সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বিকল্পধারা বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী বলেছেন, কারোরই র্যাব বিলুপ্তির কথা বলা উচিত না। আমি মনে করি, আরেকটা সুযোগ দেওয়া উচিত। র্যাব একটা প্রতিষ্ঠান। সেই প্রতিষ্ঠানের কোনো দোষ আছে বলে আমি মনে করি না। হতে পারে তাদের আরও মডিফাই করা উচিত, তাদের ট্রেনিংয়ে আরও স্পেশালাইজ করা উচিত। কিছু আইন-কানুন প্রতিষ্ঠিত করতে হবে, বুঝতে হবে। বোঝাতে হবে, গণতন্ত্র প্রতিটি মানুষের স্বপ্নের ধন। তারা যদি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বাইরে কিছু করতে যায় তাহলে তাদের জনপ্রিয়তা হারাবে। তাদের সাবধান করার জন্য অনেক কিছু করা উচিত। র্যাব বিলুপ্ত করা হলে হিতে বিপরীত হতে পারে। বি. চৌধুরী সোমবার রাতে বারিধারায় তার নিজ বাসভবনে বাংলা ট্রিবিউনকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে এ কথাগুলো বলেন। তার সাক্ষাৎকারের প্রথম ভাগ নিচে তুলে ধরা হলো। বাংলা ট্রিবিউন: বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া বারবার র্যাব বিলুপ্তির কথা বলছেন, আপনার দল ও জোট বিএনপি’র নেতৃত্বধীন জোটের সঙ্গে ঐকমত্যের রাজনীতি করলেও আপনি র্যাব বিলুপ্তির বিপক্ষে কেন? বি. চৌধুরী: এই কথাটি নিয়ে একটু ভাবতে হবে। যখন বিডিআর বিদ্রোহ হলো, তখন এর নামই ফেলে দেওয়া হলো। এটা আমি কখনো বুঝিনি, কেনো এমনটি করতে হলো। স্বাধীনতার পর থেকে যে নামটি আছে, সেটি বিলুপ্ত করে দিলেন? কিছু লোক বিদ্রোহ করেছেন, কিন্তু সেই ‘কিছু লোক’ কে দমন করার জন্য নামটি বিলুপ্ত করার ফলে কিছু কি হয়েছে? হওয়ার মধ্যে একটা জিনিসই হয়েছে, সেটা হচ্ছে সরকার তার পছন্দের কিছু লোককে সেখানে ঢুকাতে পেরেছে। একইভাবে র্যাবেও এমন কিছু করা উচিত নয়। যারা অপরাধী তাদেরকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া উচিত। কিন্তু কোনোভাবেই প্রতিষ্ঠানটিকে বিলুপ্ত করা উচিত হবে না। বাংলা ট্রিবিউন: অনেকেই সেনাবাহিনী থেকে র্যাবে নিয়োগ দেওয়ার বিরোধিতা করছেন। এ ব্যাপারে আপনার কী মত? বি. চৌধুরী: এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। একটা কথা মনে রাখতে হবে, মানুষের সাইকোলজিক্যাল রি-অ্যাকশন আছে। আমি একটা প্রতিষ্ঠানে কাজ করি। তার ওপরে নতুন একটা প্রতিষ্ঠান বসিয়ে দেওয়া হলো। যেমন পুলিশ বাহিনী। এলিট ফোর্স নাম দিয়ে তার ওপর একটা প্রতিষ্ঠান বসিয়ে দেওয়া উচিত হয়নি। সেখানে পুলিশ আছে, সামরিক বাহিনীও আছে। সামরিক বাহিনীই বেশি। আর্মি একটা ডিসিপ্লিনড ফোর্স। পুলিশের ওপর তাদের ঢুকিয়ে দিলে অনেকটা তদারকির মতো হয়ে যায়। অনেক জায়গাতেই পুলিশ যাওয়ার আগে র্যাব পৌঁছে যাচ্ছে। এর ফলে পুলিশ ও আর্মির মধ্যে একটা প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলে আসাটাই স্বাভাবিক। দ্বিতীয়ত, পুলিশ বাহিনীতে যারা প্রাণ হাতে নিয়ে কাজ করছে তাদের মধ্যে একটা দুঃখবোধ হতে পারে। নারায়ণগঞ্জের সাত খুন ঘটনার পর কী হলো? র্যাবের তিন সদস্যের বিরুদ্ধে অ্যাকশন নিতে দেরি হলো। কিন্তু পুলিশ বাহিনীর ৪৩ জন সদস্যের বিরুদ্ধে অ্যাকশন নিতে একটুও দেরি হলো না! যেখানে র্যাব প্রধানত জড়িত বলে সন্দেহ করা হলো, তাদের বিরুদ্ধেই অ্যাকশন নেওয়া হলো পরে! ৪৩ জন পুলিশ সদস্যের কেউ কেউ জড়িত থাকতে পারেন। আবার তারা থাকলে তদন্ত আরও দ্রুতগতিতে হতেও পারতো! কেননা লোকাল পুলিশ সব অপরাধীকে চেনেন। ভালো-মন্দ দু’টি দিকই আছে। তবে যেটাই বলি, দৃষ্টান্ত কিন্তু ভালো নয়! মাত্র চার মাসের মাথায় বর্তমান সরকার দেশের মানুষের কাছে, বহির্বিশ্বের কাছে প্রশ্নবোধক হয়ে গেছে! বাংলা ট্রিবিউন: তার মানে আপনি বলতে চাইছেন, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ভালো নয়? বি. চৌধুরী: বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির সূত্রপাত আসলে ৫ জানুয়ারির নির্বাচন থেকে। সাধারণ নির্বাচন হলেও এটা একটা অসাধারণ জিনিস হয়ে গেল। বাংলা ট্রিবিউন: অসাধারণ কোন অর্থে? বি. চৌধুরী: অসাধারণ মানে সব অর্থেই অসাধারণ। এরকম নির্বাচন বাংলাদেশ কখনও দেখেনি। পৃথিবীর আর কোনও দেশে এরকম হয়েছে কী না আমার জানা নেই। হয়ে-টয়ে থাকতে পারে। এটা খুবই বিচিত্র জিনিস। যা আর কখনও হয়নি। তারপর কী হলো? ফলাফল কী হলো? ১৫৩ টি আসনের মানুষ ভোট থেকে বঞ্চিত হলো। এবং এসব এলাকার অসাধারণ প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়ে গেল। নিশ্চয়ই তাদের যোগ্যতা পর্বতসমান! না হয় বিশাল মহীরুহ সমান! দেশের লোক কেঁদেছে। বাইরের লোক বিস্মিত হয়েছে, অবাক হয়েছে। গণতন্ত্রের নামে এটা কী ধরনের প্রহসন? বাংলা ট্রিবিউন: একটা সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতাও তো ছিল.. বি. চৌধুরী: বাধ্যবাধকতা ছিল। যদিও সে হিসেবে আরও অনেক সময় ছিল। সাংবিধানিকভাবেও আরও অনেক কয়েকমাস সময় ছিল। বাংলা ট্রিবিউন: সরকারের মেয়াদের পরের ৩ মাস পর্যন্ত? বি. চৌধুরী: হ্যাঁ, তিন মাস ছিল। সে হিসেবে তাদের সময় ছিল। এবং তারা বিরোধী দলের সঙ্গে কোনও আলাপ-আলোচনাই করলেন না। বাংলা ট্রিবিউন: কিন্তু আওয়ামী লীগ তো বলেছে তারা আলোচনা করেছেন। কিন্তু আলোচনার উদ্যোগ বিরোধী দলের নেত্রী ভেস্তে দিয়েছেন। বি. চৌধুরী: আমি অত গভীরে এখন যাব না। আর যাই হোক, আরও আলোচনার স্কোপ ছিল। আরও দুই মাস অন্তত আলোচনার সময় ছিল। আলোচনা করতে পারতেন। সেটা আমরা দেখি নাই। তারা বলছেন, নির্বাচন তো করা হলো, এটা অর্ধেক নির্বাচন হয়ে গেল। তারপর অনেক সিনিয়র নেতা, অর্থমন্ত্রী সাহেব, ওবায়দুল কাদের সাহেব, আরও দু'একটা নাম হয়তো মনে করলে চিনতে পারবেন, তারা বললেন সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণে এই নির্বাচন করা হয়েছে। খুব শিগগিরই আমরা সবগুলো পার্টি নিয়ে আলোচনা করে আরেকটা নির্বাচন করবো। বেশিদিন লাগে নাই, স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে সবকিছু হওয়া শুরু হলো আর ওইসব মন্ত্রীরা এখন বলতেও সাহস পায় না। উল্টো বলছে, পাঁচ বছরের নিচে কিছুতেই নির্বাচন করা যাবে না। একদিনে তো এই নির্বাচন হবে না। এই ঘোষণা আসলো, তারপর তো তোতাপাখির মতো একের পর সবাই বলা শুরু করলো। গণতন্ত্রের জন্য এটা কিন্তু শুভ সংকেত নয়। আমি অশনি সংকেত বলবো না, তবে এটা নিশ্চয়ই শুভ সংকেত নয়। (আগামীকাল দ্বিতীয় পর্ব)








