একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী বাছাইয়ে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াসহ দলের প্রায় ৮০ জনের মনোনয়ন বাতিল করেছেন রিটার্নিং অফিসার। এরমধ্যে তিনটি আসনে নিরঙ্কুশভাবে বিএনপির প্রার্থীশূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে। মনোনয়নপত্র বাতিলের পর প্রার্থীরা নির্বাচন কমিশনে আপিল করার কথা জানিয়েছেন। তবে বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অনেক নেতাই বিষয়টিকে দেখছেন প্রস্তুতির অভাব হিসেবে। বলছেন, সংশ্লিষ্ট প্রার্থীদের উদাসীনতার কারণে মনোনয়নপত্র ঠিকভাবে জমা দেওয়া হয়নি।
এনপির স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য জানান, আজকালের মধ্যেই মনোনয়ন বাতিল নিয়ে বৈঠক করবে বিএনপি। এরপর প্রার্থী তালিকা ধরে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর ঐক্যফ্রন্টকে যুক্ত করা হবে প্রক্রিয়ায়। বিশেষ করে যেসমস্ত আসনে প্রার্থীই নেই, সেসব আসনে ফ্রন্টের প্রার্থীকে সামনে আনা হবে। ইতোমধ্যে প্রার্থীদের নির্বাচন কমিশনে আপিলের নির্দেশনা দিয়েছে বিএনপি। এরপর প্রতীক বরাদ্দের চিঠি দেওয়ার সময় নতুন নাম যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্টের কোনও কোনও নেতার ভাষ্য, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত জানানোর পরই ক্ষমতাসীনরা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিয়েছে। এক্ষেত্রে তাদের তরফে খুঁত ও ফাঁকফোকর বের করার যৌক্তিক কারণ থাকার পরও বিএনপির প্রার্থীরা গুরুত্বসহকারে মনোনয়নপত্র জমা দেননি। পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ঋণখেলাপি, হলফনামায় স্বাক্ষর না থাকা, স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিদের পদত্যাগপত্র জমা না দেওয়াসহ বিভিন্ন কারণে প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। বিএনপির পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে চিঠি দেওয়া হয়েছে নির্বাচন কমিশনকে।
ঋণখেলাপের কারণে টাঙ্গাইল-১ আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী ফকির মাহবুব আনাম স্বপনের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। তবে তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমার সব কিছু ঠিক ছিল। যে ব্যাংক আমার বিরুদ্ধে ঋণখেলাপির অভিযোগ এনেছে, সেই ব্যাংকে আমি ২৯ নভেম্বর গিয়ে সব কিছু ঠিক করে এসেছি। কিন্তু তারা আমাকে চিঠি দিলো ১ নভেম্বর। তাও আমার টাঙ্গাইলের ঠিকানায়। তারা কেন এমন কাজ করেছে, তা জানি না। আমি নির্বাচন কমিশনে আপিল করবো। এরপর হাইকোর্টে রিট করবো।’
বগুড়া-৭ আসনে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার পাশাপাশি বিএনপির আরেক প্রার্থী মোরশেদ মিলটনেরও মনোনয়ন পত্র বাতিল করা হয়েছে। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘আমি উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদ থেকে পদত্যাগ করেছি। পদত্যাগপত্র স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া আছে। নির্বাচন কশিশন থেকে বলা হয়েছিল, স্থানীয় সরকারের যেসব জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করবেন, তাদের পদত্যাগপত্র মনোনয়ন ফরমের সঙ্গে জমা দিতে হবে। সেই অনুযায়ী আমি আমার পদত্যাগের কপিও মনোনয়নপত্রের সঙ্গে জমা দিয়েছি। এখন তারা বলছে সেটা গৃহীত হয়নি। আমি নির্বাচন কমিশনে আপিল করবো। এরপর অন্য কিছু করার হলে করবো।’
বিএনপির মহাসচিবের স্বাক্ষরের মিল না থাকার অভিযোগে (ঢাকা-১) আসনে বিএনপির প্রার্থী সায়মা হোসেন জুবলীর মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘এটা কী ধরনের কারণ আমি কিছুই বোঝতে পারিনি। এর বিরুদ্ধে আমি নির্বাচন কমিশনে আপিল করবো।’
ব্রাক্ষণবাড়িয়া-২ আসনের বিএনপির প্রার্থী আবু আসিফের মনোনয়ন পত্র বাতিল করা হয়েছে। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি উপজেলা চেয়ারম্যান ছিলাম। সেখান থেকে পদত্যাগ করেছি। তার কপি মনোনয়নপত্রের সঙ্গে জমা দিয়েছি। এখন আমাকে বলা হলো, পদত্যাগপত্র স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সচিব গ্রহণ করে যে নোট দিয়েছেন, তার কপি আনতে। সেটা আমি কোথায় পাবো? আমি এখন এর বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনে আপিল করবো।’
পটুয়াখালী ৩ আসনের আওয়ামী থেকে সদ্য যোগ দেওয়া গোলাম মওলা রনির মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে। এই বিষয়ে গোলাম মওলা রনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘হলফনামা স্বাক্ষর না থাকার কারণে আমার মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে। আসলে নির্বাচন কমিশন থেকে যে হলফনামা দেওয়া হয়েছে, সেটাতে আমার স্বাক্ষর ছিল। কিন্তু যেটা নোটারি করা, সেখানে স্বাক্ষর করতে ভুল হয়েছে। এটা তিনি চাইলে সেখানেও আমার স্বাক্ষর নিতে পারতেন। তবে, আমি এর বিরুদ্ধে কমিশনে আপিল করবো।’
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সাধারণত কারও প্রার্থিতা বাতিল করলে, তিন দিন সময় থাকে নির্বাচন কমিশনে আপিল করার জন্য। আমাদের প্রার্থীরাও সেটাই অনুসরণ করবেন। এরপর আমাদের প্রার্থীদের একটু সতর্ক থাকা দরকার ছিল। কারণ, তারা তো জানেন সরকার ও নির্বাচন কমিশন সব ধরনের চেষ্টা করছে বিএনপিকে নির্বাচন থেকে বাইরে রাখতে।’
জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের স্টিয়ারিং কমিটির একজন সদস্য বলছেন, ‘ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ বিএনপির নির্বাচনে আসার বিষয়টিকে সহজে নেয়নি। সেক্ষেত্রে আগে থেকেই ধারণা আছে, মনোনয়নপত্রে ফাঁকফোকর বেশি করে খোঁজার চেষ্টা করা হবে। এ বিষয়ে মনোনয়ন বোর্ডের সদস্যদের আরও বেশি মনোযোগী হওয়ার প্রয়োজন ছিল।’
জানতে চাইলে বিএনপির মনোনয়ন বোর্ডের সদস্য ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের একাধিক প্রার্থী দেওয়া হয়েছিল নানা কারণে। প্রার্থীদের সুনির্দিষ্টভাবে বলে দেওয়া হয়েছিল, কী কী বিষয়ের ওপর বেশি নজর দিতে হবে। আর যে সব কারণে বাতিল করে দেওয়া হয়েছে, সেগুলো আমরা খুঁজে দেখবো।’ এরপর পরবর্তী করণীয় বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলেও তিনি জানান।








