ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে বিএনপি একক প্রার্থী নিশ্চিত করলেও কাউন্সিলর পদে তা নিশ্চিত করতে পারেনি দলটি। কাউন্সিলের পদে দলীয় প্রতীকে নির্বাচন না হলেও রাজনৈতিক দলগুলো প্রতিটি ওয়ার্ডে একজন প্রার্থীকে দলীয়ভাবে সমর্থন দিচ্ছে। বিএনপিও দক্ষিণ সিটির ৭৫টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৬৮টিতে এবং উত্তর সিটির ৫৪টির মধ্যে ৫১টি ওয়ার্ডে কাউন্সিলের পদে দল সমর্থিত প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছে। কিন্তু এসব ওয়ার্ডে দলের সমর্থিত প্রার্থীর বাইরেও দলীয় বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছেন। এছাড়া দুই সিটির ৯ টি ওয়ার্ডে দলটির একাধিক প্রার্থী থাকায় এখন পর্যন্ত কাউকে সমর্থন দেওয়া হয়নি।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, গত ৩০ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির থেকে নির্বাচনকারী প্রার্থীদের কারণে কাউন্সিলর পদে একক প্রার্থী নিশ্চিত করা যায়নি। কারণ সংসদ সদস্য পদে নির্বাচনকারী প্রার্থীরা নিজ নির্বাচনি এলাকায় কাউন্সিলর পদে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন এমন প্রার্থীদের দলীয়ভাবে সমর্থন দেওয়ার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। এই কারণে কাউন্সিলের পদে বিএনপির একক প্রার্থী নিশ্চিত করতে পারেনি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক নেতা বলেন, একাদশ সংসদ নির্বাচনে ঢাকাতে যারা বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছিলেন, তাদের মধ্যে ৪ জন ছিলেন অতীতে বিভিন্ন ওয়ার্ডের কাউন্সিলর। ফলে, সেই ভয় থেকে ঢাকাতে এমপি প্রার্থী অনেক নেতা তার ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে ভালো কাউকে প্রার্থী করতে রাজি হননি। নিজের অনুসারীদের পক্ষে অবস্থান নিয়ে দলের সমর্থন আদায় করেছেন।
বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিএনপির কাউন্সিলর বাছাই সংক্রান্ত মনোনয়ন বোর্ডের সদস্য ও দলের ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, সময় স্বল্পতার কারণে কিছু কিছু ওয়ার্ডে একক প্রার্থী নিশ্চিত করা যায়নি। তবে আমাদের হাতে তো আরও কয়েকদিন সময় আছে। এরমধ্যে আশা করি বিদ্রোহী প্রার্থীদের বোঝাতে সক্ষম হবো।
প্রসঙ্গত: একাদশ সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৫ আসনে নবীউল্লাহ, ঢাকা-১৬ আসনে মো. আহসান উল্লাহ আহসান, ঢাকা-১১ আসনে শামীম আরা বেগম (বিদেশে পলাতক এম এ কাউয়ুমের স্ত্রী) বিএনপির মনোনয়ন পান। কাইয়ুমসহ অপর দুজন ওই এলাকাগুলোর সিটি করপোরেশনে আগে কাউন্সিলর ছিলেন।
খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, সবুজবাগ থানার অধীনে ৪ নম্বর ওয়ার্ড থেকে কাউন্সিলের পদে বিএনপির মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেন ৪ জন। এদের মধ্যে দলের সমর্থন পেয়েছেন সবুজবাগ থানা বিএনপির সভাপতি মো. গোলাম হোসেন। কিন্তু দলের সমর্থন না পেলেও এই ওয়ার্ডে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করার ঘোষণা দিয়েছেন একই থানাধীন দলীয় নেতা মো. মোরসালিন।
মো. মোরসালিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমি ১০ হাজার টাকার বিনিময়ে দলের মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছিলাম। কিন্তু দল থেকে কাউন্সিলের পদে আমাকে মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। তাই আমি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করবো।
মতিঝিল থানার অধীনে ১০ নম্বর ওয়ার্ড থেকে কাউন্সিলর পদে নির্বাচনের জন্য বিএনপির মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছিলেন ৩ জন। এদের মধ্যে দল সমর্থন দিয়েছে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসের অনুসারী মো. হারুন অর রশীদকে। বিএনপির সমর্থন না পেলেও এই ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে নির্বাচন করছেন মতিঝিল থানা বিএনপি যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমি দলের সমর্থন পাইনি। ফলে স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচন করবো।
ধানমন্ডি থানার অধীনে ১৫ নং ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে বিএনপির দলীয় মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন ৩ জন। দলটির মনোনয়ন পেয়েছেন থানা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক শফিক উদ্দিন ভূইয়া। দলটির মনোনয়ন না পেয়ে এই ওয়ার্ডে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করছেন থানা বিএনপির সহ-সভাপতি আবু নাছের লিটন। লিটন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমাকে মনোনয়ন দেওয়ার জন্য একাদশ সংসদ নির্বাচনের ঢাকা-১০ আসন থেকে নির্বাচনকারী বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল মান্নান দলের হাইকমান্ডকে চিঠিও দিয়েছিলেন। কিন্তু দল আমাকে মনোনয়ন না দিয়ে অন্য আরেকজনকে দিয়েছেন। যিনি এলাকাতেও থাকেন না।
তার ঘোষণা, বিএনপির মনোনয়ন না পেলেও আমি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে এই ওয়ার্ড থেকে কাউন্সিলর পদে নির্বাচন করবো। এলাকার দলের নেতাকর্মীরা আমার সঙ্গে আছেন।
একইভাবে চকবাজার থানার ২৭ নং ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে বিএনপির মনোনয়ন সংগ্রহ করেছিলেন ৩ জন। দলটির মনোনয়ন পেয়েছেন থানা বিএনপির সহ সাধারণ সম্পাদক শাহিদা মোরশেদ। বিএনপির মনোনয়ন না পেয়ে এই ওয়ার্ডে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করার ঘোষণা দিয়েছেন থানা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সেলিম আহমেদ সালেম। ধানমন্ডি থানার অধীনে ১৬ নং ওয়ার্ডে বিএনপির মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছিলেন ৩ জন। এদেরে মধ্যে দলটির মনোনয়ন পেয়েছেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সহ-সভাপতি সিরাজুল ইসলাম। দলের মনোনয়ন না পেয়ে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করছেন থানা বিএনপির নেত্রী রাজিয়া সুলতানা। এই রকমের আরও অনেক ওয়ার্ডে বিএনপিতে কাউন্সিলর পদে একাধিক প্রার্থী রয়েছে।
২৭ নং ওয়ার্ডে বিদ্রোহী প্রার্থী সেলিম আহমেদ সালেম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমি কাউন্সিলর পদে নির্বাচনের জন্য মনোনয়ন ফরম জমা দিয়েছি। দলের সমর্থন না পেলেও এই ওয়ার্ড থেকে আমি নির্বাচন করবো।
বিএনপির কাউন্সিলর বাছাই সংক্রান্ত মনোনয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অধীনে ১, ৯, ১৯, ২০, ৩৩ ও ৫১ নং ওয়ার্ড এবং উত্তর সিটিতে ২৯, ৪০ ও ৫৪ নম্বর ওয়ার্ডে কাউন্সিলর প্রার্থীদের মধ্যে কাউকে বিএনপি এখনও সমর্থন দেয়নি। আর ঢাকা উত্তর সিটিতে বিএনপির নেতারা বলছেন, এই ৬ ওয়ার্ডে বিএনপির মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন ৩৩ জন। কিন্তু এসব প্রার্থীর মধ্যে কেউ কাউকে ছাড় দিতে রাজি হননি। মনোনয়ন বোর্ডের নেতারাও এসব ওয়ার্ড নিয়ে কোনও সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেনি। ফলে এসব ওয়ার্ড এখন পর্যন্ত উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। আগামী ২ জানুয়ারি মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষ দিন। আমরা শেষ দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করবো। এরমধ্যে প্রার্থীদের মধ্যে কোনও সমঝোতা না হলে এসব ওয়ার্ডে কাউকে সমর্থন দেওয়া হবে না।
খিলগাঁও থানার ১ নং ওয়ার্ড থেকে কাউন্সিলর পদে বিএনপির মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছিলেন ৫ জন। এই ওয়ার্ডে বিএনপি একক প্রার্থী নিশ্চিত করতে না পারায় সবার জন্য নির্বাচন উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। এই ওয়ার্ডের প্রার্থী মো. ফারুকুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, এখানে কাউন্সিল পদে বিএনপির মনোনয়ন সংগ্রহ করেছেন ৫ জন। ফলে দলে থেকে এখন পর্যন্ত কাউকে সমর্থন দেওয়া হয়নি। আমরা সবাই মনোনয়ন ফরম জমা দিচ্ছি। মনোনয়ন প্রত্যাহারের আগে নিশ্চয় দল কাউকে না কাউকে সমর্থন দেবে।
গতকাল সোমবার (৩০ জানুয়রি) রাতে বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে কাউন্সিলর প্রার্থী চূড়ান্ত করা হয়। ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার। জমির উদ্দিন সরকার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, কিছু ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে একাধিক প্রার্থী থাকায় সেখানে আমরা নির্বাচন উন্মুক্ত রেখেছি। আশা করি, শেষ দিন এই সমস্যা কেটে যাবে।








