দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের উপস্থিতিতে পরস্পর বাদানুবাদে জড়িয়ে পড়েন ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ। জেলার বিভিন্ন উপজেলার নেতাদের একে অপরকে উদ্দেশ্য করে আক্রমণাত্মক ও পরস্পরবিরোধী বক্তব্যে পরিবেশ ঘোলাটে হয়ে ওঠে। এ সময় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ব্রিবতবোধ করেন।ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে তিনি বলেন, ‘এত ঝগড়া-বাদানুবাদ কেন? একই পরিবারে কাজ করতে গিয়ে মতবিরোধ হতে পারে, কিন্তু ঘরের ভেতরে ঘর কেন? ঘরের ভেতরে ঘর সহ্য করা হবে না।’
মঙ্গলবার ধানমন্ডির প্রিয়াংকা কমিউনিটি সেন্টারে অণুষ্ঠিত ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের যৌথ সভায় এ পরিস্থিতির অবতারণা ঘটে। এতে অনেকটা বিব্রত হন দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের।
জানা গেছে, সাভার উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আলী হায়দার দলীয় নেতাদের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সমালোচনার সূত্রপাত ঘটান। উপস্থিত কেন্দ্রীয় নেতাদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘আপনারা সাভার উপজেলায় আসেন। আমরা মিটিং ডাকি, আপনারা আমাদের কথা শুনবেন। দলের মধ্যে অভ্যন্তরীণ কিছু কোন্দল রয়েছে, যা সংশোধন করে সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করবো।’
ধামরাই উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাখাওয়াত হোসেন সাকু বলেন, ‘বিএনপি-জামায়াতের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ধামরাই আওয়ামী লীগসহ সকল সহযোগী এবং ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনকে ধীরে ধীরে সংগঠিত করে বেনজির আহমেদ (বর্তমান জেলা সভাপতি) ২০০৮ সালের নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে সংসদ সদস্য হন এম এ মালেক। নির্বাচিত হওয়ার কয়েকমাস পর্যন্ত বেনজির এবং মালেক ভাই একসঙ্গে দলীয় প্রোগ্রাম করেছিলেন। কিন্তু হঠাৎ করে দুজন দুপ্রান্তে চলে গেলেন। এ নিয়ে আমরা হতাশায় ভুগছি।’
তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগসহ সহযোগী এবং ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের অবস্থান আগের মত নাই। উপজেলা যুবলীগের সম্মেলন হয় না ১২ বছর ধরে। আর ছাত্রলীগের সম্মেলন হয় না ১৪ বছর ধরে। সংগঠন যদি ঐক্যবদ্ধ না হয়, তাহলে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন কঠিন হয়ে যাবে।’
জেলা সভাপতি বেনজীর আহমেদকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, ‘আপনি কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে গ্রুপিং নিরসনের চেষ্টা করুন।’
সাভার উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হাসিনা দৌলা বলেন, ‘আমরা দীর্ঘদিন ধরেই রাজনীতি করছি। রাজনীতির জন্য শ্রম, ঘাম এবং অর্থ ব্যয় করলাম, কিন্তু হঠাৎ করে আপনারা (কেন্দ্রীয় নেতা) সংসদ সদস্য বানিয়ে দেন। আপনারা কি আমাদের মতো মানুষদের চোখে দেখেন না। আমরা কি যোগ্যতার সঙ্গে রাজনীতি করি নাই?’
তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমাকে দিয়ে সকল কাজ করিয়েছেন। আর হঠাৎ মুরাদ জংকে এমপি (২০০৮ সালের নির্বাচন) বানিয়ে দিলেন। আবার বানালেন এনামুর রহমানকে, যাকে আমরা জানি না ও চিনি না।’
ধামরাই পৌরসভার মেয়র গোলাম কবির বলেন, ‘ধামরাই আওয়ামী লীগে আগে দ্বন্দ্ব ছিল না। কিন্তু এখন অনেক দ্বন্দ্ব দেখা যাচ্ছে। এ দ্বন্দ্ব মিটিয়ে ফেললে আগামী নির্বাচনেও বিপুল ভোটে আওয়ামী লীগের প্রার্থী বিজয়ী হবে।’
দোহার উপজেলা চেয়ারম্যান আলমগীর হোসেন বলেন, ‘বর্তমান সভাপতি মণ্ডলীর সদস্য আব্দুল মান্নান সাহেব যখন মন্ত্রী ছিলেন, তখন তার কথা মতো সংগঠন চলতো, নেতারা পদ-পদবী পেতো। আবার যখন মান্নান ভাই এমপি হলেন না, তখন জেলার সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুর রহমানের পছন্দমতো নেতাকর্মীরা দলে পদ পেয়েছেন। যদি এ কমিটিগুলো দলীয় গঠনতন্ত্র মেনে করা হয়, তাতে দল শক্তিশালী হবে। আগামী নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী বিজয়ী হবে।’
উপস্থিত একজন নেতা বলেন, নবাবগঞ্জে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক অবস্থান অনেক দুর্বল। সারা দেশে যেখানে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের জয়জয়কার সেখানে পাঁচটি ইউপিতে আমাদের ভরাডুবি হয়েছে। যদি দোহার-নবাবগঞ্জের আসন পুনরুদ্ধার করতে হয়, তবে দলের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি করতে হবে।’
ধামরাই উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সংসদ সদস্য এমএ মালেক বলেন, ‘ধামরাই উপজেলা আওয়ামী লীগে বিভেদ আছে, তা সত্য। কি কারণে এ বিভেদ তা আমি বলতে চাই। উপজেলা নির্বাচনে প্রার্থী নির্বাচনের জন্য আমি যৌথসভা ডাকি। তখন সবাই বললো বেনজির আহমেদ ও আমি যাকে বলবো তিনিই প্রার্থী হবেন। আমি বললাম না বেনজীর ভাই যাকে বললেন তিনিই প্রার্থী হবেন। কয়েকদিন পরে বেনজির ভাই বললেন, তৃণমূলের ভোটে প্রার্থী বাছাই হবে। এতে আওয়ামী লীগ খণ্ডিত হলো।’
এসময় মঞ্চ থেকে বেনজির এসব কথা বলতে নিষেধ করেন। তখন এমএ মালেক বলেন, এগুলো না বললেতো মানুষ বুঝবে না। ’
তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘আমি আর বেনজির সাহেব এক সঙ্গে মুক্তিযদ্ধে গিয়েছি। ট্রেনিং করেছি এবং যুদ্ধ করেছি। আর এখন মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই কমিটির সভাপতি বেনজির আহমেদ এবং সাধারণ সম্পাদক সাকু। তারা এখন মুক্তিযোদ্ধার তালিকা থেকে আমার নামটা কেটে দিয়েছেন।’
এ সময় এমএ মালেককে এ বিষয়টি বলতে নিষেধ করা হয় মঞ্চ থেকে। কিন্তু তিনি কথা বলতে চেষ্টা করেন। এরপরে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের তাকে মাইক থেকে সরিয়ে দেন।
ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘এখানে খোলামেলা আলোচনায় আমরা বিব্রত। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আমাদের পার্টি ঐক্যবদ্ধ। আওয়ামী লীগ অনেক বড় দল, অনেক বড় পরিবার। ছোট-খাটো সমস্যা থাকতে পারে। পার্টির কার্যক্রম নিয়ে গঠনমূলক আলোচনা হতে পারে। যারা বক্তব্য রাখবেন, কাউকে আক্রমণ করবেন না। সমস্যা আমরা সবাই জানি। আজকের পরিবেশটা নষ্ট করবেন না। আমরা ঘরোয়া আলোচনায় সমস্যা সমাধান করতে পারি। ’
জেলার নেতাদের বক্তব্যে বিরক্তি প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘এত ঝগড়া কেন? এত বাদানুবাদ কেন? একই পরিবারে কাজ করতে গিয়ে মতবিরোধ হয়, তার সমাধান হয়। কিন্তু ঘরের ভেতরে ঘর কেন? ঘরের ভেতর ঘর সহ্য করা হবে না। আপন ঘরে শত্রু হলে, বাইরে শত্রুর দরকার আছে? আপন ঘরে শত্রু তৈরি করবেন না।’
তিনি বলেন, ‘কেউ প্রার্থী হতে পারবে না। প্রার্থী হবে নৌকা। ইতোমধ্যে কয়েক দফা যাচাইবাছাই হয়েছে। হতে থাকবে এবং সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্যক্তিকে মনোনয়ন দেওয়া হবে। জনবিচ্ছিন্ন নেতাকে মনোনয়ন দেওয়া হবে না।’
সভাপতির বক্তব্যে ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি বেনজির আহমেদ বলেন, ‘কাঁদা ছড়াবেন না। ছড়ালে সবার গায়েই লাগবে। সাংগঠনিক ডিসিপ্লিন মেনে চলুন। কেউই ধোয়া তুলসি পাতা না। ইট মারলে পাটকেল খেতে হয়। সময় সুযোগ মতো শ্বেতপত্র প্রকাশ হতে পারে। তিন বছরের যে কীর্তিকলাপ আছে, তা প্রকাশ হতে পারে।’
/ইএইচএস/এপিএইচ/
আরও পড়ুন: চাপে আছেন মুহিত-মসিউররা








