বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটে চিড় ধরার কথা শোনা গেলেও শেষপর্যন্ত ভাঙছে না সরকারবিরোধী জোটটি। পৌরসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র বিএনপির ওপর ক্ষোভ থাকলেও শিগগিরই জোট ভেঙে বেরিয়ে আসার কোনও সম্ভাবনা নেই ধর্মভিত্তিক শরিক দলগুলোর। এদিকে, শরিক দলগুলোর একাধিক শীর্ষনেতার অভিযোগ, জোট ভাঙতে কওমিপন্থী দলগুলোর ওপর ক্রমাগত সরকারি চাপ বাড়ছে। জোটের ইসলামী ঐক্যজোট, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, খেলাফত মজলিসের নেতারা বলছেন, বিএনপি অনেক ক্ষেত্রে গুরুত্ব না দিলেও জোট ভাঙার পক্ষে নন তারা। সংশ্লিষ্ট দলগুলোর নীতি-নির্ধারণী সূত্রে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
জোটভুক্ত দলগুলোর শীর্ষস্থানীয় তিনজন নেতা বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, সরকারের চাপ বিগত কয়েক বছর ধরেই অব্যাহত আছে। এর মধ্যে হেফাজতে ইসলামের শাপলা চত্বরে সমাবেশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান নিয়ে দেশব্যাপী দায়ের করা শত শত মামলায় গ্রেফতারের ভয়ও দেখাচ্ছে সরকার। এছাড়া, শাপলা চত্বরের ঘটনার পর ঢাকা ও চট্টগ্রামের ধর্মভিত্তিক দলগুলোর কয়েকজন নেতা কর্মসূচি না দেওয়ার শর্তে সরকারের কাছ থেকে বিভিন্ন ধরনের সুবিধা নেওয়ার বিষয়টিও সামনে চলে এসেছে। ওই বিষয়গুলোকে ইস্যু করেও সরকারের পক্ষ থেকে জোট ভাঙতে কওমিপন্থী দলগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি হচ্ছে বলে অভিযোগ করছেন কেউ-কেউ।
২০ দলীয় জোটের প্রতিষ্ঠাকালীন শরিক ইসলামী ঐক্যজোট। এ দলের চেয়ারম্যান মাওলানা আবদুল লতিফ নেজামী একই সঙ্গে নেজামে ইসলাম পার্টিরও নেতা। মহাসচিব মুফতি ফয়জুল্লাহ। হেফাজতের আলোচিত এই নেতা বিভিন্ন মামলার আসামি। ভাইস-চেয়ারম্যান মাওলানা হাসানাত আমিনী। প্রয়াত মুফতি আমিনীর এই ছেলে বড় কাটারা মাদ্রাসার দায়িত্বে আছেন। জানতে চেয়ে যোগাযোগ করা হলে মাওলানা হাসানাতের নম্বর বন্ধ পাওয়া গেছে।
জানা গেছে, ইসলামী ঐক্যজোটকে বিএনপিজোট ছাড়তে নানা সময়ে চাপ দিয়ে গেছে একটি গোয়েন্দাসংস্থা। জোটের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখতেও দলটিকে অতীতের নানা সুবিধা নেওয়ার বিষয় মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নেজামী ইসলামীর একাত্তরের রাজনৈতিক ভূমিকা, বড় কাটারা মাদ্রাসার ভূমিসংক্রান্ত সমস্যাগুলো চাপা দিতেই দলটির নেতারা সরকারের চাপে সাড়া দিয়ে এসেছেন।
জানা গেছে, বিএনপিজোট থেকে ইসলামী ঐক্যজোটের দূরত্বের বিষয়ে সরাসরি তদারকি করছে সরকারের ওই সংস্থাটি। গত শনিবার সকালে মহাসচিব পর্যায়ের বৈঠকে ইসলামী ঐক্যজোটের কোনও নেতা অংশ নিয়েছেন কিনা, এ নিয়ে সংস্থাটির নজরদারি ছিল চোখে পড়ার মতো। যদিও ওই দিন জোটের বৈঠকে ইসলামী ঐক্যজোটের কোনও নেতা অংশ নেননি। এদিন ময়মনসিংহে প্রতিনিধি সম্মেলন ছিল দলটির। শনিবার রাতে ময়মনসিংহ থেকে ফেরার সময় মুফতি ফয়জুল্লাহ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সরকারের চাপ তো অতীতেও ছিল। এটা তো জানেন’।
ইসলামী ঐক্যজোটের একনেতা দাবি করেন, বিএনপি-জোটের বৈঠকে না যেতে নিয়মিত চাপের সঙ্গে আমাদের মনিটিরং করা হচ্ছে।
ইসলামী ঐক্যজোট সূত্র জানায়, বিএনপিকে ছাড়তে সরকারের চাপ বিগত ছয়মাসে দ্বিগুণ হয়েছে। সম্প্রতি জোটের বৈঠকে না যেতেও চাপ ছিল। এ কারণে খালেদা জিয়ার সঙ্গে জোটের শীর্ষ নেতাদের বৈঠকটিতেও অংশ নেয়নি ঐক্যজোট। দলটিও ভেতরে-ভেতরে প্রস্তুতি নিচ্ছিল বিএনপির বিরুদ্ধে অবস্থান ঘোষণার। দলটির নেতারা পৌরসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ক্ষোভের কথা জানিয়ে আসছিলেন।
রবিবার দলটির শীর্ষ একাধিক নেতা জানান, প্রথমত সরকারের চাপ থাকলেও জোট ভাঙার কোনও সম্ভাবনা নেই। দ্বিতীয়ত, হেফাজতের ঘটনার পর সরকারের চাপে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিলে কওমি মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষকদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এই ইঙ্গিত দিয়েছেন খোদ ইসলামী ঐক্যজোটের মহাসচিব মুফতি ফয়জুল্লাহ। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে রবিবার সন্ধ্যায় বলেন, জোট ভাঙার কোনও শঙ্কা নেই। ইসলামী ঐক্য আরও শক্তিশালী হবে। এন্ট্রি আওয়ামী লীগ যে ভাবমূর্তি আলেম সমাজের মধ্যে আছে, সেটিকেও আর শক্তিশালী করা হবে। বিএনপি থেকে বেরিয়ে আসার খবর সরাসরি নাকচ করে হেফাজতের শীর্ষস্থানীয় এই নেতা বলেন, এ ধরনের কোনও সিদ্ধান্ত ইসলামী ঐক্যজোট নেয়নি।
দলের চেয়ারম্যান মাওলানা আবদুল লতিফ নেজামী বলেন, এটা তো পত্রিকার খবর। ৭ জানুয়ারি আমাদের দলের ত্রিবার্ষিক সম্মেলন। এখানে জোট ছাড়ার বিষয়ে কোনও সিদ্ধান্ত থাকবে না। এ নিয়ে গল্পের জন্ম হতে পারে। জোট কেন ছাড়ব, বলে পাল্টা প্রশ্ন করেন এই নেতা।
গোয়েন্দা সূত্র জানায়, হেফাজতে ইসলামের শাপলা চত্বরের ঘটনার পর ১৭৩জন আলেমের নামে মামলা দায়ের করা হয়। এরপর সরকারের সঙ্গে কর্মসূচি না দেওয়ার সমঝোতার ভিত্তিতে সরাসরি আল্লামা শফীর তত্ত্বাবধানে একটি তালিকা পাঠানো হয় সরকারের কাছে। এই তালিকায় যুক্তদের নামে মামলা না করাসহ গ্রেফতার না করার শর্তে কর্মসূচিতে না ফেরার ওয়াদা আদায় করা হয়। এরপর থেকে কয়েকবার শানে রেসালাত সম্মেলন করা হলেও কার্যকর কোনও কর্মসূচি দেয়নি হেফাজত। গ্রেফতারও করা হয়নি কোনও শীর্ষনেতাকে।
এ ব্যাপারে হেফাজতের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, হেফাজত কোনও তালিকা দেয়নি। হেফাজতের কর্মসূচি চলছে, সারাদেশে ইসলামের কাজে কওমি মাদ্রাসাগুলো কাজ করছে। ওয়াজ মাহফিলের মাধ্যমে আমরা কাজ করছি। এরপর আবার বলেন, কোনও তালিকা দেওয়ার কথা আমার জানা নেই।
সূত্র জানায়, হেফাজতের পর ঢাকার আলেমদের টার্গেট করে সরকারের একটি গোয়েন্দা সংস্থা। এরপর ধীরে ধীরে খেলাফত আন্দোলন, ইসলামী আন্দোলনসহ বিএনপিজোটের বাইরে থাকা কয়েকটি দলের সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধি করে সরকার। এর ফলে ঘরোয়াভাবে অনুষ্ঠান করার অনুমতি পায় চরমোনাই পীরের দল। খেলাফত আন্দোলনের মহাসচিব মাওলানা জাফরুল্লাহ খানের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার সময়ে বিতর্কিত ভূমিকার বিষয়েও চুপ হয়ে যায় সংস্থাটি।
সূত্রের দাবি, এই যোগাযোগ দিনে দিনে ইসলামী ঐক্যজোটের দিকে গড়ায়। মুফতি আমিনীর ছেলে হাসানাত আমিনীর দল খেলাফতে ইসলামীকে কর্মসূচি দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। বায়তুল মোকাররমে কর্মসূচিও পালন করে দলটি। এরপর ঐক্যজোটকে বিএনপি থেকে বের করানোর তৎপরতা শুরু হয়। তবে, দলটির চেয়ারম্যান আবদুল লতিফ নেজামীকে নিয়ে দুশ্চিন্তা ছিল গোয়েন্দাদের। ব্যক্তিগতভাবে ক্লিন ইমেজের এই নেতাকে নিয়ে জোটত্যাগ করার বিষয়ে দোটানা ছিল। তবে মুক্তিযুদ্ধের সময় নেজামে ইসলাম পার্টির বিতর্কিত ভূমিকা সামনে চলে আসবে—এমনটি মনে করে তিনি নিজেও জোটের বৈঠক কৌশলে বর্জন করেন। এ নিয়ে জানতে চাইলে বাংলা ট্রিবিউনকে আবদুল লতিফ নেজামী বলেন, এ বিষয়ে কোনও মন্তব্য নেই।
জানতে চাইলে বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা শামসুজ্জামান খান দুদু বলেন, সরকারের চেষ্টা তো রয়েছে, বিএনপিকে তছনছ করা, জোটকে তছনছ করা, রাজনীতিকে বিনষ্ট করা। তারা চাপ দিয়ে হোক, ভয় দেখিয়ে হোক, জোট ভাঙার চেষ্টা বিগত সময়ে করেছে। ইসলামী ঐক্যজোটের সঙ্গে বা জামায়াতের সঙ্গে কোনও ঝামেলা নেই। এটা হয়েছে তারা একটি দুটি বৈঠকে আসেনি। এর মানে এই না যে, জোট ছেড়ে যাবে। আর সরকারের তৎপরতা তো চলছে। থেমে নেই।
২০ দলীয় জোটের শরিক খেলাফত মজলিসের মহাসচিব অধ্যাপক আহমদ আবদুল কাদের বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ভাঙনের কাজ তো সরকার সব সময় করে। জোট ভাঙতে পারলে তো সরকারের লাভ। তবে এই মুহূর্তে জোট ভাঙবে বলে মনে হয় না। ঐক্যজোট তো তাদের কাউন্সিল নিয়ে ব্যস্ত। আর যৌক্তিক কোনও কারণও সামনে আসেনি।
একই মন্তব্য জোটের আরেক শরিক জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের নির্বাহী সভাপতি মুফতি ওয়াক্কাছের। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, পৌরসভাকে কেন্দ্র করে টুকটাক সমস্যা থাকে। এটাকে এত বড়ভাবে দেখার কিছু নেই। জানা মতে, ঐক্যজোট নিজেদের কাউন্সিল নিয়ে ব্যস্ত।
যদিও শনিবার ২০ দলীয় জোটের মহাসচিব পর্যায়ের বৈঠকে এ প্রসঙ্গ উত্থাপিত হলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও জোট সমন্বয়ক মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছিলেন, লোভে পড়ে কেউ জোট ছাড়লে বিএনপির কী করার আছে?
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা মাহফুযুল হক বলেন, শুধু ইসলামি দল নয়, সরকারের বাইরের সব দল চাপের মধ্যে আছে। এই রকম পরিস্থিতিতে কর্মসূচি নেওয়া খুব কঠিন। অনুষ্ঠান করার জন্য পুলিশ অনুমতি দেয় আগের দিন, কখনও কখনও অনুষ্ঠানের দিন। সব প্রস্তুতি শেষে যদি অনুমতি না দেওয়া হয়, তখন কী পরিস্থিতি হবে, সেই বিবেচনায় অনেক দল কর্মসূচি দিতেও চিন্তা ভাবনা করে। এছাড়া, হেফাজতের মামলা নিয়ে অনেকেই ঝামেলায় আছে।
জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য নূহ-উল আলম লেনিন বলেন, আওয়ামী লীগ কোনও দল বা জোট ভাঙার নীতিতে বিশ্বাস করে না। আমরা চিন্তাও করি না। ২০ দলীয় জোটের মধ্যে দল বা জোট ভাঙার কথা শোনা যাচ্চ্ছে। গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হচ্ছে। এ সবই জোটটির দলগুলোর কৃতকর্মের ফল।
ধর্মভিত্তিক দলগুলো এক হচ্ছে
কয়েকটি ধর্মভিত্তিক দলের সূত্রে জানা গেছে, ইসলামী ঐক্যজোট ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস আলেমদের অরাজনৈতিক ঐক্যের কথা বলছে। এ নিয়ে দল দুটি ঢাকার আলেম-ওলামা সমাবেশ ও ময়মনসিংহ প্রতিনিধি সম্মেলনেও আলেমদের ঐকের কথা জানিয়েছেন।
আলাপকালে ইসলামী ঐক্যজোটের মহাসচিব মুফতি ফয়জুল্লাহও ঐক্যের প্রতি জোর দিয়েছেন। তিনি বলেন, আলেমদের ঐক্যের বিকল্প নেই। বিশ্বেজুড়ে ইসলাম নিয়ে যে ধরনের ষড়যন্ত্র চলছে, এর মোকাবিলা করতে আলেমদের এক মঞ্চে আসতে হবে। আমরা আলেমদের ঐক্যের কথা বলছি। কোনও ভাঙনের কথা নয়।
সূত্র জানায়, ধর্মভিত্তিক দলগুলোর অরাজনৈতিক ঐক্যপ্রক্রিয়া দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টা। আগামী দিনে এর বাস্তবায়ন দেখা যেতে পারে। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই দীর্ঘদিন পর ইসলামী আইন বাস্তবায়ন কমিটি চাঙ্গা হয়েছে। দিয়েছে নতুন কমিটিও। ৭ জানুয়ারি ইসলামী ঐক্যজোটের ত্রিবার্ষিক সম্মেলনের পরই মাসের শেষের দিকে বাস্তবায়ন কমিটির সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা মাহফুযুল হক বলেন, ইসলামি দলগুলোর ঐক্যের প্রচেষ্টা দীর্ঘ দিনের। তবে, জোট বা ঐক্য মানে আওয়ামী লীগ-বিএনপির সঙ্গে জোট নয়, সব ইসলামি দলের জোট। তবে এখনো কোনও সিদ্ধান্ত হয়নি। দলের নির্বাহী পরিষদে আলোচনা করে ঐক্য নিয়ে সিদ্ধান্ত নেব।
/এমএনএইচ/








