এক সপ্তাহের মধ্যে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে দুই দফা সংলাপের পর আর কোনও সংলাপ হবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার সময় হয়ে যাওয়ায় আর সংলাপ করার সুযোগ নেই জানিয়ে তিনি বলেছেন, তাদের সঙ্গে ‘আলোচনা হতে পারে তবে ডায়ালগ (সংলাপ) শেষ।’
বুধবার (৭ অক্টোবর) জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ১১ সদস্যের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার ও আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের দ্বিতীয় দফা সংলাপ শেষে সরকারি দলের মুখপাত্র হিসেবে প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি এ মন্তব্য করেন।
প্রেস ব্রিফিংয়ের শুরুতে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘সংলাপ এখনও শেষ হয়নি, রাতে আরেকটা সংলাপ আছে। ২৫টি দল এখনও বাকি আছে। অনেক নতুন অ্যাপ্লিকেন্ট আছে। আমরা আর অ্যাকমোডেট করতে পারছি না। বাকি ২৫ দলের সঙ্গে রাতে সংলাপ হবে। আজ ১১ থেকে প্রায় ৩ ঘণ্টা সংলাপ হলো। এই সংলাপ দ্বিতীয় দফার সংলাপ। ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে তারা এসেছেন এবং আলোচনা হয়েছে। মন খুলে কথা বলেছেন তারা। আমরাও বলেছি। তাদের সঙ্গে এটা দ্বিতীয় দফার সংলাপ।’
‘আজকে তারা যে দাবিগুলো নিয়ে এসেছেন তা হচ্ছে নির্বাচনের সিডিউল ঘোষণার আগে তারা কিছু বিষয়ে নিশ্চয়তা চান। কিছু বিষয়ে ঐকমত্য চান। এর মধ্যে মূল কথা হচ্ছে তারা আসলে সংবিধান সম্মতভাবে ২৭-২৮ জানুয়ারি থেকে এদিকে যে ৯০ দিন সংসদ যেদিন বসছে, যে সংসদ বিদায়ী সংসদ সেদিন থেকে ৫ বছর এর আগের তিন মাসের মধ্যে নির্বাচন সম্পন্ন করতে হবে। কিন্তু তারা চাইছেন সংসদ ভেঙে দিয়ে ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করতে হবে। এটা হচ্ছে মূল কথা। এছাড়া লেভেল প্লেইং ফিল্ড, বিদেশি পর্যবেক্ষক, রাজবন্দিদের মুক্তি, এসব বিষয়ে আমাদের নেত্রী বলেছেন, এসব দাবি মেনে নিতে আমাদের কোনও আপত্তি নেই। শিডিউল ঘোষণার পর নির্বাচন কমিশনই এসব করবে। তারাই লেভেল প্লেইং ফিল্ডের ব্যাপারেও আমরা সম্মত। আমাদের মন্ত্রীরা নিজেদের এলাকায় জাতীয় পতাকা ব্যবহার করবে না। সরকারি সুযোগ সুবিধা নেবে না। সার্কিট হাউস ব্যবহার করবে না, সরকারি গাড়ি ব্যবহার করবে না। কোনও প্রকার সরকারি সুযোগ-সুবিধা ব্যবহার করবে না। অন্য এমপিদের কোনও ক্ষমতা থাকবে না।’
এ সংলাপে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সাত দফা দাবির বেশ কিছু দাবি মানা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, তবে সংবিধানের বাইরে কোনও কিছু মানা সম্ভব নয়। কিছু কিছু প্রস্তাব আছে যেগুলো মেনে নিতে আমাদের আপত্তি নেই। তারা প্রস্তাব দিচ্ছেন সংবিধানের মধ্যেই। কিন্তু বিষয়টাতো সংবিধানের বাইরে। তাদের প্রস্তাবের মধ্যে ও সংবিধানের সঙ্গে বিশাল একটা গ্যাপ আছে। তারপরও যাওয়ার সময় তাদের অনেকটা নমনীয় মনে হয়েছে।
এরপর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, তারা সংসদের নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষে পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচনের কথা বলেছেন। কিন্তু, সে দাবি মানা সম্ভব নয়। ‘একটা সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনের ব্যাপারে আমাদের মধ্যে খোলামেলা আলোচনা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তাদের পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দিয়েছেন আপনারা আসুন আমি একটা অবাধ ও সুষ্ঠু ইলেকশন আপনাদের দেখাতে চাই। এ ব্যাপারে সহযোগিতা করুন। নির্বাচনকে পিছিয়ে দিতে গিয়ে কোন ফাঁক-ফোকর দিয়ে কোনও অপশক্তিকে অনুপ্রবেশের সুযোগ দেবেন না। এটা আপনাদের জন্য ক্ষতি ডেকে আনতে পারে। আমাদের সকলের জন্য সর্বনাশ ডেকে আনতে পারে।’
তিনি বলেছেন, সংলাপ হয়েছে। সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তি হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তাদের সঙ্গে সংলাপ করেছেন। দেশের ইতিহাসে এ ঘটনা আর ঘটেনি। আলোচনা হয়েছে। এবং আলোচনার পরিবেশটা ছিল সৌহার্দ্যপূর্ণ। আলোচনার পরিবেশে কোনও প্রকার অপ্রীতিকর কিছু ঘটেনি। এটাও একটা ইতিবাচক অগ্রগতি। কিছু কিছু দাবি আমদের মেনে নিতে যে আমাদের আপত্তি নেই সেটাও তো একটা অগ্রগতি। তবে আলোচনা চলবে, নির্বাচনের প্রক্রিয়াও এগিয়ে যাবে। এর মধ্যে প্রয়োজনে আলোচনা এগিয়ে যাবে। তবে ডায়ালগ শেষ।
বুধবার বেলা ১১টার দিকে গণভবনে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে সরকারের দ্বিতীয় দফার সংলাপ শুরু হয়। টানা তিন ঘণ্টার এই সংলাপে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ১১ সদস্যের প্রতিনিধি দলে নেতৃত্ব দেন গণফোরাম সভাপতি ও সংবিধানের অন্যতম প্রণেতা এবং ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম প্রধান নেতা ড. কামাল হোসেন। প্রতিনিধি দলে ছিলেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. মোশাররফ হোসেন ও ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, জেএসডির সভাপতি আ স ম আবদুর রব, দলের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মালেক রতন, গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মহসিন মন্টু, দলের কার্যকরী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না, দলের উপদেষ্টা এস এম আকরাম, জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার নেতা ও ডাকসুর সাবেক ভিপি সুলতান মোহাম্মদ মনসুর।
সংলাপে সরকারের পক্ষে নেতৃত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এছাড়াও ছিলেন আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, মতিয়া চৌধুরী, মোহাম্মদ নাসিম, ওবায়দুল কাদের, অ্যাডভোকেট আনিসুল হক, ডা. দীপু মণি, ড. আব্দুস সোবহান গোলাপ, স ম রেজাউল করিম, রাশেদ খান মেনন ও হাসানুল হক ইনু।
প্রসঙ্গত, অক্টোবরে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনের পর তাদের আহ্বানে গত ১ নভেম্বর ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে ২০ সদস্যদের একটি প্রতিনিধি দলের প্রথম দফা সংলাপে অংশ নেয় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার।








