আগামী ১৫ অক্টোবর শেষ হচ্ছে ছাত্রদলের বর্তমান কমিটির দু’বছর। এরই মধ্যে নতুন কমিটিতে স্থান পেতে তৎপর হয়েছেন সংগঠনটির কয়েকজন নেতা। এই তৎপরতা আরও দৃশ্যমান হবে এ মাসের ২২ সেপ্টেম্বরের পর। এদিন বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া দেশে ফিরলেই নতুন কমিটি গঠনের বিষয়ে মাঠে নামবেন ছাত্রদলের একাধিক নেতা। এখন তারা প্রস্তুতি নিয়েছেন। ঘরোয়াভাবে শুরু করেছেন আলোচনা। সংগঠনের একাধিক নেতার সঙ্গে আলাপকালে এসব তথ্য জানা গেছে।
সূত্র জানায়,আগামী জানুয়ারি মাসে রাজপথে কর্মসূচি দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে বিএনপির। এক্ষেত্রে ছাত্রদলের নতুন কমিটি হলে আন্দোলনে নতুন উদ্যম আসার সম্ভাবনা আছে বলে মনে করেন দলটির নেতারা। এই হিসেবে ডিসেম্বরের শেষ দিন প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সমাবেশ ও নতুন বছরের প্রথম প্রহরে ছাত্রদলের নতুন কমিটি ঘোষণা হতে পারে, এমন আশা বিএনপির সূত্রের।
সৌদি বিএনপির একটি অসমর্থিত সূত্রের দাবি, ইতোমধ্যে ছাত্রদলের কমিটি নিয়ে সৌদি আরবে খালেদা-তারেক আলোচনা হয়েছে। বিএনপির সাংগঠনিক ও পরবর্তী আন্দোলন এবং মধ্যবর্তী নির্বাচন নিয়ে বৈঠকে ছাত্রদলের মেয়াদ শেষের বিষয়টিও স্থান পায়।
বিএনপির সাংগঠনিক দায়িত্বপ্রাপ্ত ও ভাইস চেয়ারম্যান মুহাম্মদ শাহজাহান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের সাংগঠনিক তৎপরতা স্থিমিত থাকে কমিটি নিয়মিত না করার কারণে। এখন চেষ্টা করছি, সবগুলো কমিটিই নিয়মিত করতে। সেক্ষেত্রে ছাত্রদলের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই চিন্তা-ভাবনা চলছে। তবে ঈদের ছুটি থাকায় বিষয়গুলো নিয়ে চূড়ান্ত কোনও আলোচনা বা এ ধরনের কোনও সিদ্ধান্ত এখনও হয়নি। ম্যাডামও হজে আছেন। তিনি ফিরলে এ নিয়ে কথাবার্তা হবে। আশা করছি, সময়মতোই ছাত্রদলের কমিটি হবে।’
২০১৪ সালের ১৪ অক্টোবর রাজিব আহসানকে সভাপতি, আকরামুল হাসানকে সেক্রেটারি জেনারেল করে নতুন কমিটি ঘোষিত হয়। এরপর চলতি বছরের ৬ ফেব্রুয়ারি কমিটি পূর্ণাঙ্গ হয়।
ছাত্রদল সূত্র জানায়, এরই মধ্যে বর্তমান সেক্রেটারি আকরামুল হাসান, সিনিয়র সহ সভাপতি মামুনুর রশীদ মামুন, প্রথম সহ সভাপতি এজমল হোসেন পাইলটসহ কয়েকজন নতুন সভাপতি হিসেবে নিজেদের দেখতে চাইছেন। নিজেদের গণ্ডির ভেতরে আলোচনাও শুরু করেছেন। যদিও তারা প্রকাশ্যে এ নিয়ে মুখ খুলছেন না। এর বাইরে সহ-সভাপতি ইখতিয়ার কবীর, মামুন বিল্লাহ, যুগ্ম সম্পাদক আসাদুজ্জামান আসাদ, বায়েজিদ আরেফিন, মিজানুর রহমান সোহাগ, মিয়া রাসেল, নুরুল হুদা বাবু, মফিজুল ইসলাম আশিকও লবিং শুরু করেছেন।
এ নিয়ে জানতে চাইলে তাদের অনেকেই এই মুহূর্তে নতুন কমিটি নিয়ে মন্তব্য করতে চাননি।।একজন সম্ভাব্য সভাপতি প্রার্থী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ধরে নিতে পারেন, আমি শুরু করেছি। ম্যাডাম আসলে আরও জোরদার হবে।
ছাত্রদল সূত্র জানায়, ইতোমধ্যে বর্তমান সেক্রেটারি আকরামুল হাসান সভাপতি হতে আগ্রহ দেখিয়েছেন। যদিও ছাত্রদলের বিগত হেলাল-বাবু, টুকু-আলীম, জুয়েল-হাবিব কমিটির কেই-ই পরবর্তী কমিটিতে স্থান পাননি। এ কারণে তার সম্ভাবনা কম। এছাড়া বর্তমান কমিটির সভাপতি রাজিব আহসান, সেক্রেটারি আকরাম ও সিনিয়র সহ সভাপতি মামুনুর রশীদকে বিএনপির জাতীয় কমিটিতে মনোনিত করেছেন খালেদা জিয়া। ধারণা করা হচ্ছে, তাদের তিনজনকেই রাজনীতির বড় পরিমণ্ডলে দেখতে চান বিএনপি প্রধান।
ছাত্রদলের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার এক নেতার দাবি, রাজিব, আকরাম ও মামুন-এ তিনজনকে এখন ছাত্রদলের নেতা মানাই মুশকিল। তারা তো এখন মূল দলের অংশীদার। সেখানেই তাদের উপযুক্ত জায়গা। আন্দোলনের ক্ষেত্রে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা তাদের খুব একটা গুরুত্ব দিচ্ছেন না।
তবে কেন্দ্রীয় কমিটির এক যুগ্ম সম্পাদক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, সভাপতির নামে ৪০ টির বেশি মামলা রয়েছে। আর সাধারণ সম্পাদক আকরাম কোনোদিনই দৃশ্যমান কোনও কর্মসূচিতে অংশ নেন নি। সভাপতি জেল খাটলেও সাধারণ সম্পাদক ছিলেন একেবারেই ধরাছোঁয়ার বাইরে।
ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদকের একজন ঘনিষ্ট কর্মী জানান, আকরামুল হাসানের নরসিংদী থেকে সংসদ নির্বাচন করার ইচ্ছা আছে। আগামীতে তিনি চেষ্টা করতে পারেন। সেক্ষেত্রে ছাত্রদলের দায়িত্বে নাও থাকতে পারেন আকরাম। এছাড়া ভোলার একটি আসন থেকে রাজিব আহসানও নির্বাচন করার ইচ্ছা পোষণ করতে পারেন। তবে মামুনের এলাকাটি ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দীন খোকনের হওয়ায় স্থানীয় রাজনীতি থেকে বিমুখ রয়েছেন তিনি।
ছাত্রদল সূত্র জানায়, গত ৩১ জানুয়ারি সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আলোচনা সভায় ছাত্রদলের অভিভাবক খালেদা জিয়া নির্দেশ দিয়েছিলেন, ছাত্রদের স্বার্থ নিয়ে ছাত্রদলকে কাজ করতে। পাশাপাশি ব্যানার, লিফলেট, স্লোগানেও পরিবর্তন আনতে। ওই সময় তিনি ছাত্রদলের উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তোমাদেরও পরিবর্তন হতে হবে। খালি স্লোগান দিলেই চলবে না। কাজ করতে হবে। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কাজ করতে হবে। শিক্ষার অধিকার নিয়ে কথা বলতে হবে।’ যদিও কমিটির মেয়াদ শেষ হলেও এ ধরনের কর্মসূচিতে নিজেদের সম্পৃক্ত করেনি ছাত্রদলের বর্তমান নেতৃত্ব।
সূত্রের দাবি, তারেক রহমান ও খালেদা জিয়ার মামলা ও রায়কেন্দ্রিক কিছু কর্মসূচি দিলেও ছাত্রদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট কোনও বিষয়ে আগ্রহ দেখায়নি ছাত্রদল। এক্ষেত্রে বর্তমান নেতৃত্বকে সময় না দেওয়ার পক্ষে বিএনপির নীতিনির্ধারকরা।
ছাত্রদলের সম্পাদকীয় পদের এক নেতা বলেন, আমরা আশা করছি, এবার প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে জানুয়ারির প্রথম ভাগেই নতুন কমিটি ঘোষণা হবে। পরবর্তী বছরে আন্দোলন-সংগ্রামে অভিজ্ঞদের বাইরে নতুনদের সুযোগ দিতে অপারগ বিএনপির একাধিক নেতা।
কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে এবারও অভিজ্ঞ ও রাজনৈতিকভাবে তুলনামূলক বিচক্ষণ নেতাদেরকেই সামনে আনার চিন্তা-ভাবনা চলছে। শীর্ষ নেতাদের মধ্যে অভিজ্ঞ রেখে সম্পাদকীয় পদে তুলনামূলক তরুণ নেতাদের প্রাধান্য দেওয়া হতে পারে, এমন সম্ভাবনার কথা জানান সংগঠনের সাবেক এক সভাপতি।
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও সাবেক ছাত্রদলনেতা শামসুজ্জামান দুদু বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ছাত্রদলের মেয়াদ শেষ হচ্ছে, এটা ঠিক। কিন্তু এখনও এ ব্যাপারে আলোচনা হয়নি। ম্যাডাম দেশে ফিরলেই সম্ভবত বিষয়টি আলোচনা হবে। এর আগে বলা মুশকিল, কমিটি কোন আঙ্গিকে হবে।’
ছাত্রদলের দপ্তর সম্পাদক আবদুস সাত্তার পাটোয়ারি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কমিটি করার একমাত্র অধিকার ম্যাডাম খালেদা জিয়ার। তিনি যদি ভাবেন, চলমান কমিটি দিয়েই আরও কিছুদিন চলবে। বিগত দিনে যেটুকু আন্দোলন-সংগ্রাম হয়েছে, ভবিষ্যতেও তা থাকবে। আর যদি তিনি ভাবেন, সময় শেষ হচ্ছে নতুন কমিটি দেবেন, তাহলেও আমরা স্বাগত জানাব। আমরা ম্যাডামের ওপর আস্থাশীল। ’
/এপিএইচ/আপ-এআর/








