বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা-আকাঙ্ক্ষা প্রতিষ্ঠা ও গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় রাষ্ট্র গড়ে তুলতে রাজপথেই সমাধান চান সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারা। তারা বলেন, বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে সত্যিকার অর্থে কার্যকর রাজনৈতিক ঐক্য তৈরি হয়েছে রাজপথে, টেবিলে নয়। এইসময় সরকারের কাছ থেকে সুষ্ঠু নির্বাচন আদায়ে সারাদেশের মানুষের কাছে যাওয়ার জন্য নিজ নিজ দলীয় নেতাকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানান নেতারা। শনিবার (২৮ ডিসেম্বর) রাজধানীর মহানগর নাট্যমঞ্চে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) কেন্দ্রীয় সম্মেলনে তারা এই আহ্বান জানান।
জেএসডি সভাপতি আ স ম আবদুর রবের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বৃহত্তর ঐক্যের ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, ‘আজকে বিভিন্নভাবে দেশ ও দেশের মানুষকে পরাজিত করা হচ্ছে। তাদের (আওয়ামী লীগ) যে লড়াই ছিল, যে গৌরবময় সংগ্রাম ছিল, সব ধ্বংস করে দিয়ে আজকে দুর্ভাগ্যজনকভাবে একটা পুতুল সরকার প্রতিষ্ঠিত করেছে। এদেশকে তারা পরাধীন করার দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।’
বিএনপির মহাসচিব আরও বলেন, ‘শুধু ঐক্যফ্রন্ট বা অন্য কোনও জোট নয়, দেশের সব মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে আমাদের লড়াই করতে হবে, সংগ্রাম করতে হবে। খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে হবে।’
সম্মেলনে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের আহ্বায়ক ও গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন অভিযোগ করেন, ‘দেশের শাসনব্যবস্থা সংবিধান অনুযায়ী চলছে না।’ তিনি বলেন, ‘পঞ্চাশ বছর পরেও কেন বলতে হচ্ছে যে, ক্ষমতা আমাদের ফিরিয়ে দাও। ক্ষমতা তো লেখা আছে সংবিধানে। কেন আমাদের ক্ষমতা বেদখল হয়ে আছে। কেন সেটা ভোগ করতে আমাদের দেওয়া হচ্ছে না। কারণ এখন সত্যিকার অর্থে নির্বাচন হতে দেওয়া হয় না।’
সরকারকে চ্যালেঞ্জ করে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি কাদের সিদ্দিকী বলেন, ‘বাংলাদেশের যেকোনও নির্বাচনে অনিয়ম না করে নৌকা যদি পাস করে, তাহলে আমি সমুদ্রে গিয়ে ডুব দেবো।’
গত ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে কোনও ভোট হয়নি দাবি করে কাদের সিদ্দিকী বলেন, ‘দেশের মানুষ তাদের ভোট দিতে পারেনি। সাড়ে তিন শ’ সদস্যের এই সংসদ অবৈধ। ভাত খাওয়ার সময় যেভাবে ভাগ করে দেওয়া হয়, ঠিক সেভাবে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের আটজনকে নির্বাচিত করে নির্বাচন দেখানো হয়েছিল। তারা কিন্তু সংসদেও গেছেন।’
নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ‘৩০ ডিসেম্বরের ভোট হয়েছে ২৯ ডিসেম্বর। এই ভোট মানিনি। মানবও না। যত দিন পর্যন্ত তাদের ক্ষমতা থেকে সরাতে না পারব, ততদিন মানবো না। এজন্যই আজকে রাত পোহালে যে রাত আসবে সেইদিন থেকে শুরু করবো প্রতিবাদ। ধীরে ধীরে প্রতিরোধ গড়ে তুলবো।’
২৯ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে ‘ভোট ডাকাতির প্রতিবাদে’ সমাবেশ করবে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। এ প্রসঙ্গে সমাবেশে মান্না বলেন, ‘আমরা আগামীকাল জমায়েত হবো, কথা বলব, মিছিল করব। যদি বাধা দেয় মানব না। আমাদের কণ্ঠ যদি বন্ধ করবার চেষ্টা করা হয়, এই কণ্ঠ বন্ধ করতে পারবেন না। আমাদের মিছিলকে যদি বাধা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়, তাহলে কালকের দিনই দিন নয়, আরও দিন আছে, আমরা সেই দিনের কাছে যাবো।’
গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি বলেন, ‘রাজপথের সংগ্রাম ছাড়া বর্তমান শাসকগোষ্ঠীকে টলানো যাবে না। বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে সত্যিকার অর্থে কার্য্কর রাজনৈতিক ঐক্য তৈরি হয়েছে টেবিলে নয়, রাজপথে। ফলে আমরা যদি প্রত্যেকটা রাজনৈতিক দল যার যার অবস্থান থেকে রাজপথে থাকি, তাহলে নতুন ঐক্যের সমীকরণ তৈরি হবে।’
আ স ম আবদুর রব বলেন, ‘আগ্রাসী সরকারের দলতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে ঝুঁকিপূর্ণ এবং ধ্বংসাত্মক পরিণতির দিকে ঠেলে দিয়েছে। আসুন আমরা এবার গণবিস্ফোরণের আগুনে শাসক ও শাসন ব্যবস্থা দুটোকেই বদল দেই। জনগণের ভাগ্য বদলের জন্য ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম গড়ে তুলে মানবিক রাষ্ট্র বিনির্মাণ করি।’
রাজনৈতিক দল, পেশাজীবী ও বুদ্ধিজীবীদের সমন্বয়ে জাতীয় সরকার গঠনের রূপরেখার প্রস্তাব দেন জেএসডি সভাপতি আ স ম রব। সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির সদস্য সচিব শহীদ উদ্দিন মাহমুদ স্বপনের পরিচালনায় উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান, জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর) চেয়ারম্যান মোস্তফা জামাল হায়দার, গণস্বাস্থ্যের ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, বিকল্পধারার একাংশ সভাপতি অধ্যাপক নুরুল আমীন ব্যাপারী প্রমুখ।
শনিবার সকালে গুলিস্তানে মহানগর নাট্যমঞ্চে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডির কেন্দ্রীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। কাউন্সিলের প্রথম পর্বে ছিল উদ্বোধনী অনুষ্ঠান, দ্বিতীয় পর্বে ছিল রুদ্ধদ্বার কাউন্সিল অধিবেশন। সারাদেশে ৭৪ সাংগঠনিক কমিটির দেড় হাজার কাউন্সিলর কেন্দ্রীয় কাউন্সিলে অংশ নেন।
এর আগে সকাল সোয়া ১০টায় জেএসডির সভাপতি আ স ম আবদুর রব জাতীয় পতাকা উত্তোলন করে বেলুন-কবুতর উড়িয়ে কাউন্সিলের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। এই সময়ে বিভিন্ন জেলা ইউনিটের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকরা দলীয় পতাকা উত্তোলন করেন।
প্রসঙ্গত, ১৯৭২ সালের ৩১ অক্টোবর জেএসডি প্রতিষ্ঠা হয়।








