ঢাকা-৮ আসনে মহাজোটের প্রার্থী ওয়ার্কার্স পার্টি প্রধান রাশেদ খান মেনন যতটা সরব ঠিক ততটাই নীরব বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস। বৃহস্পতিবার (২৭ ডিসেম্বর) নির্বাচনি প্রচারণার শেষ দিনেও একই চিত্র চোখে পড়েছে। ভোটাররা বলছেন, নৌকা প্রতীকে নির্বাচন করা রাশেদ খান মেনন এর পক্ষে অনেকেই ভোট চাইতে এলেও আসেনি ধানের শীষের কোন কর্মী সমর্থক। সরাসরি ভোট চাইতে না এলেও মির্জা আব্বাস আসনের ভোটারদের খুদে বার্তায় ভোট চেয়েছেন।
দেশের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ এলাকার মধ্যে সচিবালয়, ব্যাংক ও বাণিজ্যিক পাড়া বলে খ্যাত মতিঝিল, মন্ত্রী এবং সচিবদের আবাসস্থল বেইলি রোড এবং ইস্কাটনের (একাংশ), রাজারবাগ পুলিশ লাইন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, পল্টন এলাকা পড়েছে এই আসনটিতে।
বড় দুই দলের বাইরেও হাতপাখা প্রতীতে আসনটিতে নির্বাচন করছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. আবুল কাশেম, জাতীয় পার্টির লাঙ্গল প্রতীকে নির্বাচন করছেন মো. ইউনুস আলী আকন্দ, আম প্রতীকে ন্যাশনাল পিপলস পার্টির মো. ছাবের আহাম্মদ (কাজী ছাব্বীর), মই প্রতীকে নির্বাচন করছেন বাসদের শম্পা বসু, মাছ প্রতীকে নির্বাচন করছেন মো. জাকির হোসেন।
বৃহস্পতিবার আসনটির শান্তিনগর, কাকরাইল, মতিঝিল, পল্টন, ইস্কাটন এলাকায় ঘুরে সবখানে নৌকার পোস্টার দেখা গেছে। এর বাইরে মাছ, আম, মই, হাতপাখার পোস্টারও চোখে পড়েছে। কিন্তু, এসব এলাকার কোথাও ধানের শীষের পোস্টার দেখা যায়নি। স্থানীয়রা বলছেন, ধানের শীষের প্রার্থী কিংবা প্রার্থীর পক্ষে কেউ ভোট চাইতে আসেনি।
আসনটিতে বিএনপি প্রার্থী মির্জা আব্বাস কয়েকবার সংবাদ সম্মেলন করে জানিয়েছেন প্রচারণা চালাতে তাকে বাধা দেওয়া হচ্ছে। তিনি রাস্তায় ভোট চাইতে নামতে পারছেন না।
অন্যদিকে, রাশেদ খান মেনন প্রতিদিনই এলাকায় নির্বাচনি গণসংযোগ করছেন। বৃহস্পতিবারও তার পক্ষে প্রায় সকল এলাকায় মাইকিং করা হয়। নির্বাচনি গণসংযোগে রাশেদ খান মেনন ১০ বছরে আওয়ামী লীগ সরকারের উন্নয়নের চিত্র তুলে ধরে ভোট চাইছেন। তিনি বলছেন, ভবিষ্যতে বাংলাদেশকে উন্নত বিশ্বের কাতারে সামিল করতে নৌকার মার্কাকে বিজয়ী করার কোনও বিকল্প নেই।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ১৯৯১ থেকে ২০১৪ পর্যন্ত ৬টি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এরমধ্যে ১৯৯৬ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি এককভাবে নির্বাচন করে বিএনপি। এই নির্বাচনের পর আবার ওই বছর জুনে আরেকটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া ২০১৪ এর ৫ জানুয়ারি নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন রাশেদ খান মেনন। চারটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিএনপি দুবার করে নির্বাচিত হয়েছেন। ১৯৯১ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত চারটি নির্বাচনে প্রার্থীর ভোট প্রাপ্তির হার দেখে বোঝা যায় আসনটিতে এককভাবে কোনও দলের প্রভাব নেই। এরশাদ ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়ার পর ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী মির্জা আব্বাস ৫৯ হাজার ৮৫১ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী মোজাফফর হোসেন পল্টু। তিনি ওই নির্বাচনে ৩৪ হাজার ১০১ ভোট পেয়েছিলেন। এরপর ১৯৯৬ সালের ১২ জুনের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী সাবের হোসেন চৌধুরীর কাছে পরাজিত হন মির্জা আব্বাস। ওই নির্বাচনে সাবের হোসেন চৌধুরী পেয়েছিলেন এক লাখ ৪ হাজার ৬৯৪ ভোট অন্যদিকে মির্জা আব্বাস পেয়েছিলেন ৯৫ হাজার ৬৭৩টি ভোট। এরপর ২০০১ সালের ১ অক্টোবর নির্বাচনে মির্জা আব্বাস আবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি ২০০১ সালে এক লাখ ৫৬ হাজার ৩৮৫ ভোট পেয়েছিলেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগের সাবের হোসেন চৌধুরী ভোট পেয়েছিলেন এক লাখ ১৬ হাজার ৯৭৬ ভোট। দুই বছরের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পর ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেননকে আসনটি ছেড়ে দেওয়া হয়। তিনি ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে ৯৭ হাজার ৮৪১ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন আর তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী হাবিব উন নবী খান সোহেল পেয়েছিলেন ৬৩ হাজার ৮৬০ ভোট।
ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ী মো. রফিক জানান, তিনি সাধারণত এই আসনের সব এলাকায় ঘুরে ঘুরে ডাব বিক্রি করেন। কিন্তু, তার কাছে অনেকে ভোট চাইলেও বিএনপির কেউ কখনও ভোট চাইতে আসেনি। তিনি রাস্তায় বিএনপির কোন পোস্টারও দেখেননি বলে জানান। নিউ বেইলি রোডের বাসিন্দা আব্দুল মালেকও বলেন, তার বাসায় নৌকা এবং মই মার্কার পক্ষে ভোট চাইতে গেছে। তার কাছেও বিএনপির কেউ ভোট চায়নি। তিনি বলেন, নির্বাচনে আমরা ভোট দিতে চাই। সুষ্ঠু এবং সুন্দর নির্বাচন হবে বলেই তিনি আশা প্রকাশ করেন।
শান্তিনগরে চা বিক্রেতা আব্দুল মতিন জানান, তিনি গত শুক্রবার শান্তিনগর বাজার এলাকাতে বিএনপির একটি মিছিল দেখেছিলেন। কিন্তু এরপর আর কোনও মিছিল মিটিং দেখেননি। এর বিপরীতে আওয়ামী লীগের প্রার্থী এবং সমর্থকরা বারবার ভোট চাইতে আসছেন।
আরেক ভোটার মাসুদ আলী বলেন, তার কাছে মির্জা আব্বাসের একটি খুদে বার্তা এসেছে। সেই খুদে বার্তাটি দেখিয়ে বলেন, সরাসরি না আসলেও মোবাইল ফোনে এসএমএস করে ভোট চেয়েছে বিএনপি। খুদে বার্তায় মির্জা আব্বাস ভোটারদের উদ্দেশ করে লিখেছেন, ইচ্ছা থাকা স্বত্ত্বেও বারবার বাধার কারণে আপনাদের কাছে আসতে পারিনি। আমার জন্য দোয়া করবেন ধানের শীষে ভোট দেবেন। তবে শান্তিনগরের বাসাবাড়িগুলোতে ধানের শীষের ছোটো ছোটো লিফলেট বিতরণ চলছে কয়েকদিন ধরেই।
আসনটিতে ভোটার সংখ্যা দুই লাখ ৬৪ হাজার ৬৬৪ জন। এর মধ্যে এক লাখ ৫২ হাজার ৯১ জন পুরুষ এবং এক লাখ ১২ হাজার ৫৭৩ জন নারী।








