X
সোমবার, ০৩ অক্টোবর ২০২২
১৭ আশ্বিন ১৪২৯
বাংলাদেশের প্রসিদ্ধ মসজিদ

মসজিদের আলোয় আলোকিত গ্রাম

সালেহ টিটু, বরিশাল
১২ মে ২০২১, ০৯:০০আপডেট : ১২ মে ২০২১, ০৯:০০

বাংলাদেশের যে স্থাপনাশৈলী এখনও বিমোহিত করে চলেছে অগণিত মানুষকে, তার মধ্যে আছে দেশজুড়ে থাকা অগণিত নয়নাভিরাম মসজিদ। এ নিয়েই বাংলা ট্রিবিউন-এর ধারাবাহিক আয়োজন ‘বাংলাদেশের প্রসিদ্ধ মসজিদ’। আজ থাকছে বরিশালের বিখ্যাত বায়তুল আমান জামে মসজিদ।

বরিশালের উজিরপুর উপজেলার গুঠিয়া ইউনিয়নের চাংগুরিয়া গ্রাম। একসময়ের অজপাড়া গাঁ হলেও এখন এখানে ছুটে আসে নানা প্রান্তের মানুষ। কারণ এখানে আছে দেখার মতো একটি মসজিদ-বায়তুল আমান জামে মসজিদ। এই মসজিদ ও মসজিদ সংলগ্ন ঈদগাহ কমপ্লেক্সের আলোতেই যেন গোটা গ্রাম আজ আলোকিত।

দিনরাত পর্যটক লেগেই থাকে। মসজিদের রূপ দেখে মন যেন ভরে না তাদের। দিনের বেলায় এক রূপ। রাতে আবার আভা ছড়াতে থাকে রত্নের মতো।এ মসজিদকে ঘিরেই গুঠিয়ায় রীতিমতো গড়ে উঠেছে হাট-বাজার ও হোটেল।

মসজিদের আলোয় আলোকিত গ্রাম মসজিদটি নির্মাণ করেছেন গ্রামের বাসিন্দা শিল্পপতি এস. সরফুদ্দিন আহমেদ সান্টু। নির্মাণশৈলী থেকে শুরু করে কারুকাজ, সাউন্ড সিস্টেম থেকে আলোকসজ্জা; সব কিছুতেই সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন তিনি।

কতো দেশ ঘুরে..

কথা হয় মসজিদের ইমাম মাওলানা সিদ্দিকুর রহমানের সঙ্গে। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মসজিদটি নির্মাণের আগে প্রতিষ্ঠাতা তার কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে শারজাহ, তুরস্ক, দুবাই, মদিনা, ভারত ও পাকিস্তানসহ বিভিন্ন রাষ্ট্র ভ্রমণ করে নানা ধরনের মসজিদ দেখে এর নকশা তৈরি করেন। তবে হুবহু কোনওটার আদলে এটি বানানো হয়নি। অন্যসব মসজিদের দৃষ্টিনন্দন বিভিন্ন দিক জুড়েই এর নকশা করা হয়।’

১৪ একর জমির ওপর প্রায় ১১ কোটি টাকা ব্যয়ে গড়ে তোলা হয় বায়তুল আমান মসজিদ কমপ্লেক্স। তিন বছর ১৪০ জন শ্রমিক কাজ করেছেন এটি গড়তে। ২০০৬ সালের অক্টোবরে মসজিদটি উদ্বোধন করা হয়।

এর সাউন্ড সিস্টেম থেকে শুরু করে, কাঠের কাজ ও লাইটিং এর জন্য কাজ করেছেন আলাদা কারিগররা। কারুকাজ করা কাঠ আনা হয়েছে মিয়নামার থেকে। মসজিদের আলোয় আলোকিত গ্রাম

ভেতরে বাইরে

মসজিদের কেন্দ্রীয় গম্বুজের চারপাশে বৃত্তাকার ক্যালিগ্রাফির মাধ্যমে লেখা হয়েছে আয়াতুল কুরসি। ভেতরের চারপাশ জুড়ে ক্যালিগ্রাফিতে লেখা সুরা আর রহমান। ভেতরের চারকোনের চার গম্বুজের নিচে প্রবেশ তোরণের সামনে ও ভেতরের দর্শনীয় কয়েকটি স্পটে শোভা পাচ্ছে আল কুরআনের বিভিন্ন আয়াতের ক্যালিগ্রাফি। মসজিদ লাগোয়া মিনারটির উচ্চতা ১৯৩ ফুট।

আছে আলপনা, বর্ণিল কাচ, মার্বেল, গ্রানাইট ও সিরামিকের কারুকাজ। ভেতরের নয়টি গম্বুজে বিশালাকৃতির নয়টি দামি ঝাড়বাতি বসানো হয়েছে। মেঝেতে বসানো হয়েছে ভারত থেকে আনা সাদা মার্বেল পাথরের টাইলস।

চার কোনায় চারটি এবং ছাদের ভেতর ছয়টি গম্বুজ। মক্কা-মদিনায় যে প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়, সে প্রযুক্তির সাউন্ড সিস্টেম ব্যবহার করা হয়েছে এতে। তাতেই ব্যয় হয়েছে প্রায় ২৫ লাখ টাকা।

মসজিদের আলোয় আলোকিত গ্রাম ভেতরের সৌন্দর্যের সঙ্গে বাইরের নান্দনিকতাতেও লক্ষ্য রাখা হয়েছে। চারপাশে তৈরি করা হয়েছে ফুলের বাগান ও লেক। সামনের পুকুরটি এমনভাবে খনন করা হয়েছে যাতে পানিতে মসজিদটির পুরো প্রতিবিম্ব দেখা যায়।

মসজিদটির ভেতর একসঙ্গে তের শ’ মুসুল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন। বাইরের অংশে আরও ছয় হাজার মুসুল্লির নামাজ আদায়ের ব্যবস্থা আছে। নারীদের জন্য আছে পৃথক নামাজের স্থান। সেখানে ৬০ জন নারী একসঙ্গে নামাজ আদায় করতে পারবেন।

এ কমপ্লেক্সের মধ্যে গড়ো তোলা হয়েছে মাদ্রাসা। এ পর্যন্ত ৭৯ জন হাফেজ হয়েছেন সেখান থেকে। এখন যারা অধ্যয়নরত, তাদের সম্পূর্ণ খরচও বহন করছেন মসজিদের প্রতিষ্ঠাতা।

কমপ্লেক্সের দুই একর জমিতে আছে কবরস্থান, রেস্ট হাউস, হ্যালিপ্যাড, ইমাম-মুয়াজ্জিন ও মাদ্রাসার শিক্ষকদের কোয়ার্টার।

মসজিদের আলোয় আলোকিত গ্রাম এক স্তম্ভের কতো মহিমা!

ওই স্থানে আগে যে পুরনো মসজিদ ছিল, সেটার স্মৃতি ধরে রাখতেও একটি বৈচিত্র্যে ভরা স্তম্ভ বানিয়েছেন এর প্রতিষ্ঠাতা। ওই স্তম্ভে জমজম কূপের পানি ছাড়াও আছে মক্কা থেকে আনা কাবা শরিফের পাশের মাটি, আরাফাহ ময়দানের মাটি, মুযদালিফাহর মাটি, জাবালে নূর পাহাড়ের মাটি (পবিত্র কোরআন শরিফে প্রথম আয়াত জাবালে নূর-এ নাজিল হয়), জাবালে সূর পাহাড়ের মাটি, জাবালে রহমত পাহাড়ের মাটি (বিদায় হজের ভাষণ দেওয়া হয়েছিল যেখানে), নবীজীর জন্মস্থানের মাটি, জেদ্দায় মা হাওয়ার কবরস্থানের মাটি ও মসজিদে রহমতের মাটি।

মদিনা থেকে কুবা মসজিদের মাটি (হযরত মোহাম্মদ সা. নির্মিত প্রথম মসজিদ), ওহুদ যুদ্ধের ময়দানের মাটি, হযরত হামজা (রা.) এর মাজারের মাটি, মসজিদে আল কিবলাতাইন-এর মাটি, মসজিদে হযরত আবু বকর (রা.) এর মাটি, মসজিদে হযরত আলী (রা.)-এর মাটি, জান্নাতুল বাকি’র মাটি, মসজিদে নববির মাটি, জুলহুলাইফা মিকাত-এর মাটি, বাগদাদ শরিফ থেকে হযরত আব্দুল কাদের জিলানি (রা.) এর হাতে লেখা তাবিজ ও মাজারে পাওয়া দু’টি পয়সা এবং হযরত খাজা মঈনুদ্দিন চিশতি (রা.)-এর মাজারের মাটি। যার কারণে স্তম্ভটিও বিস্ময়ভরা দৃষ্টিতে দেখেন ধর্মপ্রাণ পর্যটকরা।

স্তম্ভটির সামনে প্রতিষ্ঠাতা এস. সান্টু লিখেছেন, ‘এখানে একটি পুরাতন মসজিদ ছিল, মসজিদটির জায়গাটাকে সংরক্ষণের জন্য এর চেয়ে উত্তম কোনও বিকল্প আমার জানা ছিল না।’

মসজিদের আলোয় আলোকিত গ্রাম গ্রামটাই বদলে গেছে

ইমাম আরও জানান, বিশেষ দিনগুলোতে মসজিদটির ভেতর থেকে শুরু করে বাইরের জায়গা মুসুল্লিতে পরিপূর্ণ হয়ে যায়। স্থানীয়রা তো আসেনই, বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন স্থান থেকেও মুসুল্লিরা আসেন নামাজ আদায় করতে। এরপর তারা পুরো মসজিদ এলাকা ঘুরে দেখেন।

স্থানীয়রা জানান, গ্রামটা এক মসজিদের আলোয় এভাবে আলোকিত হবে তা তারা ভাবেননি। মসজিদটির নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এর খবর ছড়িয়ে যায় গোটা দেশে। এরপর বাড়তে থাকে লোকজনের আনাগোনা। তাদের কথা ভেবে গ্রামবাসী মসজিদের সামনের সড়কে কয়েকটি খাবারের দোকান দেয়।

এ ছাড়া মসজিদ সংলগ্ন এলাকায় গড়ে তোলা হচ্ছে কমিউনিটি সেন্টার ও আবাসিক হোটেল। এগুরো চালু হলে পর্যটকের ভিড় আরও বাড়বে। এতে উন্নত হবে গ্রামের অর্থনৈতিক অবস্থাও। এসব কারণে মসজিদটির প্রতিষ্ঠাতার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে ভোলেন না গ্রামবাসী।

/এফএ/
সম্পর্কিত
পাগলা মসজিদের দানবাক্সে মিললো প্রায় ৪ কোটি টাকা
পাগলা মসজিদের দানবাক্সে মিললো প্রায় ৪ কোটি টাকা
পাগলা মসজিদের দানবাক্সে ১৫ বস্তা টাকা, চলছে গণনা
পাগলা মসজিদের দানবাক্সে ১৫ বস্তা টাকা, চলছে গণনা
বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রীর উদ্যোগে আলো-বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা রেখে মসজিদের নকশা
বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রীর উদ্যোগে আলো-বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা রেখে মসজিদের নকশা
বঙ্গবন্ধুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা মসজিদে শোক দিবস পালন
বঙ্গবন্ধুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা মসজিদে শোক দিবস পালন
বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
ঘটনাবহুল ম্যাচ জিতে সিরিজ ভারতের
ঘটনাবহুল ম্যাচ জিতে সিরিজ ভারতের
জমিদারপুত্র থেকে সংগীত সাধক
বারীণ মজুমদারের প্রয়াণদিনজমিদারপুত্র থেকে সংগীত সাধক
বিবিয়ানায় আরও কূপ খনন করবে শেভরন
বিবিয়ানায় আরও কূপ খনন করবে শেভরন
দেরি করেই বাড়ছে বিপদ
দেরি করেই বাড়ছে বিপদ
এ বিভাগের সর্বশেষ
করোনা: মসজিদে প্রবেশে বিধিনিষেধ জারি
করোনা: মসজিদে প্রবেশে বিধিনিষেধ জারি
টানা ৯৫ বছর কোরআন তিলাওয়াত হচ্ছে যে মসজিদে
বাংলাদেশের প্রসিদ্ধ মসজিদটানা ৯৫ বছর কোরআন তিলাওয়াত হচ্ছে যে মসজিদে
বায়তুল মোকাররমের খতিব নিয়োগে সময় নেবে সরকার?
বায়তুল মোকাররমের খতিব নিয়োগে সময় নেবে সরকার?
এখনও স্বমহিমায় শায়েস্তা খাঁর লালমাটিয়া শাহী মসজিদ
বাংলাদেশের প্রসিদ্ধ মসজিদএখনও স্বমহিমায় শায়েস্তা খাঁর লালমাটিয়া শাহী মসজিদ
ইন্টারন্যাশনাল আর্কিটেকচার অ্যাওয়ার্ড জিতলো দ্য গ্রেট মস্ক অব আলজিয়ার্স
ইন্টারন্যাশনাল আর্কিটেকচার অ্যাওয়ার্ড জিতলো দ্য গ্রেট মস্ক অব আলজিয়ার্স