দলীয় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি আন্দোলনের পাশাপাশি আগামী নির্বাচন নিয়েও প্রস্তুতি নিচ্ছে বিএনপির তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। তবে কোনও অবস্থাতেই দলীয় প্রধানকে বাইরে রেখে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার বিপক্ষে তারা।
বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে বিভিন্ন জেলার বিএনপি নেতাকর্মীরা এই মতামত ব্যক্ত করেন। তাদের ভাষ্য— বিএনপি দেশের অন্যতম বড় একটি রাজনৈতিক দল। এই দলে সারাবছর ধরেই নির্বাচনের প্রস্তুতি রাখতে হয়।একইসঙ্গে প্রার্থীদের মধ্যেও এক ধরনের প্রতিযোগিতা থাকে সব সময়।
সুনামগঞ্জ জেলা বিএনপির যুগ্মসম্পাদক মুনাজ্জির সুজন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের সংগঠন অনেক বড়, প্রার্থীও অনেক। আমাদের নির্বাচনি প্রস্তুতি অনেক আগেই শুরু হয়েছে। তবে এই মুহূর্তে আন্দোলনই মুখ্য। খালেদা জিয়ার মুক্তি ছাড়া নির্বাচনে আমরা অংশ নেবো না।’
দলের কেন্দ্রীয় নেতারা মনে করছেন, আগামী নির্বাচনে তৃণমূলের নেতারা অংশ নিতে চান—এটা তাদের ইচ্ছার প্রতিফলন। তবে নির্বাচন কোন পদ্ধতিতে, কার অধীনে, কীভাবে হবে—এসব নীতি-নির্ধারণী বিষয়গুলোর ব্যাপারে কেন্দ্রের সিদ্ধান্তের ওপরেই তৃণমূলকে নির্ভর করতে হবে। এক্ষেত্রে বিএনপির স্থায়ী কমিটি কাজ করছে। একইসঙ্গে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানও এনিয়ে নিজের মতামত জানিয়ে দিয়ে কাজ করছেন। যদিও এই মুহূর্তে খালেদা জিয়ার মুক্তি আন্দোলনই মুখ্য।
বিএনপির সূত্রগুলো বলছে, আপাতত খালেদা জিয়ার মুক্তি ছাড়া অন্য কোনও চিন্তাভাবনা নেতাকর্মীদের সামনে নেই। এক্ষেত্রে তৃণমূল সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখছে। দলীয় প্রধানের মুক্তি আন্দোলন করতে গিয়ে সারাদেশে প্রায় সাড়ে চার হাজারের বেশি নেতাকর্মী গ্রেফতার হয়েছেন। এ তথ্য জানিয়েছে বিএনপির দফতর বিভাগ।
নির্বাচনের আগে নীতি-নির্ধারণী বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হলেও তৃণমূলের নেতাকর্মীরা ইতোমধ্যেই নির্বাচনি প্রস্তুতি শুরু করেছেন। এমনকী কোথাও-কোথাও মৌখিকভাবে প্রার্থী চূড়ান্তও হয়েছে। তবে এই চূড়ান্তকরণের দালিলিক কোনও তথ্য নেই।
কক্সবাজার জেলার নেতা ও বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির মৎস্য বিষয়ক সম্পাদক লুৎফর রহমান কাজল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছি প্রতিদিনই। প্রতিদিনই জনসংযোগ, নেতাকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় চলছে। ২০ দলীয় জোটের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা চলছে।’
লুৎফর রহমান কাজল বলেন, ‘আমাদের সব ধরনের প্রস্তুতি আছে। খালেদা জিয়ার মুক্তি আন্দোলন যেমন চলছে, তেমনই নির্বাচনি প্রচার-প্রচারণাও চলছে।’
কাজল আশাবাদ ব্যক্ত করেন, ‘আমরা চেয়ারপারসনকে নিয়ে নির্বাচনে যাবো। তাকে রাজনৈতিক মামলায় বন্দি করা হয়েছে। আশা করি, দ্রুতই তিনি মুক্তি পাবেন। তার নেতৃত্বেই আমরা নির্বাচনি প্রচারণায় নামবো।’
দলটির একাধিক সূত্র জানায়, খালেদা জিয়া জেলে যাওয়ার আগে থেকেই তৃণমূলে বিএনপির নির্বাচনি প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। যদিও দলীয় প্রধান গ্রেফতার হওয়ায় এতে কিছুটা ভাটা পড়েছে। ইতোমধ্যে অগোছালো কাজগুলো আরও সমন্বয় করে গোছানোর পরিকল্পনা করছে অনেক জেলা।
সুনামগঞ্জ জেলার নেতা মুনাজ্জির সুজন বলেন, ‘আমরা ওয়ার্ডে-ওয়ার্ডে, প্রত্যেকটি ইউনিটে টিম রেডি করেছি। নির্বাচনের কাজ শুরু হলেই তারা মাঠে নামবে। যেখানে দলের সাংগঠনিক অবস্থা দুর্বল, সেখানেও কাজ করছি নিয়মিত। এখন আমাদের ব্যস্ততা ম্যাডামের মুক্তি আন্দোলন। এরপর নির্বাচন নিয়ে ভাববো।’
চাপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভার সাবেক মেয়র ও বিএনপি নেতা মাওলানা আবদুল মতিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘চাপাইনবাবগঞ্জে নির্বাচনের প্রস্তুতি আছে। তবে সংগঠন এখনও ততটা শক্তিশালী নয়। দলীয় চেয়ারপারসনের মুক্তি আন্দোলনেও অতটা জোর নেই।’
তৃণমূলের কোনও কোনও নেতা খালেদা জিয়াকে ছাড়া নির্বাচনে যাওয়ার বিপক্ষে। এমনকী ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির মতো আরেকটি নির্বাচনের আয়োজন করতে না দেওয়ার পক্ষে তারা। তৃণমূলের নেতাদের অনেকেই মনে করেন, ৫ জানুয়ারির মতো নির্বাচন হলে জনগণ তা মানবে না। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগও আর এধরনের নির্বাচন আয়োজন করতে পারবে না। নেতাদের অভিযোগ—সরকার যে কোনোভাবেই বিএনপিকে আরেকবার নির্বাচনের বাইরে রাখতে চায়।
চট্টগ্রামের মীরসরাই উপজেলা বিএনপির নেতা মুক্তিযোদ্ধা মনিরুল ইসলাম ইউসুফ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতিতে বিশ্বাস করে না। কিন্তু আমাদের নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন চলবে। আমরা ম্যাডামকে মুক্ত করবো, এরপরই নির্বাচনে অংশ নেবো।’
মনিরুল ইসলাম ইউসূফ এও বলেন, ‘কোনও অবস্থাতেই ৫ জানুয়ারির মতো নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে দেওয়া হবে না।’
এ বিষয়ে সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি আবদুল কাহের শামীম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দেশের বর্তমান যে অবস্থা, তাতে আদৌ নির্বাচন যথাসময়ে হবে কিনা, এ নিয়ে সন্দেহ আছে। আওয়ামী লীগ বুঝতে পেরেছে, নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে বিএনপিই ক্ষমতায় আসবে।এ কারণেই তারা বিএনপিকে ও ম্যাডামকে নির্বাচনের বাইরে রাখার ষড়যন্ত্র করছে।’
কিন্তু দেশের মানুষ এই ষড়যন্ত্র বাস্তবায়ন করতে দেবে না বলে আত্মবিশ্বাসী আবদুল কাহের। তার ভাষ্য— ‘জনগণ আন্দোলন ও নির্বাচন, সব ধরনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। আগামী নির্বাচন নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে দিতে হবে। সেনা মোতায়েন করতে হবে। সব মানুষ যেন ভোট দিতে পারে, সে ব্যবস্থা রাখতে হবে। তবেই বিএনপি নির্বাচনে যাবে। সরকারের পাতানো কোনও নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেবে না।’








