প্রায় এক বছর আগে পেট্রোলবোমার আগুনে পোড়া মানুষগুলোর এখন আর কেউ খোঁজ নেয় না। আগুনে মুখমণ্ডলসহ শরীরের বিভিন্ন অংশ বিকৃত হওয়ায় স্বাভাবিকভাবে কারও সঙ্গে মিশতেও পারছেন না কেউ কেউ। বিএনপি-জামায়াত জোটের লাগাতার অবরোধে দুর্বৃত্তদের দেওয়া আগুনে পোড়া মানুষগুলোকে ঘরের মধ্যেই বন্ধী জীবন কাটাতে হচ্ছে এখন। অর্থের অভাবে অনেকের চিকিৎসাও এখন আর নিয়মিত করা যাচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি পুড়ে পঙ্গু হয়ে যাওয়ায় সীমাহীন কষ্টে দিন পার করছেন পরিবারের সদস্যরা।
বাংলা ট্রিবিউনের কাছে এসব অভিযোগ করেছেন পেট্রোলবোমায় দগ্ধরা।
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রতিহত করতে বিএনপি ও জামায়াতসহ ২০ দলীয় জোটের টানা ৯৩ দিনের অবরোধে সারাদেশে ব্যাপক নাশকতা চালানো হয়। সারাদেশে পেট্রোলবোমা, ককটেল বিস্ফোরণ, বাসে আগুন ও পিটিয়ে মানুষ হত্যা করা হয়। তখন সারাদেশে নারী ও শিশুসহ অন্তত ৯৫ জনের মৃত্যু হয়। অগ্নিদগ্ধ হয়ে নিহত হন ৬৪ জন। দগ্ধ ও আহত হয়েছেন আরও এক হাজার ৪১৩ জন।
আহতদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পেট্রোলবোমার দগ্ধ মুখ নিয়ে বন্ধী জীবনযাপন করছেন তারা। মুখের আকৃতি পরিবর্তন হওয়ায় নিজের সন্তানও কাছে আসে না। এমন অসহনীয় জীবন তারা চান না। ক্ষমতার জন্য যারা মানুষকে পুড়িয়ে হত্যা করে তাদের ধিক্কার জানিয়ে এমন রাজনীতি পরিহার করারও অনুরোধ করেছে তাদের অনেকে।
ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলার পাঁচরুখী গ্রামে বাড়ি সালাউদ্দিনের। রাস্তার পাশেই টিনের ঘর। কোনওরকম পরিবার নিয়েই ওই ঘরে বসবাস করেন তিনি। এক সময়ে যে ঘর থাকতো উচ্ছাস আর আনন্দে সেই ঘরে এখন বিষাদের ছায়া। কারণ যার আয়ে সচল থাকতো পুরো পরিবার সেই ব্যক্তি এখন অচল হয়ে পড়ে আছেন বিছানায়। ২০১৪ সালের ২৩ জানুয়ারি রাতে যাত্রাবাড়ীতে দুর্বৃত্তদের পেট্রোলবোমা হামলায় দগ্ধ হন সালাউদ্দিন।
তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বাবা আবদুস সাত্তার মারা গেছেন চার বছর আগে। তখন থেকেই আমি ঢাকার এলিফ্যান্ট রোডে ‘ক্যাথে রেডিমেন্ট গার্মেন্ট’ নামের একটি কাপড়ের দোকানে চাকরি শুরু করি। বেতন ভালোই দিত দোকান মালিক। আর সে বেতনের টাকা দিয়েই চলতো পুরো সংসার। চার ভাই ও তিন বোনের মধ্যে সালাউদ্দিন তৃতীয়। সালাউদ্দিনের দুই ছেলে হাসিব হোসেন ও আবির হোসেন দুইজনই স্থানীয় পাঁচরুখী হাজী সাহেব আলী ফকির উচ্চ বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র।
কিছুদিন আগেও ছেলেদের সঙ্গে ঘুরতে যেতাম ছুটি পেলেই। তারাও সব সময়ে আমার কাছেই থাকতো। কিন্তু আগুনে আমার শরীর পুড়ে যাওয়ার পরে এখন অনেকেই ভয় পায়। বলেই কাঁদতে শুরু করেন সালাউদ্দিন। বলেন, ‘আমার কি দোষ, নিজের পেটের তাগিদেই ঝুঁকি নিয়ে দোকানে গিয়েছিলাম। ২৩ জানুয়ারি রাত ১০টায় যখন বাসে করে ফিরছিলাম তখনই একটি পেট্রোলবোমায় পুরো বাসটি জ্বলে উঠে। অনেকের সঙ্গে আগুনে পুড়ে যাই আমিও। ভর্তি করা হয় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে থেমে থেমে ছয় মাস চলে চিকিৎসা। সরকার ওই সময়ে হাসপাতালের চিকিৎসার টাকা মওকুফ করেছিল।’
সালাউদ্দিন বলেন, ‘এখন পর্যন্ত চিকিৎসা করাতে চার লাখ টাকার মতো খরচ হয়েছে। এর মধ্যে একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা করাতেই চলে গেছে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা। এখন চিকিৎসা করারও অবস্থা নেই। ফলে শরীরের অবস্থা দিন দিন নাজুক হচ্ছে।’
কথাগুলো বলতে গিয়ে ডুকরে কাঁদলেও চোখের পানি ঠিকমতো বের হচ্ছিল না তার। কারণ পেট্রোলবোমার আগুন জালিয়ে দিয়েছে তার শরীর, শুকিয়ে দিয়েছে চোখের পানিও। এখনও বিছানায় শুয়ে কাতরাচ্ছেন তিনি।
তিনি বলেন, নির্মম রাজনীতির শিকার হয়েছি আমি। কিন্তু কোনও অনুদান পাই নাই। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের বার্ন ইউনিটে ভর্তি থাকার সময়ে টেলিভিশনের মাধ্যমে সরকারকে আহ্বান করেছিলাম আমাকে ১০ লাখ টাকা অনুদান দিতে। তাহলে সংসার নিয়ে চলতে পারতাম। কিন্তু সরকার, স্থানীয় প্রশাসন কোনও অনুদান দেয়নি। এখনও আমার পেছনে মাসে ৮ থেকে ৯ হাজার টাকা চিকিৎসার জন্য খরচ হচ্ছে। আর কয়েক মাস পর সেই টাকা যোগাড় করতেও হিমশিম খেতে হবে।’
শেষ দিকে একটু জোর দিয়েই বললেন, ‘চেহারা আগুনে পুড়েছে সেটা না হয় মানিয়ে নিতে পারবো। কিন্তু দুই হাতও পুড়ে অচল হয়ে যাচ্ছে। এখন তো আর কাজ করতে পারবো কিনা সেটা নিয়েও সন্দিহান। আমি আবার কাজ করতে চাই। হাল ধরতে চাই সংসারের। ভালো চিকিৎসা পেলে হয়তো আবার কাজ করতে পারবো। আমার তো বয়স আছে নেই শুধু সক্ষমতা।’
বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার রিপোর্টে জানা গেছে, এরকম আরও অর্ধশতাধিক কর্মক্ষম মানুষ পেট্রোলবোমায় দগ্ধ হয়ে পঙ্গুত্ব জীবনযাপন করছে। যারা আর কোনওদিন স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবে না। এরকমই আরও একজন ময়মনসিংহের গফরগাও উপজেলার ছয়বাড়িয়া গ্রামের বৃদ্ধা মনুরদ্দিন ওরফে মনু মিয়া (৬০)। ২০১৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ১৩ মার্চ রাত ১টার দিকে ঢাকার বিমানবন্দর রেলস্টেশনে পেট্রোলবোমা হামলার শিকার হন। তিনি পেশায় ডিম বিক্রেতা ছিলেন। সাত সদস্যের পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি তিনি। পেট্রোলবোমা হামলার পর দগ্ধ হয়ে তার জীবনের সঙ্গে পরিবারটিও অচল হয়ে যায়। হামলার শিকারের পর ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে দুইমাস চিকিৎসা নেন তিনি। চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফিরলেও আজীবন পঙ্গত্ব বরণ করতে হয়েছে তাকে। তার কমড়ের নিচের অংশ পুরে গেছে। তার পঙ্গুত্বে এই পরিবারে নেমে আসে চরম আর্থিক দৈন্যতা। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ডিম বিক্রেতা মনু মিয়ার অল্প পরিমাণ ফসলি জমি ও বাড়ি ভিটাটুকু ছাড়া আর কিছুই নেই।
মনু মিয়ার ছেলে কলেজ ছাত্র আজিজুল জানায়, অর্থের অভাবে তার কলেজ যাওয়া এখন বন্ধ হওয়ার পথে। একই কথা বললেন তার আরেক স্কুল পড়ুয়া ছেলে খায়রুল বাসার ও আনারুল ইসলাম।
পেট্রোলবোমায় দগ্ধ মনু মিয়ার স্ত্রী আমেনা খাতুন (৫০) বলেন, আল্লাহ যেভাবে চালাচ্ছে, তেমনই চলছি। সরকার থেকে মাত্র ১০ হাজার টাকা অর্থ সহায়তা পেয়েছিলেন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায়। এছাড়া কোনও অর্থ সহায়তা তো দূরের কথা কেউ কোনও খোঁজ-খবরও নেয়নি।
অপরদিকে বিএনপি জামায়াতের অবরোধের সময় নাশকতায় দায়েরকৃত অধিকাংশ মামলার তদন্ত চলেছে ধীরগতিতে। বড় নাশকতার ঘটনায় দায়ের করা মামলা তদন্তে নেই উল্লেখযোগ্য অগ্রগিত। পুলিশ সদর দফতর থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, গত ৫ জানুয়ারি থেকে ৩০ মার্চ পর্যন্ত সারাদেশে নাশকতার অভিযোগে ১ হাজার ৭৭৫টি মামলা দায়ের করা হয়। আসামির তালিকায় রয়েছেন বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নেতাসহ মাঠ পর্যায়ের কয়েক হাজার কর্মী। এর মধ্যে যানবাহনে পেট্রোলবোমা ছুড়ে মানুষ হত্যার অন্তত চারটি ঘটনায় বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়াকে হুকুমের আসামি করে মামলা হয়েছে।
গত ৩ ফেব্রুয়ারি গভীর রাতে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের জগমোহনপুর এলাকায় কক্সবাজার থেকে ছেড়ে আসা আইকন পরিবহনের একটি বাসে পেট্রোলবোমা নিক্ষেপ করলে আট যাত্রী নিহত হন। চৌদ্দগ্রাম থানার এসআই নুরুজ্জামান বাদী হয়ে হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে মামলা দুইটি দায়ের করেন। মামলায় ৫৬ জনের নাম উল্লেখ এবং অজ্ঞাত ২০ জনের কথা বলা হয়। একটি মামলায় উস্কানিদাতা হিসেবে আসামি করা হয় বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে। এখনও মামলাটির তদন্ত চলছে। কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে বাসে নাশকতার ঘটনায় ৮ জন নিহতের মামলায় ১১ মাসেও চার্জশিট দিতে পারেনি পুলিশ।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা চৌদ্দগ্রাম থানার এসআই মো.ইব্রাহিম জানান, নিহতদের ২ জনের পোস্টমর্টেম সম্পন্ন হয়েছে। বাকিদের লাশ উত্তোলনের জন্য আদালত নির্দেশ দিয়েছে। এদিকে এসব মামলায় ২৬ জনকে গ্রেফতার করেছেন বলে তিনি জানান। তাদের অনেকে এখন জামিনে রয়েছেন।
চৌদ্দগ্রাম থানার পরিদর্শক(তদন্ত) আবদুল্লাহ আল মাহফুজ জানান, পোস্টমর্টেম সম্পন্ন না হওয়ায় এখনও মামলার চার্জশিট দেওয়া যায়নি।
৬ ফেব্রুয়ারি রাতে গাইবান্ধার তুলসীঘাট এলাকায় নাপু পরিবহন নামে একটি বাসে পেট্রোলবোমা হামলায় আট যাত্রী নিহত হন। এ ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে একটি মামলা করেন। এ মামলা হয় স্থানীয় থানায়। মামলার প্রধান আসামি মোস্তফা মঞ্জিল গত ১৭ ফেব্রুয়ারি গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে র্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন। এ মামলাটির তদন্ত চলছে।
তবে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) এলাকায় দায়ের করা ৪৫৭টি নাশকতা মামলার ২৫৯টি অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। তিনটিতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে ডিএমপির যুগ্ম পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম) কৃষ্ণ পদ রায়।
গত ২৪ জানুয়ারি রাতে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে গ্লোরি পরিবহনে পেট্রোলবোমা ছুড়ে মারে দুর্বৃত্তরা। এ সময় বাসের ভেতর ২৯ জন যাত্রী দগ্ধ হন, মারা যান একজন। এ ঘটনায় যাত্রাবাড়ী থানায় এসআই কেএম নুরুজ্জামান বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেন। পরে মামলাটি যাত্রাবাড়ী থানা থেকে ডিবিতে স্থানান্তর হয়। এই মামলায় খালেদা জিয়াসহ বিএনপির আরও ৩৮ নেতাকর্মীকে আসামি করে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে।
/এআরআর/
/আপ:আরএ/
প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন আমাদের কুমিল্লার প্রতিনিধি এসআই ইব্রাহিম, নারায়ণগঞ্জের প্রতিনিধি তানভীর হোসেন, গাইবান্ধার প্রতিনিধি তাজুল ইসলাম রেজা এবং ময়মনসিংহের প্রতিনিধি আশরাফ উদ্দিন সিজেল।








