সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টি আশা প্রকাশ করেছে, রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ একজন প্রজ্ঞাবান ব্যক্তি। চলমান রাজনৈতিক সংকট ও দলগুলোর মধ্যে বিরাজমান দূরত্ব কমিয়ে আনতে ভূমিকা পালন করবেন। সব দলের মধ্যে অনৈক্য দূর করে দেশকে এগিয়ে নেবেন। পাশাপাশি চলতি সংসদেই আইন করতে রাষ্ট্রপতির হস্তক্ষেপ চেয়েছেন দলটির নেতারা। বঙ্গভবনে নির্বাচন কমিশন গঠনে সংলাপ শেষে (২০ ডিসেম্বর) মঙ্গলবার সন্ধ্যায় রাজধানীর কাকরাইলে জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে দলটির নেতারা এসব আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
প্রেস ব্রিফিং করেন পার্টির মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদার। এছাড়া সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নে উত্তর দেন সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান রওশন এরশাদ, কো-চেয়ারম্যান জিএম কাদের।
এক প্রশ্নের জবাবে বিরোধীদলীয় নেত্রী ও জাপার সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান রওশন এরশাদ বলেন, দেশে গণতন্ত্র সুপ্রতিষ্ঠিতই আছে। নির্বাচন কমিশনের (ইসি) মেয়াদ শেষ হচ্ছে। নতুন করে ইসি গঠনে রাষ্ট্রপতির উদ্যোগ ইতিবাচক। তার সঙ্গে আমাদের আন্তরিক পরিবেশে কথা হয়েছে। রাষ্ট্রপতি আন্তরিকতার সঙ্গেই ইসি গঠনে উদ্যোগী হবেন বলেও জানান রওশন এরশাদ।
এর আগে মঙ্গলবার (২০ ডিসেম্বর) বিকাল পৌনে তিনটায় জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নেতৃত্ব ১৮ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। প্রায় এক ঘণ্টা ৩৭ মিনিটের এই বৈঠকে তারা নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে ২৬ নভেম্বর এরশাদপ্রদেয় প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করেন। ১৮ সদস্যের প্রতিনিধি দলে জাপার প্রেসিডিয়ামের সদস্যরাও ছিলেন।
এরপর সন্ধ্যায় প্রেস ব্রিফিংয়ে রুহুল আমিন হাওলাদার বলেন, রাষ্ট্রপতি ও পার্টির চেয়ারম্যানের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক হয়েছে। অত্যন্ত আন্তরিক, সৌহার্দ্যপূর্ণ ও মনোরম পরিবেশে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
বৈঠকের ফল নিয়ে হাওলাদার বলছিলেন, আমরা আশাবাদী, জাতীয় নির্বাচন ও দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে আজকের এই সংলাপ প্রভাব ফেলবে। রাষ্ট্রপতির সঙ্গে আলোচনার মধ্য দিয়ে চলমান আস্থাহীনতা ও সংশয় দূর করতেও সম্ভব হবে।
নির্বাচন কমিশন গঠনে সার্চ কমিটির জন্য কোনও নাম প্রস্তাব করা হয়েছে কিনা, জানতে চাইলে রুহুল আমিন বলেন, রাষ্ট্রপতি নাম চাননি। তিনি চাইলে দেবো। এ ব্যাপারে আলোচনা করতে রাষ্ট্রপতি ডাকলে আমরা আবার যাবো।
বৈঠকে রাষ্ট্রপতির মনোভাব কেমন ছিল- সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নে জাপার মহাসচিবের ভাষ্য, মঙ্গলবারের বৈঠকে রাষ্ট্রপতির ওপর আস্থা জন্মেছে। তিনি সুষ্ঠু পদক্ষেপ নেবেন এবং জটিলতা দূর করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দেন জাপার সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান রওশন এরশাদ। বিগত দিনে কাজী রকিব উদ্দিন কমিশনের সমালোচনা করলেও এবার কি প্রত্যাশা করছেন? এক সংবাদকর্মীর এমন প্রশ্নে রওশনের উত্তর, এবার ভালো হবে আশা করি।
গণতন্ত্র দেশে কতটুকু রয়েছে-আরেক সাংবাদিকের প্রশ্নে রওশন বলেন, দেশে গণতন্ত্র সংহত ও সুপ্রতিষ্ঠিতই আছে।
সংবাদকর্মীদের প্রশ্ন ছিল দলটির কো-চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ কাদেরের প্রতিও। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ আইন সংস্কারের কথা জানিয়েছে। আমরাও এটিই বলেছি। আমাদের প্রস্তাবেও আইন করার কথা আছে এবং প্রয়োজনে চলতি সংসদেই ইসি গঠনে আইন করার অনুরোধ করেছি রাষ্ট্রপতিকে।
সংবাদ সম্মেলনে প্রেসিডিয়াম সদস্য জিয়া উদ্দিন আহমেদ বাবলু, মশিউর রহমান রাঙা, সৈয়দ আবু হোসেন বাবলাসহ অন্য নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
জাতীয় পার্টির মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদারের সহকারী জসিম উদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, মঙ্গলবারের বঙ্গভবনের প্রতিনিধি দলে ১৮ জন সদস্য গেছেন। তারা হলেন, হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, রওশন এরশাদ, জিএম কাদের, রুহুল আমিন হাওলাদার, প্রেসিডিয়াম সদস্য ব্যারিস্টার আমিনুল ইসলাম মাহমুদ, এম এ সাত্তার, ফিরোজ রশীদ, জিয়া উদ্দিন বাবলু, মশিউর রহমান রাঙা, ফখরুল ইমাম, প্রফেসর দেলোয়ার হোসেন, এসএম ফয়সল চিশতি, তাজুল ইসলাম, এ টি ইউ তাজ রহমান, মেজর (অব.) খালেদ আক্তার, সালমা ইসলাম ও মুজিবুল হক চুন্নু।
সংলাপে চারপৃষ্ঠার একটি প্রস্তাব রাষ্ট্রপতিকে শোনান এরশাদ। তিনি নির্বাচন কমিশন গঠনে ৫ টি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব তুলে ধরেন। প্রস্তাবগুলো হচ্ছে, ১.সংবিধান অনুসারে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং নির্বাচন কমিশন নিয়োগ সংক্রান্ত একটি আইনি কাঠামো প্রণয়ন করা। ২. সেখানে নির্বাচন কমিশনকে সম্পূর্ণ স্বাধীন রাখার বিধান রাখা। ৩. নির্বাচন কমিশনের আলাদা সচিবালয় করা। ৪. বর্তমান সংসদেই এই আইন পাশ করা। ৫. নির্বাচন কমিশনারদের যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা মূল্যায়ণে ৯টি বিষয় বিবেচনায় নেওয়া। এগুলো হচ্ছে: নিরপেক্ষতা, ব্যক্তিগত একাগ্রতা ও সততা, ন্যূনতম ও সর্বোচ্চ বয়স, পেশাগত যোগ্যতা, নির্বাচন সংক্রান্ত বিষয়ে জ্ঞান, শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা, রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় নয়, অন্য অফিসে নিয়োগ বিধি-নিষেধ এবং চারিত্রিক স্বচ্ছতা।
উল্লেখ্য, গত ১৮ নভেম্বর নির্বাচন কমিশন গঠনে বিএনপির পক্ষ থেকে প্রস্তাব দেন খালেদা জিয়া। এরপর ২৬ নভেম্বর জাপা চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত হুসেইন মুহম্মদ এরশাদও ইসি গঠনে প্রস্তাব দেন। তার প্রস্তাবে ইসি গঠনে আইন করারও দাবি ছিল।
এরপর গত ১২ ডিসেম্বর বিএনপিসহ ৫টি রাজনৈতিক দলকে নির্বাচন কমিশন গঠন ইস্যুতে আলোচনার জন্য বঙ্গভবনে আমন্ত্রণ জানিয়ে চিঠি দেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। বিএনপির সঙ্গে আলোচনার মধ্য দিয়ে এই সংলাপ শুরু হয় ১৮ ডিসেম্বর রবিবার। আজ ২০ ডিসেম্বর মঙ্গলবার জাতীয় পার্টির সঙ্গে বসছেন রাষ্ট্রপতি। এরই ধারাবাহিকতায় ২১ ডিসেম্বর (বুধবার) এলডিপি ও কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ ও ২২ ডিসেম্বর জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) (ইনু) সঙ্গে আলোচনায় বসবেন তিনি।
/এসটিএস/টিএন/








