অবশেষে বহুল আলোচিত ‘বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐক্য’ প্রকাশ্য হতে যাচ্ছে। আগামী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেনের হাত ধরেই সব ধরনের আন্দোলনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করেছে বিএনপি। খুব শিগগিরই এর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
এ ব্যাপারে বুধবার (১৯ সেপ্টেম্বর) রাত ১১টার দিকে গুলশান কার্যালয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছেন, ‘আশা করি দ্রুতই বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হবে।’
সূত্র জানায়, দুই বছরের প্রচেষ্টায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর একটি বৃহত্তর ঐক্য এখন সফল হওয়ার পথে। দুই বছর আগে গুলশানের হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলার পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়েছিলেন বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। এ বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে দুর্নীতির মামলায় সাজা পেয়ে জেলে আছেন তিনি। ২০১৬ সালের ৩ জুলাই দল-মত নির্বিশেষে জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়েছিলেন এই নেত্রী। তার ঘোষণার দুই বছরের বেশি সময় পরে, গত কয়েক মাসের আলোচনার ফল হিসেবে, বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর বৃহত্তর জোট গঠিত হতে যাচ্ছে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে।
সূত্র আরও জানায়, ড. কামালের সঙ্গে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কয়েক দফায় বৈঠক করেছেন গত কয়েক সপ্তাহে। সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বিকল্পধারার সভাপতি অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে পাশ কাটিয়ে ড. কামালকে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর বৃহত্তর জোটের নেতৃত্বে আনার বিষয়ে দলটির (বিএনপির) সমর্থন রাজনীতিতে নতুন বার্তা দেবে।
এদিকে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া গ্রেফতারের পর থেকে ড. কামালের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ে বিএনপির। বিশেষ করে গত ৮ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়া গ্রেফতার হওয়ার পর ২৮ ফেব্রুয়ারি মির্জা ফখরুলসহ কয়েকজন নেতা ড. কামালের সঙ্গে দেখা করেন। ওই প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠকের পর বাংলা ট্রিবিউনকে ড. কামাল বলেছিলেন, ‘খালেদা জিয়ার মামলার রায় পড়ে উপদেশ দেবো।’ এরপর সুপ্রিম কোর্টে খালেদা জিয়ার জামিন হলে ১২ মার্চ গণমাধ্যমে দেওয়া বিবৃতিতে ড. কামাল হোসেন বলেছেন, ‘হাইকোর্ট থেকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জামিন মঞ্জুর হলো। এই ধরনের কেসে নিয়মিত জামিন হওয়া দরকার। যদিও এই কেসের অর্ডার পেতে দু-একদিন বিলম্ব হয়েছে। আইনের শাসন ও আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ করে বিচার বিভাগ। স্বাধীন বিচার বিভাগের গুরুত্ব সবাইকে উপলব্ধি করতে হবে। তাহলে দেশ ও জনগণ উপকৃত হবে।’ এরপর ৩ এপ্রিল বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অসুস্থ হলে তাকে হাসপাতালে দেখতে যান ড. কামাল।
এরপর এই মাসের ১১ তারিখে জাতীয় প্রেস ক্লাবের এক সমাবেশে খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্য সম্পর্কে ড. কামাল হোসেন বলেন, ‘এখানে কোনও দল বা নেতানেত্রীর পক্ষে বলছি না। একটা অসুস্থ মানুষের কথা বলছি। আমি মনে করি আমাদের একটা ঐতিহ্য আছে পাকিস্তান আমল থেকেই যে কেউ অসুস্থ হলে তাকে হাসপাতালে নেওয়ার। যারা বিচারাধীন তাদের জন্য সব হাসপাতালেই ব্যবস্থা রয়েছে। আমি বলবো না নিজের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে সিদ্ধান্ত নিন।’
এদিকে গত কোরবানির ঈদের দিন দুয়েক আগে ড. কামালের কাছে ১০ দফা প্রস্তাব দেয় বিএনপি। এই প্রস্তাবের সূত্র ধরেই পরবর্তী আলোচনা সামনে এগিয়ে নেয় দলটির দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা।
রাজনৈতিক সূত্র বলছে, বিএনপি চারটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। এই মাসে লন্ডনে তারেক রহমান ও মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মধ্যকার বৈঠকে বিষয়গুলো ঠিক হয়। প্রথমত, দল নির্বাচনে যাবে কার নেতৃত্বে। দ্বিতীয়ত, নির্বাচনি আন্দোলন ও সংগ্রামে নেতৃত্বে দেবেন কে। তৃতীয়ত, সরকার গঠন হলে তার নেতৃত্বে কে থাকবেন এবং চতুর্থত, দলের মূল নেতৃত্ব কার হাতে থাকবে।
সূত্র বলছে, দলের পরিচালনার মূল নেতৃত্ব থাকবে জিয়া পরিবারের হাতে। অর্থাৎ যা এখন চলছে, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বেই সব চলবে। দল নির্বাচনে যাবে ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বা মির্জা ফখরুলের নেতৃত্বে। নির্বাচনি অন্দোলন ও সংগ্রামের নেতৃত্বে থাকবেন ড. কামাল হোসেন। বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐক্যের নেতৃত্বের হাত ধরেই নির্বাচনের পথে যাবে বিএনপি। সবশেষ সরকার গঠন হলে সরকারের প্রধানও হবেন ড. কামাল হোসেন। মাহমুদুর রহমান মান্নার প্রস্তাব অনুযায়ী অন্তত প্রথম দুই বছরের সরকার পরিচালনার ভার বৃহত্তর জোটের নেতাদের হাতেই থাকবে। এরপর রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে বিএনপির নেতৃত্বের হাতে সরকার পরিচালনার দায়িত্ব হস্তান্তর করা হবে। এই বিষয়টি কিছুটা মালয়েশিয়া মডেলে (মাহাথির-আনোয়ার) হতে যাচ্ছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির একজন প্রভাবশালী সদস্য জানান, গত সোমবার (১৭ সেপ্টেম্বর) ও মঙ্গলবার (১৮ সেপ্টেম্বর) স্থায়ী কমিটির বৈঠকে আগামী দিনের রাজনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় কতগুলো দাবি ও লক্ষ্য স্থির করেছে বিএনপি। এই দফা ও লক্ষ্যের মধ্য দিয়ে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐক্য স্থাপন করবে দলটি।
তবে ঠিক কোন সময়ে এই লক্ষ্য ও দফাগুলো প্রকাশ্যে আনা হবে তা নিয়ে কোনও মন্তব্য করতে রাজি হননি বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
এ প্রসঙ্গে বুধবার (১৯ সেপ্টেম্বর) রাতে বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘সময় মতো আমরা দেবো, এটায় একটা স্ট্র্যাটেজিক ব্যাপার আছে। অনেকের সঙ্গেই আলোচনা চলছে। আমরা কনটেন্ট এখন চূড়ান্ত করছি। তবে টাইম বলতে পারবো না, স্যরি।’
এদিকে জানা যায়, ড. কামালকে নেতৃত্বে রেখে অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে (বি চৌধুরী) পাশ কাটানো হলে বিএনপির বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐক্য থেকে সরে পড়তে পারেন এই সাবেক রাষ্ট্রপতি ও তার দল বিকল্পধারার যুগ্ম মহাসচিব মাহী বি চৌধুরী। তবে বিএনপির দীর্ঘদিনের শরিক জামায়াতকে ২০ দলীয় জোটে রেখে তারা কোনও অবস্থাতেই কোনও ঐক্যে যাবে না, এ মর্মে দলটির অবস্থান এখনও অনড়। এ ব্যাপারে মাহী বি চৌধুরী বুধবার রাতেও বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছেন, ‘জামায়াতকে সঙ্গে রাখলে যত বড় ঐক্যই হোক না কেন, বিকল্পধারা সেখানে যাবে না। তবে আমি মনে করি ড. কামাল হোসেন যে দফা ও লক্ষ্যে একমত হয়ে সই দিয়েছেন, তা থেকে সরে যাবেন না। বিশেষ করে গত ১৪ বছর ধরে আমি তাকে চিনি।’
এ বিষয়ে যুক্তফ্রন্টের একজন দায়িত্বশীল নেতা বুধবার মধ্যরাতে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐক্য বিএনপিকে বাদ দিয়ে হবে না। আর যে কারণ দেখিয়ে এই ঐক্যে অনাগ্রহী বিকল্পধারা, তাতে করে তারাই রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এক্ষেত্রে জোটের তিনজন শীর্ষনেতার মধ্যে দুজনকেই দেখা যেতে পারে বিএনপির বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐক্যে। সেক্ষেত্রে একা হয়ে যেতে পারেন বি চৌধুরী ও মাহী বি চৌধুরী।’
এদিকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির একটি সূত্র বলছে, নির্বাচনকালীন সরকারের ব্যাপারে একটি প্রপোজাল (প্রস্তাব) দেবে বিএনপি। এ প্রসঙ্গে এই মাসেই দলের পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলন করা হতে পারে।
তবে এই প্রস্তাব বিরোধী দলের বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর দেওয়া হবে কিনা, এ সম্পর্কে কিছু জানা যায়নি।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ড. কামাল হোসেন যৌথ নেতৃত্বে বিশ্বাস করেন। বিএনপি হয়তো তাদের আকাঙ্ক্ষা থেকে স্যারকে সামনে রাখার চিন্তা করছেন, কিন্তু স্যার সবাইকে নিয়েই সামনে এগিয়ে যেতে চান।’








