দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, মতিউর রহমান নিজামী, মীর কাসেমের মামলাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের ৫টি মামলা রায়ের অপেক্ষায় রয়েছে। এর মধ্যে একটি অাপিল বিভাগে, তিনটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ এবং অার একটি ট্রাইব্যুনাল-২-এ অপেক্ষায় আছে। এর মধ্যে ৩ টি মামলার শুনানি শেষ হয়েছে দুই থেকে অাড়াই মাস অাগে।
এ প্রসঙ্গে অান্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের ভারপ্রাপ্ত প্রধান কৌঁসুলি সৈয়দ হায়দার অালী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “অামরা দেখেছি, মামলাগুলো রায়ের অপেক্ষায় রয়েছে। যখন রায় হবে তখনও দেখব। দেখে যাওয়া ছাড়া এ বিষয়ে অার কিছু বলার নেই। মামলাগুলোর রায় আদালতের নিজস্ব প্রক্রিয়াতেই হচ্ছে, হবে। রায় দেওয়া সম্পূর্ণ আদালতের এখতিয়ার। অার সবার মতো অামরাও এসব রায়ের জন্য অপেক্ষা করছি।”
ট্রাইব্যুনাল-১-এ রায়ের অপেক্ষায় রয়েছে জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামী ও ফরিদপুরের পলাতক বিএনপির নেতা জাহিদ হোসেনের মামলা। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অাওয়ামী লীগ নেতা মোবারক হোসেনের মামলার রায়ও অপেক্ষমান। মোবারকের মামলার যুক্তিতর্ক শেষ হয়েছে সোমবার।
ট্রাইব্যুনাল-২-এ রায়ের অপেক্ষায় আছে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য মীর কাসেম আলীর মামলা।
জামায়াতে ইসলামীর জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মামলাটি রয়েছে আপিল বিভাগে চূড়ান্ত রায়ের অপেক্ষায় ৷৫০ কার্যদিবস শুনানি শেষে গত ১৬ এপ্রিল সাঈদীর দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে করা আপিলের শুনানি শেষ হয়। প্রায় দেড় মাসের বেশি সময় পার হলেও এখন পর্যন্ত এ মামলার রায় ঘোষণা হয়নি। গত বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি ট্রাইব্যুনাল-১ সাঈদীর মৃত্যুদণ্ডাদেশ দিয়েছিলেন।
ICT thumbnail
মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সর্বোচ্চ সাজা কার্যকরের ঘটনা প্রথম ঘটে অাবদুল কাদের মোল্লার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের মাধ্যমে। জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল কাদের মোল্লার রায় ঘোষণা করতে আপিল বিভাগ প্রায় দুই মাস সময় নিয়েছিলেন। গত বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর তার ফাঁসির আদেশ দেন আপিল বিভাগ। তারও প্রায় তিন মাস পর পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়। ১২ ডিসেম্বর কাদের মোল্লার সাজা কার্যকর হয়।
সাঈদীর মামলাসহ অপেক্ষমান রায়ের বিষয়ে জানতে চাইলে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে অালম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “রায়ের বিষয়ে কিছু বলা বোধহয় ঠিক হবে না। কবে নাগাদ রায় হবে এটা একমাত্র অাদালত বলতে পারবেন, অন্য কেউ নন।''
তবে জামায়াতে ইসলামীর অন্যতম অাইনজীবী অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “সাঈদীর মামলাটি ছিল ট্রাইব্যুনালের প্রথম মামলা। সেখানে অনেক বেশি তথ্য-উপাত্ত, সাক্ষীসাবুদ রয়েছে। অপরদিকে, অাপিল বিভাগে অামরা সুখরঞ্জন বালীসহ অন্য অনেক নতুন তথ্য-উপাত্ত দিয়েছি এবং এখানে (অাপিল বিভাগে) এ মামলায় দীর্ঘ সময় ধরে শুনানি হয়েছে। এসব কিছু পর্যালোচনা করতেও সময় দরকার। কারণ সবকিছুর প্রতিফলন ঘটবে রায়ে। তাই প্রধান বিচারপতিসহ অন্যান্য বিচারপতিরা রায় দিতে সময় নিচ্ছেন, এটা খুবই স্বাভাবিক।”
এদিকে জামায়াতের অামির মতিউর রহমান নিজামীর মামলার কার্যক্রম তিন দফায় শেষ হয়েছে, তবে এখনও রায় ঘোষণা হয়নি।
প্রথম দফায় নিজামীর মামলার কার্যক্রম শেষ হয় গত বছরের ১৩ নভেম্বর। বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোটের ডাকা টানা ৮৪ ঘণ্টা হরতালের জন্য নিজামীর আইনজীবীরা চূড়ান্ত যুক্তি উপস্থাপনের নির্ধারিত দিনেও আদালতে অনুপস্থিত ছিলেন। এ জন্য ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারক মামলার কার্যক্রম শেষ করে দেন। কিন্তু পরে আসামিপক্ষ যুক্তি উপস্থাপনের সুযোগ চাইলে ট্রাইব্যুনাল তা মঞ্জুর করেন। ২০ নভেম্বর মামলার কার্যক্রম শেষ হয়।
তবে রায় ঘোষণার আগেই গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর অবসরে যান ট্রাইব্যুনাল-১-এর তৎকালীন চেয়ারম্যান বিচারপতি এ টি এম ফজলে কবীর। এরপর দীর্ঘ ৫৩ দিন ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান হিসেবে কাউকে নিয়োগ দেয়নি সরকার। গত ২৩ ফেব্রুয়ারি বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিমকে চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার পর নিজামীর মামলায় দু'পক্ষ আবার নতুন করে যুক্তি উপস্থাপন করে। এরপর ২৪ মার্চ তৃতীয়বারের মত সিএভি (কেস অ্যাওয়েটিং ফর ভারডিক্ট) হয়। সেই থেকে চলছে নিজামীর রায়ের জন্য অপেক্ষা।
নিজামীর মামলার রায় প্রসঙ্গে অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম বলেন, “তার বিরুদ্ধে কমান্ড রেসপনসিবিলিটির অভিযোগ আনা হয়েছে। তার ওপরে অামরা বিভিন্ন অান্তর্জাতিক অাইন এবং অান্তর্জাতিক অাদালতের সিদ্ধান্তকে রেফারেন্স হিসেবে দাখিল করেছি। সে কারণে এগুলোকে সার্বিকভাবে পর্যালোচনা করে এই বিপুল ডকুমেন্টসকে পর্যালোচনা করতে সময় লাগতে পারে। এজন্য যদি রায় দিতে দেরি হয় তাহলে সেটাকে অস্বাভাবিক কিছু বলা যাবে না বরং দেরি হওয়াটাই বাঞ্ছনীয়।”
তবে তাজুল ইসলাম আরো বলেন, “এই দেরি হওয়াটা যদি অন্য কোনও কারণে হয় তাহলে অামাদের কিছু বলার নেই।”
দুই ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন মামলাগুলোর মধ্যে নিজামীর মামলাটিই সবচেয়ে বেশি সময় (২৬ মাস) ধরে চলছে।
২০১২ সালের ২৮ মে নিজামীর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের ১৬টি অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে ট্রাইব্যুনাল-১-এ তার বিচার শুরু হয়। একই দিনে ট্রাইব্যুনাল-২-এ কাদের মোল্লার বিচার শুরু হয়েছিল। কিন্তু কাদের মোল্লার সর্বোচ্চ সাজা কার্যকর হয়ে গেলেও নিজামীর মামলা এখনো ঝুলে অাছে রায়ের অপেক্ষায়।
অান্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ পর্যন্ত তিনটি মামলার রায় দিয়েছেন। সাঈদীর মামলার রায় দিতে এই ট্রাইব্যুনালের এক মাস, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর মামলায় দেড় মাস ও জামায়াতের সাবেক আমির গোলাম আযমের রায়ের জন্য দুই মাস সময় নিয়েছিলেন।
ফরিদপুরের নগরকান্দা পৌরসভার মেয়র ও পলাতক বিএনপির নেতা এম এ জাহিদ হোসেনের মামলার রায়ও গত দেড় মাসে ঘোষণা হয়নি। গত ১৭ এপ্রিল ট্রাইব্যুনাল-১-এ মামলাটির কার্যক্রম শেষ হয়। একাত্তরে স্থানীয়ভাবে ‘খোকন রাজাকার’ নামে পরিচিত জাহিদ হোসেনের বিরুদ্ধে গত বছরের ৯ অক্টোবর ১১টি অভিযোগের বিচার শুরু হয়।
খোকন রাজাকারের মামলাটি আসামির অনুপস্থিতিতে মানবতাবিরোধী অপরাধের তৃতীয় মামলার বিচার। জামায়াতে ইসলামীর সাবেক সদস্য (রুকন) পলাতক আবুল কালাম আযাদ এবং একাত্তরের আল-বদর নেতা চৌধুরী মুঈনুদ্দীন ও আশরাফুজ্জামান খানের বিরুদ্ধে মামলা দুটির বিচার হয় আসামিদের অনুপস্থিতিতে। আবুল কালাম আযাদ গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হওয়ার পর পালিয়ে যান। আর মুঈনুদ্দীন ও আশরাফুজ্জামান মুক্তিযুদ্ধ শেষে বিদেশে চলে যান, তাদের দেশে ফিরিয়ে বিচারের মুখোমুখি করা যায়নি।
এ প্রসঙ্গে অাইনমন্ত্রী অানিসুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “তাদেরকে ফিরিয়ে অানার বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।” পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও বারবার বলেছে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে জানতে চাইলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা কখনও সুস্পষ্ট করে কিছু বলতে পারেননি।
সোমবার ট্রাইব্যুনাল-১-এ রায়ের অপেক্ষায় থাকা মামলার তালিকায় যুক্ত হয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অাওয়ামী লীগ নেতা মোবারক হোসেনের মামলা।
অপরদিকে, ট্রাইব্যুনাল-২-এ জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য মীর কাসেম আলীর বিরুদ্ধে মামলার কার্যক্রম শেষ হয় গত ৪ মে। এরপর থেকে রায়ের প্রহর গুনছে মামলাটি।
ট্রাইব্যুনাল-২-এ-পর্যন্ত ছয়টি মামলার রায় দিয়েছেন। এর আগে রায় ঘোষণা করতে এ ট্রাইব্যুনালের গড়ে এক মাস করে সময় লেগেছে। সবচেয়ে বেশি ৪১ দিন সময় লেগেছিল, জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদের মামলার রায় দিতে। আর সবচেয়ে কম সময় ২৫ দিন লেগেছিল পলাতক আযাদের রায় দেওয়ার ক্ষেত্রে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শাহরিয়ার কবির বলেন, “ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান নিয়োগে দেরি হওয়াসহ আবার যুক্তি উপস্থাপনের জন্য রাষ্ট্রপক্ষের অদক্ষ কৌঁসুলিদের যুক্তি উপস্থাপন-এসবই নিজামীর মামলাকে দীর্ঘসূত্রিতায় ফেলেছে। নতুন করে যুক্তি উপস্থাপনের আবেদন জানানোর কাজটি করার কথা অাসামি পক্ষের, সেটি করেছে অামাদের রাষ্ট্রপক্ষ।”
সাঈদীর রায় প্রসঙ্গে শাহরিয়ার কবির বলেন, “আমার মনে হয়, মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার আপিল নিষ্পত্তির জন্য এখানে একটি নির্দিষ্ট বেঞ্চ থাকা দরকার, যেখানে শুধু এসব মামলার শুনানি হবে। কারণ, গোটা জাতি এসব মামলার রায়ের জন্য তাকিয়ে আছে।'' তিনি আরো বলেন, রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলিদের অদক্ষতা-অযোগ্যতা, বিচার নিয়ে সরকারের সমন্বয়হীনতা, যথাযথ পরিকল্পনার অভাব এবং কৌঁসুলিদের অন্তর্দ্বন্দ্ব ইত্যাদি সমস্যার সমাধান না হলে এই বিচার-প্রক্রিয়া আরও দীর্ঘসূত্রিতার মধ্যে পড়বে।








