চাঁদা চাইতে এখন আর উপলক্ষের দরকার হয় না। আর যদি সেই চাঁদাবাজের গায়ে থাকে ছাত্রলীগের সিল, তবে তাকে রোখে কে! বাংলার আচার-সংস্কৃতির উৎসব পহেলা বৈশাখেও তারা রটিয়ে দিয়েছিলেন চাঁদাবাজের পুরোদস্তুর কুসংস্কার। গেল ১৪ এপ্রিল ফুলার রোডে আসা গাড়ির চালকদের কাছ থেকে দেদারসে চাঁদা সংগ্রহ করছিলেন স্যার সলিমুল্লাহ হল ইউনিটের ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতাকর্মী। তাদের এই কাজে 'বাগড়া' দিতে গিয়েছিল কয়েকজন সাংবাদিক। বেদম মার খেয়ে ফিরে এলেন তারা। একজনের অবস্থা ছিল গুরুতর।
ঘটনার জেরে খানিকটা নড়েচড়ে বসে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। চাঁদাবাজি ও প্রহারের ঘটনায় তালিকায় হয় ২১ জনের। ৬ জনকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় শাহবাগ থানায়। দুই দিনেই মাথায় তারা ছাড়া পেয়ে যান, এবং কোনো মামলাও হয় না! বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও যথারীতি একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে কিন্তু তাতেও মিলল না কোনো ফল। অভিযুক্তরা এখন বহাল তবিয়তেই আছেন। ফেব্রুয়ারির ১৩ তারিখের ঘটনা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সূর্যসেন হলের ছাত্রলীগ নেতা আরিফুর রহমান লিওন প্রথম বর্ষের এক ছাত্রকে ২১৯ নম্বর কক্ষে আটকে রেখে টাকা দাবি করে। তিন দিন ধরে আটকে রেখেই ক্ষান্ত হননি ওই নেতা। অত্যাচারও চালানো হয় তার ওপর। তিন দিন পর সুযোগ পেয়ে জানালা দিয়ে লাফ দিয়ে ওই ছাত্র ছুটে যায় হল কর্তৃপক্ষ ও অন্য ছাত্রদের কাছে। কিন্তু ওই নেতা নিজেও লাফ দিয়ে আবার তাকে ধরে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে আসে কক্ষে। ওই দিন কেউ আর তাকে বাঁচাতে এগিয়ে আসেনি। ঘটনা টের পেয়ে হল কর্তৃপক্ষ একটি তিন সদস্যের কমিটি গঠন করে ওই কক্ষে তালা ঝুলিয়ে দেয়। কিন্তু কমিটি এখন পর্যন্ত কোনো প্রতিবেদন জমা দেয়নি। গতবছর ঢাবির ছাত্রলীগ সদস্যদের বিরুদ্ধে চুরি, নির্যাতন ও মুক্তিপণ আদায়ের এমন আরও অগণিত অভিযোগ উঠেছিল। প্রতিবারই 'কঠোর' ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলেছিল বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। আদতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তেমন কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতারা বরাবরই এ ধরনের অভিযোগকে অসত্য বলে দাবি করে আসছেন। তবে ঢাবি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে এ ধরনের নির্যাতনের ঘটনার সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় ভবিষ্যতে তারা আরও কঠোর ব্যবস্থা নেবেন। শাহবাগ থানার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ছাত্রলীগ নেতাদের বিরুদ্ধে তারা কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেন না, কেননা, এ ধরনের ঘটনায় তাদের ওপর 'মারাত্মক চাপ' থাকে। এ বিষয়ে মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকেন থানার ওসি সিরাজুল ইসলাম। গত বছর ১৮ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের ছাত্রলীগ নেতা সোহেলের নেতৃত্বে ৩১৯ নম্বর কক্ষে দুই বহিরাগতকে আটকে নির্যাতন চালানো হয়। তাদের পরিবারের কাছে মুক্তিপণও দাবি করেন ওই নেতা। একপর্যায়ে নির্যাতিতদের একজন জানালা দিয়ে লাফিয়ে পড়লে ছাত্র ও হলের কর্মীরা তাকে উদ্ধার করে। তার কাছ থেকে তথ্য পেয়ে অপরজনকেও উদ্ধার করা হয়। বছর পেরিয়ে গেলেও ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতা ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এখনও ওই নেতাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। গত বছরের সেপ্টেম্বরে রাজধানীর মৎস্য ভবন এলাকার সামনে আরিফ নামের এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে নগদ ৬০ হাজার টাকা ও মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেয় শহীদুল্লাহ হলের ছাত্রলীগ নেতা মোস্তাফিজুর রহমান, সোমিত শাহরিয়ার ও তাদের সাঙ্গপাঙ্গরা। সোহরাওয়ার্দি উদ্যান ও ক্যাম্পাসের ভেতরে এ ধরনের ঘটনার অভিযোগ আছে ভুরি ভুরি। গত বছর এ ধরনের অন্যায়ের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে গুটিকয়েক নেতার বিরুদ্ধে। ওই বছর ১ নভেম্বর রাজশাহী থেকে আসা দুটো বাস থেকে চাঁদা দাবি করেন সূর্যসেন হলের ছাত্রলীগ নেতা মো. তকি। অস্বীকৃতি জানালে দলবল মিলে ওই বাসের চালকদের মারধর করেন তিনি। পরে ঘটনার জেরে তকিসহ আরও কয়েক ছাত্রকে বহিষ্কার করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এ বছরের ৮ মে এক ব্যবসায়ীকে অপহরণের ঘটনায় ঢাবি ক্যাম্পাস থেকে ছাত্রলীগের ৬ জনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। পরে এদের ৪ জনকে ছাত্রলীগ থেকে বহিষ্কার করা হয়। ক্যাম্পাসে এ ধরনের ঘটনা যে অহরহ ঘটছে তা স্বীকার করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর আমজাদ আলী। তিনি এও স্বীকার করেছেন, অতীতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এ ধরনের ঘটনাগুলোকে গুরুত্বের সঙ্গে নেয়নি। "ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার বিরুদ্ধে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেব" জানালেন প্রক্টর। ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় শাখার সভাপতি বদিউজ্জামান সোহাগ জানালেন, "আমাদের সংগঠন ও সরকার এ ধরনের ঘটনার ব্যাপারে খুব কঠোর। অন্যায়কারীদের সদস্যদের বিরুদ্ধে আগেও আমরা ব্যবস্থা নিয়েছি, ভবিষ্যতেও নেব।"








