সন্ধ্যা হয়ে আসছিল। মাগরিবের আজানের খুব বেশি বাকি নেই। এবার মক্কায় ফিরতে হবে। এখন রওনা হলে আশা করি মাগরিবের নামাজ মসজিদে হারামে গিয়ে আদায় করতে পারবো।
সহধর্মিণীকে সঙ্গে নিয়ে জাবালে রহমত থেকে নেমে আরাফা ময়দান পার হয়ে গেটের বাইরে এলাম। জাবালে রহমতে আমাদের বড়জোর ৩০ থেকে ৪০ মিনিট কেটেছে। আমাদের ট্যাক্সি ড্রাইভারকে সেভাবেই বলে গেছি। সে আমাদের জন্য বাইরে অপেক্ষা করবে, জাবালে রহমত দেখে আবার তাকে নিয়েই মক্কায় ফিরবো। আসার ভাড়া রফা হয়েছিল ৩০ রিয়াল, ফিরতি ভাড়া তাকে বলেছিলাম আরও ২০ রিয়াল দেবো। মোটমাট ৫০ রিয়াল দেবো তাকে। সে আমাদের কথায় রাজি হয়ে গেটের বাইরে অপেক্ষা করার কথা। যদি সময় থাকে তাহলে এদিকে মিনা ও মুজদালিফা ঘুরে যাবো।
খারাপ লাগছে আবার রাগও হচ্ছে। খারাপ লাগছে, কারণ ড্রাইভারকে ৩০ রিয়াল বলে নিয়ে এসেছিলাম। কথা ছিল ফেরার পর একসঙ্গে তাকে ৫০ রিয়াল ভাড়া দিয়ে দেবো। কিন্তু আসার ভাড়া ৩০ রিয়াল তো তাকে দেওয়া হয়নি। ৩০ রিয়াল তার কাছে ঋণ রয়ে গেলো! এ ঋণ কার কাছে শোধ করবো?
আর রাগ হচ্ছে, একটা রেসপন্সিবিলিটির ব্যাপার আছে। সে দুজন ভিনদেশি যাত্রী নিয়ে এসেছে এবং তাদের সঙ্গে ওয়াদা করেছে, সে এখানে অপেক্ষা করে তাদের নিয়ে মক্কায় ফিরবে। কিন্তু দায়িত্ব ও ওয়াদা পালন না করে সে নিরুদ্দেশ হয়ে গিয়েছে। তার তো নিশ্চয় জানা থাকার কথা—এখান থেকে কোনও ট্যাক্সি পাওয়া যাবে না। তাহলে এ দুজন যাত্রী মক্কায় ফিরবে কীভাবে? একজন ড্রাইভারের এমন দায়িত্বহীনতা নিশ্চয় কাম্য নয়। আমাদের মিনা-মুজদালিফা দেখার প্ল্যান তো গেলোই, এখন মক্কায় ফিরবো কীভাবে সেই চিন্তায় অস্থির হয়ে পড়লাম।
এদিকে সন্ধ্যা হয়ে আসছে। যেসব ট্যাক্সি ও হোটেল বাস দর্শনার্থীদের নিয়ে এসেছিল তারাও একে একে বিদায় নিচ্ছে। জাবালে রহমতের সামনের এ এলাকাটি একেবারেই জনবিরল। দর্শনার্থী ছাড়া এখানে আর কোনও মানুষজন দেখছি না। পুলিশ বা সরকারি কোনও লোকজনও নেই। কয়েকজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী আছে শুধু, যারা আরাফা ময়দান ও আশপাশের চত্বরগুলো পরিষ্কার রাখে। কিছুক্ষণের মধ্যে পুরো এলাকা সুনসান হয়ে যাবে।
আরও বিপদের কারণ হলো, এ এলাকাটি মেইন রোডের পাশে নয়। শুধুমাত্র দর্শনার্থীরাই জাবালে রহমত দেখতে আসে। সুতরাং এখানে ট্যাক্সি পাওয়ার চিন্তা করা বৃথা। এখানে যারা আসে সবাই নিজস্ব ট্যাক্সি নিয়ে আসে এবং সে ট্যাক্সিতেই ফিরে যায়। অথবা হোটেলের নিজস্ব বাসে করে আসে আবার বাসে করে ফিরে। আমরা তো অন্যের ভাড়া করা ট্যাক্সি বা বাসে যেতে পারবো না।
প্রায় ১৫-২০ মিনিট কেটে গেল। দুশ্চিন্তা হচ্ছে খুব। সঙ্গে কয়েক হাজার রিয়াল। বউকে বললাম দরুদ শরিফ পড়তে। আমিও মনে মনে বার বার দরুদ শরিফ পড়ছি। আল্লাহ চাহে তো একটা ব্যবস্থা হবে। গেটের সামনে পার্ক করা দু-একটা ট্যাক্সির কাছে জিজ্ঞেস করলাম তারা মক্কায় যাবে কিনা। জানাল, তারা যাত্রী নিয়ে এসেছে। তাদের নিয়েই ফিরবে। কী যে মুসিবতে পড়লাম!
অন্ধকার হয়ে আসছে চারপাশ। আমাদের সামনে রাস্তার অপর পাশে একটা লাল রংয়ের গাড়ি দাঁড়ানো। এতক্ষণ খেয়াল করিনি। হঠাৎই কোথা থেকে যেন উদয় হলো। মনের মধ্যে সামান্য আশা নিয়ে গাড়িটির দিকে এগিয়ে যাবো, এমন সময় গাড়ির ড্রাইভিং সিট থেকে এক বৃদ্ধ মাথা বের করে বলতে লাগলেন, মক্কা, মক্কা, মক্কা!
আমার কলিজায় যেন পানি ফিরে এলো। দৌঁড়ে গিয়ে বৃদ্ধকে জিজ্ঞেস করলাম, মক্কা?
বৃদ্ধ হাসিমুখে জানালেন, আইওয়াহ, মক্কা!
আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘কাম রিয়ালা? (কয় রিয়াল?)
বৃদ্ধ দুই আঙুল দেখিয়ে ভাঙা উর্দুতে বললেন, ‘বিস রিয়াল।’
বিশ রিয়াল মাত্র! তা-ও এই বিপদের সময়! আমি যেন মেঘ না চাইতে জলের সন্ধান পেলাম। বউকে বললাম, জলদি এসো, মক্কায় যাওয়ার বন্দোবস্ত হয়ে গেছে।
আমরা বৃদ্ধের গাড়িতে উঠলাম। বউকে পেছনের সিটে বসিয়ে আমি সামনে বৃদ্ধের সঙ্গে বসলাম। বুড়োর বয়স ষাট থেকে সত্তর হবে। গায়ে ছাইরঙা জুব্বা, মাথায় ক্যাপ। গাড়ির রেডিওতে কোনও একটা আরবি চ্যানেলে গান বাজছে। বুড়ো মাথা দুলিয়ে গানের সঙ্গে তাল মেলাচ্ছিলেন। রসিক বুড়ো।
ভাঙা ভাঙা আরবিতে আমি বুড়োর সঙ্গে কথা জমাতে চেষ্টা করলাম। তিনি সামনের এলাকায় থাকেন, তিনি আর তার স্ত্রী। ঘরের জন্য বাজার করে যাচ্ছিলেন। ভাবলেন, পথে যদি বিশটা রিয়াল পকেটে আসে তবে মন্দ কী! পেছনের সিটে দেখলাম গাজর, আলু, পেঁয়াজের প্যাকেট।
বৃদ্ধের সঙ্গে কথা বলে মজা লাগছিল। আবার ভয়ও করছিল। বুড়ো আবার ডাকাত দলের দস্যু বনহুর নয় তো? সামনের পথ-ঘাটও সুনসান। বুড়ো জানালেন, এই হলো মিনা। এখানে হজের সময় হাজিরা অবস্থান করেন। সামনে মুজদালিফা। আমরা যে পথ ধরে যাচ্ছি সে পথটা দেখিয়ে বললেন, এই পথ ধরেই হাজিরা হেঁটে আরাফার ময়দানে যান।
বুড়ো আমাদের পথের দুই পাশের নানা দর্শনীয় জায়গা দেখাচ্ছিলেন। ইতোমধ্যে মাগরিবের আজান হয়ে গেলো। আমরা তখনও প্রায় সুনসান এলাকায়। মিনা-মুজদালিফা এলাকাগুলোয় হজের সময় প্রচণ্ড ভিড় হলেও অন্য সময় একেবারে জনবিরল। পথের দু-এক জায়গায় পুলিশের চেকপোস্ট ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়লো না।
তবে একটু পরই শহরের প্রান্ত দেখা গেলো। মনের ওপর থেকে একটা ভারী পাথর যেন সরে গেল। শহরের ভেতরে এনে বুড়ো আমাদের নামিয়ে দিলেন। বললেন, এখানে দাঁড়াও। পাঁচ মিনিট পর পর মসজিদে হারামে যাওয়ার বাস আসে এখানে, ফ্রি বাস। সে বাসে তোমরা মসজিদে হারামে চলে যেতে পারবে।
আমার কাছে ২০ রিয়াল ভাংতি ছিল না, বুড়োর কাছেও নেই। কী করা যায় তাহলে? পাশে একটি কয়েকটি দোকান দেখলাম। পাকিস্তানি দোকান সম্ভবত। আমি দোকানের ম্যানেজারকে ভাংতির কথা বলতেই তিনি সাগ্রহে ভাংতি দিয়ে দিলেন। বুড়োকে বিশ রিয়াল আর অসংখ্য ধন্যবাদ জানিয়ে বাসের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম।
এ সময় ওই পাকিস্তানি দোকানের লোকজন নামাজের জন্য পাশের মসজিদে যাচ্ছিল। তারা আমাদের দেখে জিজ্ঞেস করল, হারামে যাবেন?
আমি বললাম, জি, বাসের জন্য অপেক্ষা করছি।
তাদের একজন বললেন, এখানে যে বাস আসবে সেটা হারামের পেছনের দিকে নামিয়ে দেবে। আপনি ওই সামনের স্টপেজে গিয়ে দাঁড়ান। ওখানে ৫ নম্বর একটা বাস আসবে। ওই বাসে করে গেলে আপনি মসজিদে হারামের গেটের কাছে গিয়ে নামতে পারবেন।
পাকিস্তানি দোকানদারদের ধন্যবাদ জানিয়ে কয়েক কদম সামনের স্টপেজে গিয়ে দাঁড়ালাম। এটা আমি আগেও খেয়াল করেছি, মক্কা-মদিনার সব মানুষ ওমরার যাত্রী বা হাজিদের যে কোনও সহযোগিতা করার জন্য মুখিয়ে থাকে। হয়তো তারাও এটাকে কোনও পুণ্য মনে করেই করে। মানুষকে সাহায্য করার চেয়ে বড় পুণ্য আর কী হতে পারে!
একটু পরই বাস চলে এলো। আমরা বাসে উঠে পড়লাম। এই বাস শুধু হারামের যাত্রীদের জন্য। অন্য যাত্রীরাও যায় অবশ্য। এই সিটি সার্ভিসে কোনও ভাড়া লাগে না। বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে মানুষ উঠছে আবার গন্তব্যে নেমে যাচ্ছে। মক্কায় শত শত এমন সিটি বাস রয়েছে। হাজিরা যেখানে ইচ্ছা এসব বাসে করে যেতে পারে।
১০ মিনিটের মধ্যে আমরা মসজিদে হারাম থেকে একটু দূরে বাস থেকে নেমে পড়লাম। আল্লাহর কাছে শোকরিয়া আদায় করে বললাম, "বিপদে মোরে রক্ষা করো এ নহে মোর প্রার্থনা, বিপদে আমি না যেন করি ভয়।"









