জামায়াতের বিচার: আইনমন্ত্রীর 'সম্ভব নয়' মন্তব্যকে ‌'অজ্ঞতাপ্রসূত' বললেন শাহরিয়ার কবির

জাকিয়া আহমেদ
২৯ মে ২০১৪, ১৮:৩৫আপডেট : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১৮:৩৭

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল অ্যাক্ট'৭৩ অনুযায়ী দল হি‌‌‌সেবে জামায়াতের বিচার করা সম্ভব নয় বলে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছেন অাইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট অানিসুল হক।

তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বৃহষ্পতিবার সন্ধ্যায় টেলিফোনে বলেন, “অামি মনে করি জামায়াতের বিচার করা এই অাইনে সম্ভব নয়।” তাহলে কেন অান্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা জামায়াতের বিরুদ্ধে তদন্ত করলো এবং কেন রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলিরা সেটা নিয়ে কাজ করলো জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এটা তাদেরকে জিজ্ঞেস করেন। অামি তো এ ব্যাপারে কিছু বলতে পারবো না।”

অাইনমন্ত্রী অানিসুল হক অারও বলেন, “তিনটি কারণে এ অাইনে জামায়াতের বিচার করা সম্ভব নয় বলে অামি মনে করি। সেগুলো হচ্ছে- প্রথমত, এই অাইনে দল হিসেবে সাজার বিধান নেই, দ্বিতীয়ত, সুপ্রিম কোর্টে জামায়াতের নিবন্ধন নিয়ে ইতোমধ্যেই একটা মামলা চলমান, সেখানে নতুন করে এখানে একই বিষয়ে মামলা হলে সুপ্রিম কোর্টের মামলায় কী প্রভাব পড়বে সেটা একটা বিষয় এবং তৃতীয়ত, এই মামলায় যদি অন্য মামলার উদাহরণ (প্রচলিত কোম্পানি অাইন) ধরা হয় তাহলে সেখানে অাছে, কোনো কোম্পানি কিংবা সংগঠনের বিরুদ্ধে মামলা হলে তার সাজাপ্রাপ্ত হবেন সংশ্লিষ্ট কোম্পানি কিংবা সংগঠনের নিয়ন্ত্রকেরা। তা হলে এখানে জামায়াতের যদি সাজা হয় তাহলে তো তার নিয়ন্ত্রক যারা অাছেন তাদের সাজা হবার কথা। কিন্তু তারা তো এরই মধ্যে ট্রাইব্যুনালের দেওয়া রায়ে সাজা ভোগ করছেন। দ্বিতীয়বার তো তারা সাজা পেতে পারেন না।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জামায়াতে ইসলামীর যুদ্ধাপরাধ নিয়ে তদন্তকারী কর্মকর্তা মতিউর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “অামি তদন্ত করে মামলার সব নথিপত্র চিফ প্রসিকিউটরের কাছে জমা দিয়েছি। এখন মামলা চালানো বা না চালানোর বিষয়ে তিনি সিদ্ধান্ত নেবেন।”

তিনি আরও বলেন, “তবে তদন্তকারী কর্মকর্তা হিসেবে অামি দেখেছি, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময়ে যত অপরাধ সংগঠিত হয়েছে তার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত ছিল জামায়াত। জামায়াতের নেতাদের ইন্ধনে, নির্দেশে, অাদেশে এসব অপরাধ হয়েছে। কোথাও কোথাও তারাও অপরাধ সংগঠিত করেছে।”

মতিউর রহমান অারও বলেন, “মুক্তিযুদ্ধের সময়ে জামায়াতের ভূমিকা নিয়ে অান্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালও তার কয়েকটি রায়ে সরাসরি এ কথা বলেছেন।”

মতিউর রহমান জানান, তিনি গত বছরের ১৮ অাগস্ট থেকে জামায়াতের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেন। গত ২৭ মার্চ চিফ প্রসিকিউটরের কাছে তদন্তের সব নথিপত্র জমা দেওয়া হয়। সেখানে জামায়াত এবং তাদের অঙ্গসংগঠন, আল বদর, আল শামসের সম্পত্তি বাজেয়াফত চেয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইন’১৯৭৩ এর আলোকে তৈরি এ তদন্ত প্রতিবেদনে জামায়াত ও তার সব অঙ্গসংগঠন নিষিদ্ধ ও অবলুপ্ত করার আরজি জানানো হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জামায়াত, তাদের সহযোগী সংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘ, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে সহযোগিতা দিতে গঠিত শান্তি কমিটি, রাজাকার, আল বদর ও আল শামস বাহিনী এবং জামায়াতের মুখপত্র দৈনিক সংগ্রাম আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইনের ৪ এর ১ ও ৪ এর ২ ধারা অনুযায়ী অপরাধ করেছে।

জামায়াতসহ এসব সংগঠনের নীতিনির্ধারক, সংগঠক, পরিচালক এবং কেন্দ্র থেকে শুরু করে সব পর্যায়ের নেতা-কর্মীকে এসব অপরাধের জন্য দায়ী করা হয়েছে প্রতিবেদনে।

এ বিষয়ে ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শাহরিয়ার কবির বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “অামার মনে হয় এটা সর্ম্পূণ অজ্ঞতাপ্রসূত কথা বলেছেন অাইনমন্ত্রী। তিনি অান্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল'৭৩ এর অাইন এবং পরবর্তীতে এ আইনের সংশোধনী পড়েননি। একই সঙ্গে যুদ্ধাপরাধ এবং গণহত্যার দায়ে কিভাবে ব্যক্তির পাশাপাশি সংগঠনের বিচার হতে পারে সেটা তিনি জানেন বলে মনে হয় না।”

শাহরিয়ার কবির আরও বলেন, “অাইনমন্ত্রী বলেছেন, শাস্তির বিধান নেই। বিচারে শাস্তি কী হবে সেটা ঠিক করবেন ট্রাইব্যুনালের বিচারকরা, এটা কোনও মন্ত্রীর দেখার বিষয় নয়।”

শাহরিয়ার কবির অারও বলেন, “অাইনমন্ত্রী বলেছেন, জামায়াত নিয়ে সুপ্রিমকোর্টে একটি মামলা বিচারাধীন রয়েছে, নতুন করে অাবার মামলা হলে সেটার ওপর প্রভাব পড়তে পারে। অামার কথা হচ্ছে, সুপ্রিমকোর্টে জামায়াতের মামলা হচ্ছে নিবন্ধন নিয়ে, জামায়াতের গঠনতন্ত্র অামাদের সংবিধানের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ বলে। কিন্তু ট্রাইব্যুনালে তো মামলা হবে গণহত্যার দায়ে, যুদ্ধারপরাধের দায়ে। নিবন্ধন অার গণহত্যা এবং যুদ্ধাপরাধ এক নয়। এই মামলায় তো অার জামায়াতের গঠনতন্ত্র অাসবে না। দুটো মামলা সম্পূর্ণ দু'রকম, তাহলে তিনি কেন বলছেন এখানে মামলা হলে ওই মামলায় প্রভাব পড়বে?"

ক্ষোভের সঙ্গে শাহরিয়ার কবির বলেন, “মতিউর রহমান নিজামীর তো ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলায় সাজা হয়েছে। তাই বলে কি ট্রাইব্যুনালে তার যে মামলা চলছে সেখানে সাজা হবে না? মুক্তিযুদ্ধকালে নিজামীর যে ভুমিকা সেজন্য কি তার সাজা হবে না?”

শাহরিয়ার কবির অারও বলেন, “অামি সবশেষে বলতে চাই, অাইনমন্ত্রীর অাজকের বলা কথার পেছনে যদি রাজনৈতিক কোনও বিবেচনা কাজ করে তাহলে এটা দল হিসেবে অাওয়ামী লীগের জন্য এবং মহাজোট সরকারের জন্য অাত্মঘাতী হবে। সরকারের উচিত হবে জামায়াতসহ নেজামী ইসলামী, পিডিপিসহ রাজাকার, অাল বদর, অাল শামস যারা রয়েছেন, যারা গণহত্যায়, যুদ্ধাপরাধে পাকিস্তানি বাহিনীকে সহযোগিতা করেছেন তাদের সবার বিচার করা।”

অার এ বিষয়ে মন্ত্রীদের কথা না বলাই ভালো বলে মন্তব্য করেন তিনি।

অপরদিকে, ইতিহাসবিদ মুনতাসীর মামুন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “ট্রাইব্যুনালের যে কোনো মামলায় বাদী হয় সরকার। তাহলে এতোদিন যে জামায়াতের বিরুদ্ধে তদন্ত হলো, প্রসিকিউশন এটা নিয়ে কাজ করলো, তখন কেন সরকার অনুমোদন দিয়েছিল? সরকারের অনুমোদন ছাড়া কেউ এ কাজ করতে পারে না।”

“এ অাইনে দল হি‌‌‌সেবে জামায়াতের বিচার করা সম্ভব না” আইনমন্ত্রীর এ ধরনের মন্তব্য প্রসঙ্গে মুনতাসীর মামুন বলেন, “অাইনমন্ত্রী এতো ব্যস্ত থাকেন যে তিনি হয়তো এর নতুন সংশোধনীটা পড়েননি অথবা এমনও হতে পারে যে অাইনমন্ত্রী যেহেতু বলেছেন বিচার করা সম্ভব নয় তাহলে হয়েতো তখন কোনো সংশোধনীই হয়নি। কারণ তিনি অাইনমন্ত্রী, তিনিই তো অাইন ভালো জানবেন, অামরা না।”

এ বিষয়ে অান্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের একাধিক প্রসিকিউটরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা কেউ এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন প্রসিকিউটর বলেন, “ভালোই তো হলো, অামাদের দায়-দায়িত্ব কমে গেল।” তাহলে অাপনারা এতদিনে কিসের ভিত্তিতে এ মামলা নিয়ে কাজ করছিলেন-- জানতে চাইলে তিনি বলেন, “অাইনমন্ত্রী যদি বলে থাকেন এ অাইনে বিচার সম্ভব নয় তার কথার পরিপ্রেক্ষিতে অামার কোনও কথা বলা ঠিক হবে না।”

উল্লেখ্য, জামায়াতের মামলা পরিচালনা করার জন্য ব্যারিস্টার তুরিন অাফরোজকে সম্বন্বয়ক করে ৭ সদস্যের একটি পরিচালনা কমিটি করা হয়। কিন্তু গত ১৫ মে রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি হৃষিকেশ সাহা প্রধান কৌঁসুলির কার্যালয়ে একটি নোটিশ জারি করেন। সেখানে জামায়াতের বিষয়ে তদন্তের সব নথিপত্র ভারপ্রাপ্ত প্রধান কৌঁসুলির কাছে হস্তান্তরের নোটিশ দেওয়া হয়। সেখানে বলা হয়, জামায়াতের বিরুদ্ধে মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব নথিপত্র ভারপ্রাপ্ত প্রধান কৌঁসুলি সৈয়দ হায়দার আলীর কাছে হস্তান্তর করতে হবে, যাতে রাষ্ট্রপক্ষের জ্যেষ্ঠ কৌঁসুলিরা ওই নথিপত্র পরীক্ষা করতে পারেন। তারপর থেকে জামায়াতের মামলার বিষয়টি স্থগিত হয়ে অাছে।

মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর দেওয়া কাদের মোল্লার রায়ের পর দেশব্যাপী গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে যে সংশোধনী আনা হয় সেখানে রাষ্ট্রপক্ষের আপলি করার পাশাপাশি ব্যক্তির পাশাপাশি মানবতাবিরেধী অপরাধ সংঘটনকারী সংগঠনেরও বিচারেরও বিধান করা হয়েছিল।

২০১৩ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন রাষ্ট্রপতি প্রয়াত জিল্লুর রহমান ওই সংশোধনী আইনে স্বাক্ষর করেন যা পরবর্তীতে গেজেট আকারে প্রকাশের দিন থেকে কার্যকর হয়।

.
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম