রহমত পাহাড়: মহানবী (সা.)-এর বিদায় হজের স্মৃতিচিহ্ন

সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর
০৯ ডিসেম্বর ২০২২, ১২:৪৩আপডেট : ২১ ডিসেম্বর ২০২২, ২২:০০

মক্কার মিসফালা রোডে আমাদের হোটেলে আসরের নামাজ পড়ে বের হলাম আরাফা ময়দান, জাবালে রহমত, মিনা—এসব দেখব বলে। হোটেল থেকে রাস্তায় এসে এক বাঙালি তরুণ ড্রাইভারকে ঠিক করলাম। ভাড়া ৩০ রিয়াল। যদি সময় বেশি না লাগে তাহলে তাকে নিয়েই ফিরে আসবো। তাতে তাকে আরও ২০ রিয়াল দেবো। এমন কথা বলে গাড়িতে উঠে বসলাম। রহমত পাহাড়: মহানবী (সা.)-এর বিদায় হজের স্মৃতিচিহ্ন

তরুণের সঙ্গে কথা বলে জানলাম, তার বাড়ি কক্সবাজার। কিন্তু তার জন্ম এখানে। এখানেই বড় হয়েছে এবং সে কখনও বাংলাদেশে যায়নি। তার মা-বাবা দুয়েকবার গিয়েছে, কিন্তু তার কখনও মাতৃভূমি দেখার সৌভাগ্য হয়নি। অবশ্য তার জাতীয়তা বাংলাদেশি, পাসপোর্টও বাংলাদেশি। যদিও বিয়ে করেছে এখানকার এক অভিবাসী আরবি মেয়েকে।

তবে আমার মনে হলো, সে-ও সম্ভবত ঠিকানাহীন রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠীর বংশধর। বিগত ৫০ বছর ধরে প্রচুর পরিমাণ রোহিঙ্গা অভিবাসী নানা উপায়ে পাড়ি জমিয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে। বিশেষত সৌদি আরবে। তাদের অধিকাংশই নিজেদের বাংলাদেশি বলে পরিচয় দেয়।

যাওয়ার পথে এটা ওটা নিয়ে কথা বলছিলাম। তাকে বললাম, এ রাস্তায় তো সম্ভবত উম্মুল কুরা ইউনিভার্সিটি। আমাদের একটু ইউনিভার্সিটি ঘুরিয়ে নিয়ে যেয়ো।

একটু পরই উম্মুল কুরা ইউনিভার্সিটি দেখতে পেলাম। ভেতরে বড় কোনও বিল্ডিং নেই। একাডেমিক ভবনগুলো বড়জোর তিন-চার তলা করে একই গড়নে বানানো। বেশ ফুল ও ফলের গাছে সাজানো ক্যাম্পাস। আর খেজুর গাছ তো আছেই। সৌদি আরবের জাতীয় দিবস উপলক্ষে আজ ইউনিভার্সিটি ছুটি। এ কারণে শিক্ষার্থীর আনাগোনা নেই।

আমাদের গাড়ি উম্মুল কুরার গেটের ভেতর দিয়ে ঢুকে ইউটার্ন নিয়ে আরেক পথ ধরলো। এদিক একেবারে জনবিরল এলাকা। হুটহাট দুয়েকটা গাড়ি যাচ্ছে আমাদের পাশ দিয়ে মাত্র। এছাড়া আবাসিক ভবন বা সরকারি ভবনও নেই। দুই পাশে পাহাড়ের পাশ দিয়ে কড়ই জাতীয় ছোট ছোট গাছের আধিক্য। রাস্তার পাশে সাইনবোর্ড দেখতে পেলাম ‘আরাফা স্টার্টস্ হেয়ার’!

আমাদের তরুণ ড্রাইভার সম্ভবত খুব একটা চেনে না এখানকার রাস্তাঘাট। তাছাড়া আরাফার ময়দান এত বিশাল, ভেতরে ছড়িয়ে আছে শত শত শাখা-পথ। হজের মৌসুমে এই বিশাল প্রান্তরে প্রায় ৩০ লাখ হাজী অবস্থান গ্রহণ করেন। তাদের আবাসনের জন্য ছোট-বড় নানা স্থাপনা নির্মাণ করে রাখা হয়েছে। বাথরুমগুলো তালাবদ্ধ, সিকিউরিটি ও অন্যান্য স্থাপনাগুলো ভেঙে পড়ে আছে। হজ মৌসুমের আগে হয়তো ঠিক করা হবে। এছাড়া সারা বছর এগুলো এমন নির্জনই পড়ে থাকে।

কয়েক কিলোমিটার এলাকা সুনসান পড়ে আছে। কিছু বড় সরকারি স্থাপনা দেখা যাচ্ছে। কিন্তু সেগুলোতেও কোনও মানুষজন চোখে পড়ছে না। কোনও গাড়িও দেখছি না আরাফার গাছ-গাছালি সুশোভিত প্রান্তরে। আমাদের ড্রাইভার সেসব গাছের মাঝ দিয়ে বানানো রাস্তা ধরে দিকভ্রান্তের মতো ঘুরছে। মনে একটু ভয়ও লাগছে। সঙ্গে মোটা অঙ্কের রিয়াল। সে আমাদের নিয়ে কোনও অজানা ঠিকানায় যাচ্ছে না তো! তারপর আরও কয়েকজন মিলে কেড়ে নেবে সব!

এসব ভাবতে ভাবতে একটা রাস্তার প্রান্তে অবশেষে জনমানুষের জটলা দেখতে পেলাম। বড় বড় কিছু স্থাপনাও নজরে এলো। অনেকগুলো প্রাইভেট কার আর হোটেলের বাস দাঁড়িয়ে আছে। মনে স্বস্তি ফিরে এলো। এটাই তাহলে জাবালে রহমত—রহমত পাহাড়।

জাবালে রহমতের সামনে বিরাট গেট। তার পরে পিচ ঢালাই করা বিরাট গোলাকার প্রান্তর। রহমত পাহাড়কে ঘিরে গড়ে তোলা হয়েছে এ প্রান্তর। সামনেই দাঁড়িয়ে আছে জাবালে রহমত।

অনুচ্চ পাথুরে পাহাড়। সকালে দেখা জাবালের নুরের তুলনায় এটাকে শিশুই বলা যায়। তবে এই পাহাড়ের ঐতিহাসিক গুরুত্ব তুলনাহীন। অনেক সহস্রাব্দের পুণ্যস্মৃতি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এখনও। ধারণা করা হয়, পৃথিবীর প্রথম মানব-মানবী বেহেশত থেকে নির্বাসিত হওয়ার পর দীর্ঘ অনেক বছর একজন আরেকজনকে খুঁজতে থাকেন। অবশেষে এই জাবালে রহমতের পাদদেশে এসে সাক্ষাৎ হয় দুজনার।

নবীজির (সা.) অনেক স্মৃতি বহন করছে এ পাহাড়। বিশেষত বিদায় হজের ভাষণ সবিশেষ গুরুত্ববহ। নবীজির মৃত্যুর আগে তিনি তার সকল সাহাবিকে এই হজে সমবেত হওয়ার নির্দেশ দেন এবং এই পাহাড়ের পাদদেশে সবাইকে একত্রিত করে তিনি ইসলামের আখেরি বাণীগুলো শোনান। তাদেরকে পৃথিবীর চতুর্দিকে ইসলামের সত্যধর্মের আলো ছড়িয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন। এই হজ পালনের অল্প কিছুদিন পরই নবীজি মদিনায় ফিরে অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং অসুস্থতার দরুন তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর ওপর অগণিত দরুদ ও সালাম!

আমি ও আমার স্ত্রী জাবালে রহমতে চড়তে লাগলাম। সিঁড়ি করা আছে। সিঁড়ির পাশে থাকা বড় বড় পাথরগুলোতে ‘ধার্মিক’ লোকজন তাদের নাম লিখে রেখেছেন। মার্কার পেন দিয়ে ইংরেজি, আরবি, উর্দু, বাংলাতেও নানা নাম-ঠিকানা দেখতে পেলাম। হয়তো স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে বা পুণ্য অর্জনের উদ্দেশ্যে এসব করেছে। মানুষের আহ্লাদের তো শেষ নেই! রহমত পাহাড়: মহানবী (সা.)-এর বিদায় হজের স্মৃতিচিহ্ন

রহমত পাহাড়ের চূড়ায় উঠতে পাঁচ-সাত মিনিট সময় লাগলো। খুব বেশি মানুষজন নেই এখানে। পাহাড়ের একেবারে চূড়ায় একটি পাথুরে স্তম্ভ নির্মাণ করা হয়েছে। এ স্তম্ভ নবীজির সময়কার নাকি পরবর্তীতে নির্মাণ করা হয়েছে, জানা নেই। তবে স্তম্ভের গায়ে বড় সাইনবোর্ড টাঙানো আছে। তাতে প্রচলিত আটটি ভাষায় লেখা আছে—এই স্তম্ভ বা পাহাড়কে নবীজি (সা.) বা সাহাবিরা কখনও পুণ্য অর্জনের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেননি। নামাজ, স্পর্শ বা দোয়ার মাধ্যম হিসেবেও নয়। সুতরাং এটিকে পুণ্য অর্জনের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ না করা উচিত। আট ভাষার মধ্যে বাংলাতেও কথাগুলো স্পষ্ট লেখা আছে।

তবু এই স্তম্ভ ঘিরে মানুষের নানা ধরনের পুণ্য অর্জনের কমতি নেই। কেউ স্তম্ভের পাশে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়ছে, কেউ কাবার দিকে ফিরে দোয়া করছে। সবচে মজার বিষয় হলো, এই স্তম্ভের গায়ে পুণ্যকামী লোকজন নিজেদের নাম আর মনোবাসনা লিখে সাদা পাথুরে স্তম্ভ একদম কালো করে ফেলেছে। সেখানে কে কী লিখেছে, এখন আর বুঝার উপায় নেই।

এই যে স্তম্ভের গায়ে নিজের বা প্রিয়জনের নাম লেখা বা মনোবাসনা লেখার সংস্কৃতি, এটি ইসলাম ধর্মীয় কোনও সংস্কৃতি নয় এবং এটি কোনও দেশের মুসলিম সংস্কৃতিও নয়। তবু নানা দেশ থেকে আসা মুসলিম হজ-ওমরাহ পালনকারীরা এখানে  নিজেদের নাম-ধাম লিখে গেছে।

এক জাতির সংস্কৃতি এভাবেই আরেক জাতি বা ধর্মের সংস্কৃতিতে ঢুকে পড়ে। এজন্য নিজস্ব সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য আগলে রাখা অত্যন্ত দরকারি অনুষঙ্গ। সেটা ধর্মীয় সংস্কৃতির ব্যাপারে যেমন সত্য, তেমনি নিজ জাতিগোষ্ঠীর সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও সত্য।

আরও পড়ুন:

/এসটিএস/এমএস/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
গরমে শিশুর সুরক্ষা: সামান্য ভুলও ডেকে আনতে পারে বড় বিপদ
গরমে শিশুর সুরক্ষা: সামান্য ভুলও ডেকে আনতে পারে বড় বিপদ
থানার ভেতরে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে পিটিয়ে আহত, ৩ পুলিশ প্রত্যাহার
থানার ভেতরে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে পিটিয়ে আহত, ৩ পুলিশ প্রত্যাহার
ড্রোন কিনতে ২০০০ বিলিয়ন রুপি ব্যয়ের পরিকল্পনা ভারতের
ড্রোন কিনতে ২০০০ বিলিয়ন রুপি ব্যয়ের পরিকল্পনা ভারতের
কুমিল্লায় এক শিশুকে ধর্ষণ ও আরেক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ
কুমিল্লায় এক শিশুকে ধর্ষণ ও আরেক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম