তারাবিহ: এই উম্মাহর রাতের কান্না ও আল্লাহর রহমতের সেতু

জহীর রাইহান 
০৩ মার্চ ২০২৬, ১৬:০৮আপডেট : ০৩ মার্চ ২০২৬, ১৬:০৮

রমজান কেবল দিনের সংযমের নাম নয়— এটি রাতের আরাধনার এক মহিমান্বিত মহাকাব্য। দিনের ক্ষুধা-তৃষ্ণা মানুষকে ভাঙে, আর রাতের তারাবিহ তাকে গড়ে। দিনের সিয়াম যেখানে দেহকে শাসন করে, সেখানে রাতের তারাবিহ আত্মাকে জাগিয়ে তোলে। যেন রমজানের রাতগুলো একেকটি নীরব বিপ্লব— যেখানে মানুষ দাঁড়ায় তার রবের সামনে, আর কাঁদতে কাঁদতে নিজের ভাঙাচোরা হৃদয়টাকে সঁপে দেয় আসমানের মালিকের হাতে। 

তারাবিহ— শব্দটি উচ্চারণ করলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক অপার্থিব দৃশ্য: সারিবদ্ধ মুসল্লি, দীর্ঘ কিয়াম, তিলাওয়াতের মধুর সুর, আর নিঃশব্দ অশ্রুতে ভিজে যাওয়া জায়নামাজ। এটি কেবল একটি নফল সালাত নয়; বরং এটি উম্মাহর রাতের কান্না, আর আল্লাহর রহমতের দিকে প্রসারিত এক আলোকিত সেতু। 

তারাবিহ: রাতের নিঃশব্দ বিপ্লব 

মানুষের জীবনে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন সে নিজের ভেতরের শব্দ শুনতে পায়। দিনের কোলাহল, দুনিয়ার ব্যস্ততা, অর্থ-উপার্জনের প্রতিযোগিতা— সবকিছু থেমে যায়। তারাবীহ সেই থেমে যাওয়ার নাম।  

এশার ফরজের পর যখন ইমাম কিরাত শুরু করেন, তখন মনে হয়— দুনিয়ার সব দরজা বন্ধ হয়ে গেছে, খুলে গেছে শুধু আসমানের দরজা। মানুষের চোখ নিচে, কিন্তু হৃদয় ওপরে— আরশের দিকে। 

এই সালাত দীর্ঘ— ২০ রাকাত। কিন্তু আশ্চর্য! দুনিয়ার কাজে মানুষ যত ক্লান্ত হয়, তারাবীহে তত প্রশান্ত হয়। কারণ এখানে দেহ দাঁড়ায়, কিন্তু আত্মা উড়ে যায়। 

কুরআনের সঙ্গে পুনর্মিলনের রাত 

তারাবিহ হলো কুরআনের রাত।  

রমজান যে কুরআন নাজিলের মাস— তারাবীহ সেই নাজিলের স্মৃতি পুনর্জীবিত করে। পুরো মাসজুড়ে যখন খতমে কুরআন শোনা হয়, তখন মুসল্লি শুধু তিলাওয়াত শোনে না— সে ইতিহাস শোনে, হিদায়াত শোনে, নিজের জীবনের প্রতিচ্ছবি শোনে। 

কখনো জান্নাতের আয়াত শুনে হৃদয় নেচে ওঠে, কখনো জাহান্নামের আয়াতে কেঁপে ওঠে বুক। কখনো নবীদের ধৈর্য শুনে লজ্জা পায়, কখনো মুনাফিকদের পরিণতি শুনে শিউরে ওঠে।  

তারাবিহ এভাবেই মানুষকে কুরআনের কাছে ফিরিয়ে আনে— শুধু পাঠক হিসেবে নয়, বরং চরিত্র নির্মাণের ছাত্র হিসেবে। 

উম্মাহর সম্মিলিত অশ্রুধারা 

তারাবিহের একটি অনন্য সৌন্দর্য হলো— এটি একক ইবাদত হয়েও সম্মিলিত কান্নার নাম। একজন ধনী, একজন গরিব, একজন শিক্ষিত, একজন অশিক্ষিত— সবাই একই কাতারে দাঁড়ায়। এখানে কোনও পদমর্যাদা নেই, কোনও সামাজিক শ্রেণি নেই। ইমাম যখন রহমতের আয়াত পড়েন— সবাই আশা করে। 

যখন আযাবের আয়াত পড়েন—সবাই ভয় পায়। এই সম্মিলিত আবেগই উম্মাহর ঐক্যের এক জীবন্ত প্রতীক। তারাবিহ যেন বলে— “তোমরা ভিন্ন নও, তোমরা এক দেহ; তোমাদের কান্নাও এক, তোমাদের রবও এক।”  

দীর্ঘ কিয়ামের আধ্যাত্মিক রহস্য 

তারাবিহ দীর্ঘ হয়— এটাই তার সৌন্দর্য। মানুষ সাধারণত সংক্ষিপ্ত ইবাদতে অভ্যস্ত। কিন্তু তারাবিহ মানুষকে দাঁড়াতে শেখায়— শুধু শরীর দিয়ে নয়, ধৈর্য দিয়ে।

দীর্ঘ কিয়াম মানুষকে তিনটি শিক্ষা দেয়— 

১) ধৈর্য— দীর্ঘ সময় দাঁড়ানো মানে আত্মাকে ধৈর্যের প্রশিক্ষণ দেওয়া।

২) মনোসংযোগ — দীর্ঘ তিলাওয়াত শুনতে শুনতে হৃদয় একাগ্র হয়।

৩) আত্মসমর্পণ — ক্লান্তি সত্ত্বেও দাঁড়িয়ে থাকা মানে রবের সামনে নিজেকে বিলীন করা। 

এ কারণেই সালাফরা তারাবীহকে “রাতের জিহাদ” বলতেন— নফসের বিরুদ্ধে জিহাদ। 

তারাবিহ: গুনাহ ধোয়ার অশ্রুস্নান 

রাতের অন্ধকার মানুষকে সত্যবাদী করে। দিনের মতো অভিনয় তখন থাকে না। তারাবীহে দাঁড়িয়ে অনেকেই নিজের অতীত স্মরণ করে— ভুলে যাওয়া নামাজ, কষ্ট দেওয়া মানুষ, হারাম দৃষ্টি, অবহেলিত দায়িত্ব… 

কুরআনের আয়াত যখন হৃদয়ে আঘাত করে, তখন চোখ ভিজে যায়। আর সেই অশ্রুই হয়ে ওঠে তওবার পানি। 

রাসূল ﷺ বলেছেন— যে ব্যক্তি ঈমান ও সওয়াবের আশায় রমজানে কিয়াম করে, তার পূর্বের গুনাহ মাফ করা হয়। তারাবিহ তাই শুধু সালাত নয়— এটি গুনাহ ধোয়ার এক আধ্যাত্মিক গোসল।  

মসজিদের জীবন্ত জাগরণ 

রমজানের আগে অনেক মসজিদ নির্জীব থাকে। কিন্তু তারাবিহ শুরু হলেই দৃশ্য বদলে যায়। মসজিদ ভরে যায় কুরআনের সুরে, শিশুর কোলাহলে, তরুণের আগ্রহে, বৃদ্ধের অশ্রুতে। এ যেন উম্মাহর রাতের পুনর্জাগরণ। তারাবীহ মসজিদকে শুধু ইবাদতের স্থান বানায় না— এটি বানায় হৃদয়ের মিলনমেলা। এখানে মানুষ আল্লাহর জন্য আসে, কিন্তু একে অপরের সঙ্গেও হৃদয়ের বন্ধন গড়ে ওঠে। 

পারিবারিক ও প্রজন্মগত প্রভাব 

তারাবিহ শুধু ব্যক্তিকে বদলায় না— পরিবারকেও বদলায়। বাবা ছেলেকে নিয়ে মসজিদে যায়, মা মেয়েকে নামাজে দাঁড় করায়। শিশুরা প্রথমবার দীর্ঘ সালাতের স্বাদ পায়। এই অভিজ্ঞতা তাদের মনে আজীবন থেকে যায়। অনেক আলেমের জীবনকাহিনি পড়লে দেখা যায়— তাদের ঈমানি জাগরণের সূচনা হয়েছিল শৈশবের তারাবিহ থেকেই। 

রাতের নিঃসঙ্গতায় আল্লাহর সান্নিধ্য  

যারা জামাতে পড়ে, তারা রহমতের সাগরে ভাসে। আর যারা একা পড়ে—তারা সান্নিধ্যের স্বাদ পায়।  

রাত গভীর হলে, মানুষ ঘুমিয়ে গেলে, কেউ কেউ আবার দাঁড়ায় তাহাজ্জুদে। তারাবীহ তাদের প্রস্তুত করে সেই গভীর রাতের সাক্ষাতের জন্য। এ সময় দোয়া অন্যরকম হয়— কণ্ঠ কাঁপে, ভাষা ভেঙে যায়, চোখ ভিজে যায়। মনে হয়— আল্লাহ খুব কাছে। 

তারাবিহ: জান্নাতের পথে আলোকিত সেতু 

তারাবিহকে “রহমতের সেতু” বলা হয়— কারণ এটি বান্দাকে সরাসরি আল্লাহর রহমতের সাথে যুক্ত করে।  

প্রতিটি সিজদা যেন এক ধাপ সামনে। প্রতিটি রাকাত যেন এক টুকরো নূর। মাস শেষে মানুষ যখন পেছনে তাকায়, দেখে— সে আগের মানুষটি নেই। তার হৃদয় নরম হয়েছে, চোখ সহজে ভিজে, কুরআনের প্রতি ভালোবাসা বেড়েছে।  

তারাবিহ শেষে যে শূন্যতা 

রমজান শেষ হলে মানুষ সবচেয়ে বেশি যার অভাব সবচেয়ে অনুভব করে— তা হলো তারাবিহ। মসজিদের সেই রাত, কুরআনের সুর, ইমামের কান্না— সব হঠাৎ থেমে যায়। এই শূন্যতাই প্রমাণ করে— তারাবীহ কেবল ইবাদত ছিল না; এটি ছিল হৃদয়ের খাদ্য। 

রাতের কান্না বৃথা যায় না 

তারাবিহ আমাদের শেখায়— দিনে আমরা মানুষ, রাতে আমরা বান্দা। দিনে আমরা কর্মী, রাতে আমরা প্রার্থনাকারী। এই সালাত উম্মাহকে কান্না করতে শেখায়— আর আল্লাহ কান্নাকে ভালোবাসেন।  

যে রাতগুলোতে আমরা দাঁড়াই, কাঁদি, কুরআন শুনি— সেই রাতগুলো কখনো হারায় না। সেগুলো সংরক্ষিত থাকে আরশের দরবারে, রহমতের নূরের খাতায়। হয়তো কিয়ামতের দিন, যখন আমল কম পড়ে যাবে— সেই তারাবীহের রাতগুলো সামনে এসে দাঁড়াবে, বলবে— “হে আল্লাহ! এই বান্দা আপনার সামনে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়েছিল, কেঁদেছিল— আপনি তাকে ফিরিয়ে দেবেন?” 

আর তখনই রহমতের দরজা খুলে যাবে।  

তারাবিহ তাই শুধু রাতের সালাত নয়— এটি উম্মাহর কান্না, কুরআনের সুর, আত্মার পুনর্জন্ম, আর আল্লাহর রহমতের দিকে প্রসারিত এক আলোকোজ্জ্বল সেতু। 

 

লেখক: মুহাদ্দিস ও নায়েবে মুফতি, দারুল উলুম ঢাকা, মিরপুর— ১৩ 

/এসটি/ 
সম্পর্কিত
বায়তুল মোকাররমে ঈদের প্রথম জামাত অনুষ্ঠিত
জাতীয় ঈদগাহে আসতে শুরু করেছেন মুসল্লিরা
কলকাতার রেড রোডে হচ্ছে না ঈদের জামাত
সর্বশেষ খবর
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
বাসায় ফিরে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন আ.লীগের আইভী
বাসায় ফিরে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন আ.লীগের আইভী
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম