বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার বিচারে দিন-রাত না ভেবে খেটে গেছেন সাহারা খাতুন

বাহাউদ্দিন ইমরান
১৩ জুলাই ২০২০, ২৩:৪০আপডেট : ১৪ জুলাই ২০২০, ০৮:২৯

সাহারা খাতুন মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নের পাশাপাশি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শের প্রতি অবিচল থেকেছেন প্রয়াত অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন। রাজনীতির পাশাপাশি আইন পেশায় নিযুক্ত ছিলেন তিনি। তাই রাজনীতি ছাড়াও আইনাঙ্গণে তার মুখর পদচারণা ছিল। বঙ্গবন্ধুর পরিবারের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা থেকে তিনি স্বপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার বিচারে নিরলস কাজ করে গেছেন। এসময়ে ভুলে গেছেন দিনরাতের ব্যবধান।

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের প্রায় ২১ বছর পর আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সরকার গঠনের পর স্বপরিবারে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের দায়মুক্তি আইন বাতিল করা হয়। ফলে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচারের পথ উন্মুক্ত হয়। এরপর ১৯৯৭ সালের ৭ এপ্রিল ঘৃণিত এ হত্যাকাণ্ড মামলার বিচার কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়। ১৯৯৮ সালের ৮ নভেম্বর বিচারিক আদালতে এ মামলার রায় হয়। এরপর মামলাটি হাইকোর্টে ও পরে আপিল বিভাগে শুনানির মধ্য দিয়ে চূড়ান্ত বিচার কার্যক্রমের সমাপ্তি ঘটে। আর এর পুরোটা সময় জুড়েই মামলা পর্যবেক্ষণ করতেন অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন।

বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার বিচারে প্রসিকিউটর হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছিলেন বর্তমান আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের বাবা প্রয়াত অ্যাডভোকেট সিরাজুল হক। তবে বাবার মৃত্যুর পর আনিসুল হক ওই মামলার দায়িত্বভার গ্রহণ করেছিলেন। সে মামলা পরিচালনাকে কেন্দ্র করে সাহারা খাতুনের অবদান সম্পর্কে বাংলা ট্রিবিউনের কাছে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে মুষরে পড়েন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক।
ফোনের অপর প্রান্তে নিজেকে স্বাভাবিক করে আনিসুল হক বলেন, ‘মনটা খুব খারাপ। করোনা ভাইরাসের কারণে তার জন্য যেভাবে শোক পালন করা উচিত ছিল আমরা তা পারছি না। মনটার কষ্ট বলে বুঝাতে পারবো না। তবু বলতে হয়, বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গবন্ধুর পরিবারের বিষয়ে তিনি ছিলেন আপষহীন। বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় দিনের পর দিন, রাতের পর রাত ওনাকে এই মামলায় বিচারের উদ্দেশে কাজ করতে দেখেছি। তবে তিনি কখনও ক্লান্তি দেখিনি। জোরে কখনও কথা বলতে দেখেনি। তার মতো মানুষ সত্যিই বিরল। আমরা একজন নিবেদিত প্রাণ হারিয়েছি।’
‘বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় আদালতে চলাকালীন সময়েই শুধু নয়, এর বাইরেও যখন আমরা মামলার প্রস্তুতি নিতাম তখন তিনি দিন-রাত না ভেবে বসে থাকতেন’ বলেও জানান আইনমন্ত্রী আনিসুল হক।
সাবেক আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদ বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার বিচারে তিনি শুনানিতে সরাসরি অংশ না নিলেও, তাকে আমরা কোর্টে বেশ মনোযোগী দেখতাম। জজ কোর্ট থেকে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত মামলাটির শুনানি চলাকালীন সকলের মনোবল ধরে রাখার ক্ষেত্রে তাকে বেশ দৃঢ়চেতা মনে হতো।’

সাহারা খাতুন ১৯৮১ সালে এলএলবি পাস করেন এবং সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমানের জুনিয়র হিসেবে আইনাঙ্গণে প্রবেশ করেন। তার সম্পর্কে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান, বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদের কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক সিনিয়র অ্যাডভোকেট ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘তার সম্পর্কে সংক্ষেপ করে বলা অসম্ভব। তিনি আমাদের দেশের একমাত্র উদাহারণ যিনি কিনা রাজনীতি, দেশ ও দেশের মানুষের জন্য নিজের জীবনকে বিসর্জন দিয়েছেন। আইনাঙ্গণে মামলা পরিচালনার ক্ষেত্রে তিনি কখনও অর্থ-বিত্তের দিকে তাকাননি। তার একটাই চিন্তা ছিল যে, তিনি দলের জন্য আপসহীনভাবে কাজ করবেন। ভেতরে কিংবা বাহিরে তিনি একইরকম ছিলেন।’
বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় বিচারিক আদালতের রায়ের পর মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের ডেথ রেফারেন্স ও আপিল শুনানির জন্য ২০০০ সালে হাইকোর্টে আসে। কিন্তু ওই একই বছর হাইকোর্টের বেশ কয়েকটি বেঞ্চ মামলাটি শুনতে বিব্রতবোধ করেন। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করেও তুমুল আন্দোলন গড়ে তোলা হয়। যার অগ্রভাগে অন্যান্যদের মতো সাহারা খাতুনও নেতৃত্ব দেন।
আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা মণ্ডলীর সদস্য অ্যাডভোকেট আব্দুল বাসেত মজুমদার বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর হত্যা মামলার আসামিদের ডেথ রেফারেন্স ও আপিল শুনতে অপরাগতা প্রকাশ করেছিলেন হাইকোর্টের কয়েকটি বেঞ্চ। তখন বেশ কিছু আন্দোলন হয়েছিল। যার মধ্যে অন্যতম নেতৃত্ব দিয়েছিলেন সাহারা খাতুন। তিনি আওয়ামী লীগের কর্মী এবং নেতা হিসাবে সবসময়েই লেগে থাকতেন।’

‘আমি নিজেও দেখেছি- বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলাজুড়ে সাহারা খাতুন মামলার শুনানিতে উপস্থিত ছিলেন। আমি নিজেও বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় কিছু পেপারবুক তৈরি করে দিয়েছিলাম। সেখানেও সাহারা খাতুনকে পেয়েছি’ বলে জানান সুপ্রিম কোর্টের এই প্রবীণ আইনজীবী।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেন। তবে শত ব্যস্ততার মাঝেও তৃণমূলের রাজনীতি থেকে উঠে আসা সাহারা খাতুনকে সবসময় বিপদে কাছে পেয়েছেন বলে দাবি দলের নেতাকর্মীদের। তাই বিয়ে বা সংসার জীবনে প্রবেশ না করে তিনিও ব্যস্ত থেকেছেন রাজনৈতিক আর আইনি জীবন নিয়ে। রাজনীতি আর দলের প্রতি নিবেদিত এই প্রাণ গত ৯ জুলাই থাইল্যান্ডের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।
বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা চলাকালে তৎকালীন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকারের আইনমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন অ্যাডভোকেট আব্দুল মতিন খসরু। সাহারা খাতুন প্রসঙ্গে তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগের জন্য তিনি ছিলেন নিবেদিত প্রাণ। কখনোই তিনি বঙ্গবন্ধুর আদর্শ থেকে বিচ্যুত হননি। তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী আইনজীবী পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। মানুষকে আপন করে নেওয়ার মতো তার কিছু অসাধারণ গুণ ছিল। বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার শুনানিসহ সবসময় আন্দোলন-সংগ্রামে আমরা তাকে সম্মুখেই দেখে এসেছি।’


/এফএস/
সম্পর্কিত
আদালতে আত্মসমর্পণের পর কারাগারে আওয়ামী লীগের ১৪ নেতা
বাসায় ফিরে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন আ.লীগের আইভী
মুক্তি পেলেন সাবেক মেয়র আইভী
সর্বশেষ খবর
জনগণের আস্থা অর্জনে কাজ করছে জাতীয় সংসদ: স্পিকার
জনগণের আস্থা অর্জনে কাজ করছে জাতীয় সংসদ: স্পিকার
এই অর্জন বাংলাদেশের শক্তিশালী কূটনৈতিক অবস্থানকে তুলে ধরে: খলিলুর রহমান  
এই অর্জন বাংলাদেশের শক্তিশালী কূটনৈতিক অবস্থানকে তুলে ধরে: খলিলুর রহমান  
‘মুখ খোলো মমতা, জানতে চায় জনতা’ স্লোগানে ইনকিলাব মঞ্চের মশাল মিছিল
‘মুখ খোলো মমতা, জানতে চায় জনতা’ স্লোগানে ইনকিলাব মঞ্চের মশাল মিছিল
আর্জেন্টিনা আরও চার ফুটবলারকে প্রস্তুত রাখছে
আর্জেন্টিনা আরও চার ফুটবলারকে প্রস্তুত রাখছে
সর্বাধিক পঠিত
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী