বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের সিনিয়র নেতা বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বলেছেন, সরকারবিরোধী আন্দোলনে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ নিয়ে তার সংশয় আছে। পাশাপাশি বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া যেহেতু সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে নেই, সে কারণে বিরোধী রাজনৈতিক শিবিরে নতুন নেতৃত্বের কাঠামো গড়ে ওঠা অপরিহার্য বলেও মনে করেন তিনি।
বৃহস্পতিবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় রাজধানীর মহাখালী ডিওএইচএসে কল্যাণ পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে বাংলা ট্রিবিউনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন মেজর জেনারেল অব. সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম। মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদান রাখায় বীর প্রতীক খেতাবপ্রাপ্ত এই রাজনীতিক ২০০৭ সালে ওয়ান-ইলেভেন সরকারের সময়ে বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি গঠন করেন। তিনি দলটির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান। তার সঙ্গে কথোপকথনের উল্লেখযোগ্য অংশ তুলে ধরা হলো।
বাংলা ট্রিবিউন: আপনারা রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের আহ্বানে নির্বাচন কমিশন গঠনের জন্যে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে অনুষ্ঠিত মতবিনিময়ে অংশ নিয়েছিলেন। যদিও রাষ্ট্রপতি গঠিত সার্চ কমিটির নাম দেওয়ার আহ্বানে সাড়া দেননি। এই বিষয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?
সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম: আমরা তিনটা স্বার্থকে বিবেচনা করে চলি। প্রথমত, দেশের স্বার্থ। এ ব্যাপারে কোনও অবস্থাতেই আপস নাই। দ্বিতীয়ত, দলের স্বার্থ। তৃতীয়ত জোটের স্বার্থ। জোট বলতে দেশের জনগণ। বাংলাদেশের সংবিধানে একটা অসঙ্গতি আছে। ১৯৯১ সালে সেপ্টেম্বরে যে সব রাজনৈতিক দল পার্লামেন্টে ছিলো, উনাদের অদূরদর্শিতা বা অমনোযোগিতার কারণে এই মারাত্মক অসঙ্গতির সৃষ্টি। প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির মধ্যে ক্ষমতা ভারসাম্য নাই। আমরা এ কথাটা বলতে গিয়েছিলাম বঙ্গভবনে। দ্বিতীয়ত গিয়েছিলাম আমি একটা সুযোগের অপেক্ষায় ছিলাম। রাষ্ট্রপতির কাছে আবেদন করতে যে, খালেদা জিয়াকে মানবিক কারণে বিদেশে পাঠান। আপনি (রাষ্ট্রপতি) এই দায়িত্বটুকু নেন। আমরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছেও গিয়েছিলাম। এটা নতুন কিছু না।
বাংলা ট্রিবিউন: তা হলে এক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির করণীয় কী?
সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম: কিচ্ছু নাই। উনার হাত-পা তো বাঁধা। সংবিধান উনার হাত বেঁধে দিয়েছে। এর জন্য বাংলাদেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল দায়ী। তাদের অমনোযোগ, অদূরদর্শিতার জন্য ১৯৯১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সংবিধান সংশোধনের সময় এই ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি হয়েছিল। যার ফলে, দুর্ভোগ আজ সমগ্র জাতি ভোগ করছে, বিরোধী শিবিরের রাজনৈতিক দলগুলো ভোগ করছে।
বাংলা ট্রিবিউন: কিন্তু এই সমস্যাগুলো নিয়ে তো দীর্ঘদিন রাজনীতিতে আছেন, আমরা কিন্তু খুব কমই দেখতে পাই যে, এই ব্যাপারগুলো নিয়ে আপনারা প্রকাশ্যে কথা বলছেন।
সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম: সৈয়দ মোহাম্মদ ইবরাহিম ব্যক্তি ব্যতিক্রম। তিনি এই পর্যন্ত সাড়ে ছয়শ’ বার বিভিন্ন টেলিভিশন অনুষ্ঠানে গিয়েছেন এবং এর মধ্যে দুইশ’ বার মিনিমাম বলেছেন— আমাদের সংবিধানে অনেক অসঙ্গতি আছে।
বাংলা ট্রিবিউন: আপনি একইসঙ্গে ২০ দলীয় জোটের একজন শীর্ষপর্যায়ের নেতা। এসব সাংবিধানিক যেসব সমস্যার কথা আপনি বলছেন, বিষয়গুলো সামনে রেখে নির্বাচনকেন্দ্রিক কোনও পরিকল্পনা করছেন?
সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম: বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির নীতিবাক্য হচ্ছে— ‘কল্যাণের জন্য রাজনীতি’। অর্থাৎ, আমরা বাংলাদেশের রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন চাই এবং এই গুণগত পরিবর্তন যদি করতে হয়, আমি একা পারবো না। আমাদের দলও পারবে না। আমাদের পার্লামেন্টে অনেক লোক লাগবে, যারা সোচ্চার হবে এবং সেটা অর্জন করতে গেলে বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টিকে জাতীয় রাজনীতির নেতৃত্বের অংশীদার হতে হবে। ফলে অনেকগুলো ধাপ পেরুতে হবে।
বাংলা ট্রিবিউন: তাহলে এই ধাপগুলো কীভাবে অতিক্রম করবেন?
সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম: এটা বলার সময় আসেনি। আমরা চিন্তা করছি কী কী ধাপ অতিক্রম করতে হবে। একটা ধাপ আছে— রাজপথে যদি সক্রিয় আন্দোলন করা যায়। রাজপথের সফল আন্দোলন।
বাংলা ট্রিবিউন: মানুষ কি এসব দাবির আন্দোলনে সংযুক্ত হবে বলে মনে করেন?
সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম: এটা সংশয় আছে।
বাংলা ট্রিবিউন: কেন আপনার সংশয় মনে হচ্ছে?
সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম: ২০১৩ সালের চাঁদ দেখা আন্দোলন, ২০১৪ সালে নির্বাচন প্রতিহত করার আন্দোলন, ২০১৫ সালে অবরোধ-আন্দোলনে ২০ দলীয় জোট— প্রধানত প্রথম শরিক বিএনপি, দ্বিতীয় শরিক জামায়াতের লাখ লাখ কর্মী মামলায় ভারাক্রান্ত। সবচেয়ে বড় কথা সেখানে (মামলায়) বেনামি লেখা থাকে। ২০২২ এসেও সেখানে নাম দেওয়া সম্ভব। ৩৫ লাখ মামলা, এই মামলার ভার কাঁধে নিয়ে কর্মীদের সাহস জুগিয়ে রাজপথে আনা, এটাই একটা চ্যালেঞ্জ।
বাংলা ট্রিবিউন: এই চ্যালেঞ্জ কীভাবে মোকাবিলা করবেন?
সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম: ঐক্যবদ্ধ একটা নেতৃত্ব গড়ে তুলতে পারলে একটা ফর্মুলা বের হবে। অর্থাৎ সবাইকে অবদান রাখতে হবে। বড় শরিককেও রাখতে হবে, মেজো শরিককেও রাখতে হবে, ছোট শরিককেও রাখতে হবে।
বাংলা ট্রিবিউন: অবদানের প্রসঙ্গ যেহেতু এলো, ইতোমধ্যে আপনাদের ২০ দলীয় যারা বিএনপির পক্ষ থেকে মতবিনিময়ের একটা সিদ্ধান্ত হয়েছে। এই মতবিনিময়ের মধ্য দিয়ে কি রাজনৈতিক প্রত্যাশা পূরণ হচ্ছে, বা পূরণ হবে বলে মনে করেন?
সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম: বিএনপি ভাষায় বৃহত্তর ঐক্যগড়ে তোলা এবং বিএনপি আমাদের প্রধান শরিক, আমি শ্রদ্ধাশীল। জনগণের ভাষায় এই সরকারকে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে অপসারণে একটা রাস্তা বের করতে হবে। রাজপথের আন্দোলন গণতান্ত্রিক পদ্ধতির একটি অন্যতম অংশ। এখন আলোচনা কতদিন চলবে, আমি শিউর না। আমি মনে করি, ২০১২ সালে রাজনীতির আকাশে প্রধান নক্ষত্র ছিলেন খালেদা জিয়া। আজকে তিনি সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে নাই। যেকোনও কৌশলে সরকার তাকে পর্দার অন্তরালে নিয়ে গেছে। তাহলে বাংলাদেশের বিরোধী শিবিরের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন নেতৃত্বের কাঠামো গড়ে ওঠাটা অপরিহার্য হয়ে ওঠেছে, এটাও একটা লক্ষ্য।
বাংলা ট্রিবিউন: কী ধরনের নেতৃত্বের কাঠামো গড়ে ওঠার কথা বলছেন?
সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম: সবার মিলিত। আপনি তো আরেকজন খালেদা জিয়া পাবেন না। সুতরাং, সম্মিলিতভাবে আমাদেরকে এই উদ্যোগটা নিতে হবে এবং এই সময় উত্তোরণ করতে হবে।
বাংলা ট্রিবিউন: এই নেতৃত্বের মধ্য দিয়ে আগামী নির্বাচনকে আপনারা মোকাবিলা করতে চাচ্ছেন?
সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম: আগামী নির্বাচনকে ফেস (মোকাবিলা) করবো, শর্ত একটাই নিরপেক্ষ সরকার।
ছবি: সাজ্জাদ হোসেন









