আজ আ. লীগের ৬৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী

৫১ বছর কেটেছে আন্দোলন-সংগ্রামে, ১৬ বছর রাষ্ট্রক্ষমতায়

বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট
২৩ জুন ২০১৬, ০৩:১৫আপডেট : ২৩ জুন ২০১৬, ১২:১৬

আওয়ামী লীগ আজ ২৩ জুন, আওয়ামী লীগের ৬৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী।  ১৯৪৯ সালের এই দিনে পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী রোজ গার্ডেনে দলটি প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ে সংগঠনের নাম ছিল আওয়ামী মুসলিম লীগ। পরবর্তী সময়ে মুসলিম শব্দটি বাদ দিয়ে ‘আওয়ামী লীগ’ নামকরণ করা হয়।  প্রতিষ্ঠার পর থেকেই পাকিস্তানি সামরিক শাসন, জুলুম, অত্যাচার-নির্যাতন ও শোষণের বিরুদ্ধে সব আন্দোলন-সংগ্রামে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে আওয়ামী লীগ।  
৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ৫৪-এর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, আইয়ুবের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন, ৬৬-এর ছয় দফা আন্দোলন, ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান ও ’৭১-র মহান মুক্তিযুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়া আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব দেয়। ধীরে ধীরে বাঙালি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে স্বাধীনতার লালসূর্য ছিনিয়ে আনে। ৬৭ বছরের মধ্যে ৫১ বছরই অধিকার আদায়ের আন্দোলন সংক্রামের ভেতর দিয়ে চলতে হয়েছে আওয়ামী লীগকে। বাকি ১৬ বছর রাষ্ট্র ক্ষমতায় থেকে জনগণের ভাগ্য বদলে আত্মনিয়োগ করে আওয়ামী লীগ। এরমধ্যে সাড়ে তিন বছর রাষ্ট্র ক্ষমতায় ছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিন দফায় সাড়ে ১২ বছর রাষ্ট্র ক্ষমতা হাতে নিয়ে দেশ পরিচালনায় রয়েছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। তবে ক্ষমতায় থাকলেও নির্বিঘ্ন ছিল না পথচলা। নানা চক্রান্ত-ষড়যন্ত্র অব্যাহত ছিল।

মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় রাষ্ট্রনায়ক বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার ভেতর দিয়ে স্বাধীন বাংলায় প্রথম চক্রান্তের শিকার হয় আওয়ামী লীগ। তারপর ১৯৮১ সালে দেশে ফিরে দলের দায়িত্ব নিয়ে বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা দ্বিধা-বিভক্ত আওয়ামী লগিকে ঐক্যবদ্ধ করেন।

আওয়ামী লীগের প্রথম সভাপতি ছিলেন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। প্রথম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন শামসুল হক। শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক।

আন্দোলনে সংগ্রামে নেতৃত্ব

১৯৪৯ সালের প্রতিষ্ঠার পর থেকেই নানা আন্দোলন-সংগ্রাম করেছে আওয়ামী লীগ। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধসহ প্রতিটি গণতান্ত্রিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে এসেছে দলটি। এটিই ছিল তদানীন্তন পাকিস্তানে প্রথম কার্যকর বিরোধী দল। ওই সময় কয়েকটি রাজনৈতিক দলের অস্তিত্ব থাকলেও, সেগুলো বাংলার গণমানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিনিধিত্বকারী  সংগঠন হিসেবে দাঁড়াতে পারেনি। ওই সময় সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক লক্ষ্যে আর্থ-সামাজিক কর্মসূচির ভিত্তিতে সংগঠিত করা এবং মুসলিম লীগের বিকল্প গড়ে তোলার তাগিদ সৃষ্টি হয়। এই বাস্তবতা থেকেই উৎসারিত হয় আওয়ামী লীগের মতো একটি জাতীয় রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার অপরিহার্যতা। মূলত সংগ্রামের মধ্য দিয়েই আওয়ামী লীগের জন্ম।

ছয় দফা ও স্বাধীনতার বীজ বপণ

ছয় দফা আন্দোলন বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। ১৯৬৬ সালে ৫ ও ৬ ফেব্রুয়ারি লাহোরে অনুষ্ঠিত বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর এক সম্মেলনে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ৬ দফা দাবি পেশ করেন। ছয় দফা দাবির মূল উদ্দেশ্য- পাকিস্তান হবে একটি ফেডারেল রাষ্ট্র এবং ছয় দফা কর্মসূচির ভিত্তিতে এই ফেডারেশন বা যৌথরাষ্ট্রের প্রতিটি অঙ্গরাজ্যকে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন দিতে হবে। পরবর্তী সময়ে এই ৬ দফা দাবিকে কেন্দ্র করে স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলন জোরদার করা হয়। ছয় দফাই স্বাধীনতার লাল সূর্য এনে দেয়।

ঊন সত্তরের গণঅভ্যুত্থান

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে বাংলাদেশের রাজনীতিক সংগ্রামের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান। এক দশকের বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা আইয়ুব খান সরকারের পতন ঘটে এই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে। এই সময়ে  আওয়ামী লীগসহ আরও কিছু ছাত্র সংগঠন এক সঙ্গে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে তাদের ঐতিহাসিক এগারো দফা কর্মসূচি পেশ করে। যা মূলত বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনকে সহায়তা করে।

৭০’র নির্বাচনে স্বাধীনতার পক্ষে গণরায়

গণআন্দোলন ও আইয়ুবের পতনের পটভূমিতে ৭০-এর নির্বাচনে কেন্দ্রীয় আইনসভায় (জাতীয় পরিষদ) পূর্ব পাকিস্তান থেকে ১৬৯ আসনের মধ্যে ১৬৭ আসন লাভ করে আওয়ামী লীগ। ৩১৩ আসন-বিশিষ্ট পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে এবং সরকার গঠনে ও শাসনতন্ত্র প্রণয়নের যোগ্যতা অর্জন করে। প্রাদেশিক পরিষদের আসনের মধ্যে ২৮৮ আসন পায় দলটি। জাতীয় পরিষদের সাতটি মহিলা আসন এবং প্রাদেশিক পরিষদের দশটি মহিলা আসনের সবগুলোতেই জয়ী হয় আওয়ামী লীগ। সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও আওয়ামী লীগকে সরকার গঠনে আমন্ত্রণ জানানোর পরিবর্তে সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খান সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে বাঙালির অধিকার নস্যাৎ করার পথ বেছে নেয়।

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ ও মুক্তিযুদ্ধের ডাক

অসহযোগ আন্দোলন, ৭ মার্চের দিক-নির্দেশনামূলক ঐতিহাসিক ভাষণ, বাংলার মানুষের অকাতরে আত্মদানের পরও শান্তিপূর্ণ সব পথ বন্ধ হয়ে যায়। পাকিস্তানি সামরিক জান্তা শান্তিপ্রিয় বাঙালির ওপর কাপুরুষোচিত হামলা চালায়। ১৯৭১-এর ২৬ মার্চে প্রথম প্রহরে গ্রেফতারের পূর্ব মুহূর্তে বঙ্গবন্ধু আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।  শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। এর নেতৃত্ব দেয় আওয়ামী লীগ। দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর স্বাধীন হয় বাংলাদেশ।

বঙ্গবন্ধুকে হত্যা

স্বাধীনতার পরে ১৯৭২ সালের ১৯ জানুয়ারি দেশে ফিরে বঙ্গবন্ধু যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে সোনার বাংলায় পরিণত করতে কাজ শুরু করেন। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট হত্যা করা হয় স্বাধীনতার মহানায়ক জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট কালরাতে সপরিবারে তাকে হত্যা করে ঘাতকরা। জেলখানায় জাতীয় চারনেতাকে হত্যার মাধ্যমে এই সংগঠনটিকে নিশ্চিহ্ন করার অপচেষ্টা চালানো হয়। পরে শুরু হয় সামরিক শাসন। এ সময় স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনেও রাজপথে নামে আওয়ামী লীগ। এভাবে সবসময় নানা আন্দোলন-সংগ্রামে রাজপথে থেকেছে এ দলটি।

শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের এগিয়ে চলা

 ১৯৮১ সালের ১৭ মে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা দেশে ফিরে আসেন। এ সময় তিনি আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হয়ে সংগঠনকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেন। দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত ঘুরে বেড়ান। শেখ হাসিনার দৃঢ় নেতৃত্বে নেতাকর্মীরাও আবারও নবউদ্যামে সংগঠিত হয়। আবারও শুরু হয় রাজপথের আন্দোলন সংগ্রাম। নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে দলটি।

রাষ্ট্র ক্ষমতা

১৯৯৬ সালের নির্বাচনে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে জয়ী হয়ে ২৩ জুন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফিরে আসে। শেখ হাসিনা সরকার গঠন করে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ বিনির্মাণে অগ্রণী ভূমিকা রাখে। ২০০১ এবং ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারির পর আর এক দফা বিপর্যয় কাটিয়ে ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নির্বাচনে তিন-চতুর্থাংশ আসনে বিজয়ী হয়ে আবারও রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পায় দলটি। ২০০৮ সালে পুনরায় সরকার গঠন করে ‘রূপকল্প ২০২১’-এর আলোকে মধ্যম আয়ের সুখী-সমৃদ্ধশালী ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের স্বপ্ন দেখান শেখ হাসিনা। ২০১৪ সালে তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা ‘রূপকল্প ২০৪১’-এর আলোকে বাংলাদেশকে একটি উন্নত, সমৃদ্ধ, আধুনিক বাংলাদেশ বিনির্মাণের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচি

আওয়ামী লীগের ৬৭বছর পূর্তি উপলক্ষে দলের দফতর সম্পাদক আব্দুস সোবহান গোলাপ স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে দিনব্যাপী কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সকালে সূর্যোদয়ের সময় দলীয় কার্যালয়ে পতাকা উত্তোলন, সকাল সাড়ে আটটায় ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে পুষ্পমাল্য অর্পন এবং বিকাল আড়াই টায় বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আওয়ামী লীগের উদ্যোগে আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। আওয়ামী লীগ সভাপতি ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে সভায় জাতীয় ও দেশ বরেণ্য ব্যক্তিবর্গ আলোচনা করবেন। এদিকে দলের সাধারণ সম্পাদক ও জনপ্রশাসনমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম প্রতিষ্ঠার গৌরবোজ্জ্বল ৬৭ বছর পূর্তিতে কর্মসূচি মাধ্যমে যথাযোগ্য মর্যাদায় প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী পালন করার জন্য আওয়ামী লীগ, সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের সকল জেলা, উপজেলাসহ সকল স্তরের নেতা-কর্মী, সমর্থকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

আরও পড়ুন:


আড়ালেই থেকে যাচ্ছে ‘ক্রসফায়ারে’র মূল গল্প

জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদকে প্রশ্রয় দেবো না, সিদ্ধান্ত নিয়েছি: প্রধানমন্ত্রী

/পিএইচসি/এমএনএইচ/

সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম