘ লাইন। তবে সবচেয়ে বেশি ভিড় ছিল মেহেদির বুথে। বিনা মূল্যে হাত রাঙিয়ে নিতে সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত অপেক্ষা করেন বহু শিক্ষার্থী। কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবক একটানা মেহেদি এঁকে সামলান সেই ভিড়।

নব্বইয়ের বাংলা সিনেমার গানে মুখর সন্ধ্যা

৭ জুলাই সন্ধ্যায় স্টুডেন্ট হলে অনুষ্ঠিত হয় ‘ছায়াছবি’ শিরোনামের মিউজিক্যাল অনুষ্ঠান। নব্বইয়ের দশকের বাংলা চলচ্চিত্র ও সংগীতকে কেন্দ্র করে সাজানো হয় পুরো পরিবেশনা।

‘গুলবাহার’, ‘প্রেমী ও প্রেমী’, ‘মন শুধু মন ছুঁয়েছে’সহ বিভিন্ন বাংলা গানের সঙ্গে নাচ পরিবেশন করেন বাংলাদেশি ও আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা। জাপানি এক শিক্ষার্থী গেয়ে শোনান ‘সাদা কালো প্রেম’ গানটি। দর্শকে পরিপূর্ণ মিলনায়তনজুড়ে তৈরি হয় এক অন্যরকম আবহ।

বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ছিলেন বিদেশি শিক্ষার্থীরাও। ছবি: শিক্ষার্থীদের সৌজন্যে

প্রথমবারের মতো সিনেমা প্রদর্শনী

৯ জুলাই ছিল ‘দেশি মুভি নাইট’। বাংলাদেশ উইকের ইতিহাসে এবারই প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে চলচ্চিত্র প্রদর্শনের আয়োজন করা হয়।

গ্যালারি আকৃতির ওপেন স্পেসে প্রদর্শিত হয় নুহাশ হুমায়ূনের ‘পেট কাটা ষ’। ভয়ে চোখ-মুখ কুঁচকে সিনেমা উপভোগ করা দর্শকদের দেখে বোঝা যাচ্ছিল, ভাষার সীমাবদ্ধতা সিনেমা উপভোগে কোনো বাধা হয়ে ওঠেনি।

রূপকথার চরিত্রে ভরা শেষ সন্ধ্যা

১০ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়ের মিলেনিয়াম হলে অনুষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ উইকের সবচেয়ে বড় আয়োজন—গ্র্যান্ড শো। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে’ গানের কয়ার দিয়ে শুরু হয় অনুষ্ঠান। এরপর ছিল ফ্যাশন শো, নৃত্য ও মঞ্চনাটক।

ছিল মঞ্চ নাটকের আয়োজন। ছবি: শিক্ষার্থীদের সৌজন্যে

বাংলাদেশের লোককথা ও পৌরাণিক চরিত্রকে কেন্দ্র করে সাজানো ফ্যাশন শোতে উঠে আসে বনবিবি, দক্ষিণ রায়, জলপরি, বেহুলা-লখিন্দর, মনসা, বেদের মেয়ে ও শাকচুন্নির মতো চরিত্র।

ফ্যাশন শোর পর মঞ্চস্থ হয় ‘ওয়ানা নো আ সিক্রেট?’ নাটক। কিশোর আলোয় প্রকাশিত গোলাম মমীতের ‘একটা গোপন কথা’ গল্প অবলম্বনে নির্মিত এই নাটকে মুনিয়া নামের এক শিশুর কল্পনার জগতের যাত্রা তুলে ধরা হয়। গল্পের বিভিন্ন পর্যায়ে বাংলাদেশের লোককথার চরিত্রের পাশাপাশি জাপানের লোকজ চরিত্রও উপস্থিত হয়। দর্শকদের হাসি, উচ্ছ্বাস আর করতালিতে প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে পুরো মিলনায়তন।

রাষ্ট্রদূতের প্রশংসা

গ্র্যান্ড শোতে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাপানে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মো. দাউদ আলী।

এপিইউ সফরের সময় তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্ট হিরোশি ইয়োনেয়ামার সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের জন্য এপিইউকে আরও সহজলভ্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার বিষয়ে অনুরোধ জানান।

আয়োজনে অংশ নিয়েছিলেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত। ছবি: শিক্ষার্থীদের সৌজন্যে

রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের এই সাংস্কৃতিক উদ্যোগের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, এ ধরনের আয়োজন জাপানে বাংলাদেশের ইতিবাচক পরিচিতি বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। শিক্ষা, নেতৃত্ব ও আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক বিনিময়ে আরও সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানান তিনি। ভবিষ্যতেও বাংলাদেশ উইকের পাশে থাকার আগ্রহ প্রকাশ করেন।

ওইতা প্রিফেকচার সফরের অংশ হিসেবে রাষ্ট্রদূত স্থানীয় একটি মসজিদ ও ভাষাশিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করেন। সফরকালে তিনি ওইতা প্রিফেকচারের গভর্নরের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেন। আলোচনায় বাংলাদেশ ও ওইতার মধ্যে শিক্ষা, সাংস্কৃতিক বিনিময় এবং পারস্পরিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের সম্ভাবনা গুরুত্ব পায়।

শুধু উৎসব নয়, পরিচয়েরও আয়োজন

বাংলাদেশ উইক ২০২৬-এর লিডার খান আকিব আদিত্য বলেন, ‘এপিইউতে অধ্যয়নরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য বাংলাদেশ উইক নিজেদের সংস্কৃতি ও জাতীয় পরিচয় আন্তর্জাতিক পরিসরে তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। এই আয়োজন শিক্ষার্থীদের মধ্যে নেতৃত্ব, দলগত কাজ এবং সাংস্কৃতিক আত্মবিশ্বাস গড়ে তুলতে সহায়তা করে। একই সঙ্গে বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের মধ্যে পারস্পরিক সংযোগ আরও শক্তিশালী হয়।’

আয়োজনে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা । ছবি: শিক্ষার্থীদের সৌজন্যে

শুধু বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরাই নন, বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীরাও এই আয়োজনের সাংস্কৃতিক পরিবেশনা ও ব্যবস্থাপনায় অংশ নেন। আয়োজকদের মতে, আন্তর্জাতিক অংশগ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশের সংস্কৃতি সম্পর্কে এপিইউ সম্প্রদায়ের ধারণা আরও বিস্তৃত হয়েছে এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে আন্তঃসাংস্কৃতিক যোগাযোগও আরও গভীর হয়েছে।

পাঁচ দিনের এই আয়োজন শেষে জাপানের সেই ক্যাম্পাস আবারও ফিরে গেছে তার স্বাভাবিক ছন্দে। তবে কয়েকটি দিনের জন্য বিশ্বের নানা দেশের শিক্ষার্থীদের কাছে সেটি হয়ে উঠেছিল সত্যিই এক টুকরো বাংলাদেশ।

/ইউএস/
সম্পর্কিত
প্রাথমিকের পাঠ্যক্রমে যুক্ত হচ্ছে খেলাধুলা, মাঠবিহীন স্কুলে কী হবে
সমুদ্রের নিচে লুকিয়ে আছে বিপুল পরিমাণ ‘অদৃশ্য স্বর্ণ’
এইচএসসির প্রশ্ন কমন না পড়ায় কেন্দ্রে হুলুস্থুল, দলবেঁধে হামলা-ভাঙচুর
সর্বশেষ খবর
মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর কবে চালু হবে, সংসদে জানালেন নৌমন্ত্রী 
মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর কবে চালু হবে, সংসদে জানালেন নৌমন্ত্রী 
‘টুর্নামেন্ট পাতানো’ অভিযোগের পর এ বার মেসিকে নিয়েও বিস্ফোরক মন্তব্য মিসর তারকার
‘টুর্নামেন্ট পাতানো’ অভিযোগের পর এ বার মেসিকে নিয়েও বিস্ফোরক মন্তব্য মিসর তারকার
শূন্য পদ পূরণে শিগগিরই আসছে লাখো স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের ঘোষণা
শূন্য পদ পূরণে শিগগিরই আসছে লাখো স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের ঘোষণা
কেন শিবির ছাড়লেন সাদিক কায়েম
কেন শিবির ছাড়লেন সাদিক কায়েম
সর্বাধিক পঠিত
চমক দেখালো যমজ তিন বোন, পরিবারে আনন্দের বন্যা
চমক দেখালো যমজ তিন বোন, পরিবারে আনন্দের বন্যা
বিদেশে লোক পাঠানো বিএসবি গ্লোবালের মালিকের সব সম্পদ ক্রোকের নির্দেশ
বিদেশে লোক পাঠানো বিএসবি গ্লোবালের মালিকের সব সম্পদ ক্রোকের নির্দেশ
২৫ বছর পর ফেসবুকে খালার খোঁজ পেলাম, তাও মৃত্যুর পর, কষ্টের শেষ ছিল না তার
২৫ বছর পর ফেসবুকে খালার খোঁজ পেলাম, তাও মৃত্যুর পর, কষ্টের শেষ ছিল না তার
পরীক্ষা না দিয়ে ছাত্রলীগ নেত্রী পাস: তদন্ত কমিটি পেলো ভিন্ন তথ্য
পরীক্ষা না দিয়ে ছাত্রলীগ নেত্রী পাস: তদন্ত কমিটি পেলো ভিন্ন তথ্য
খামেনির জানাজায় সেই ‘রহস্যময়’ মুখোশধারী কে, জানা গেলো অবশেষে
খামেনির জানাজায় সেই ‘রহস্যময়’ মুখোশধারী কে, জানা গেলো অবশেষে