যৌন নিপীড়নের অভিযোগ নিষ্পত্তির প্রশ্নে বাসদের ‘টালবাহানায়’ ক্ষুব্ধ ৩১ নারী

বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট
২২ জুন ২০২৩, ১৯:১২আপডেট : ২২ জুন ২০২৩, ২০:০১

সম্প্রতি বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) একাধিক কেন্দ্রীয় নেতার বিরুদ্ধে গুরুতর যৌন নিপীড়নের অভিযোগ উঠেছে। তা নিষ্পত্তির প্রশ্নে দলটির ‘টালবাহানায়’ ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ৩১ জন নারী অধিকারকর্মী। বৃহস্পতিবার (২২ জুন) গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে এই ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন তারা।

বিবৃতিতে বলা হয়, সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) একাধিক কেন্দ্রীয় নেতার বিরুদ্ধে গুরুতর যৌন নিপীড়নের অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, পূর্বে উত্থাপিত এ ধরনের অভিযোগ দলের নেতৃস্থানীয়রা আমলে না নিয়ে, নানাভাবে অস্বীকার করে ধামাচাপা দিয়েছেন। এই পরিস্থিতিতে আমরা বিস্ময় ও ক্ষোভের সঙ্গে লক্ষ করছি যে বাসদ অভিযোগ নিষ্পত্তির কোনও গণতান্ত্রিক এবং সম্মানজনক পথ অবলম্বন না করে বরং কালক্ষেপণ এবং অভিযোগকারীদের কালিমালেপনের চিরায়ত পিতৃতান্ত্রিক কৌশল অবলম্বন করছেন। একটি বিপ্লবী সমাজতান্ত্রিক দলের এই আচরণ আমাদের স্তম্ভিত করেছে।’

এতে আরও বলা হয়, ‘বাংলাদেশে যৌন হয়রানিবিরোধী আন্দোলনের অংশীজন হিসেবে আমরা জানি যে এই ধরনের অভিযোগ উত্থাপন কোনও নারীর জন্য সহজ না। ভুক্তভোগী নারীরা সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে হেনস্তা হওয়ার ঝুঁকি মাথায় নিয়ে জনপরিসরে অভিযোগগুলো উত্থাপন করেছেন এবং স্বাধীন তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। ইতোমধ্যে একাধিক প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠন, বাসদের প্রাক্তন কর্মীরা ভুক্তভোগীদের এই দাবির সঙ্গে সংহতি জানিয়েছে। একই সঙ্গে তারা যৌন নিপীড়ন ও শোষণমূলক লিঙ্গীয় সম্পর্কের চর্চাকে সংগঠন থেকে সমূলে উৎপাটনের জন্য একটি যৌন নিপীড়নবিরোধী সেল এবং নীতিমালা প্রণয়নের আহ্বান জানিয়েছে। আমরা তাদের দাবির সঙ্গে সম্মতি ও সংহতি প্রকাশ করছি।’

বিবৃতিতে ক্ষুব্ধ অধিকারকর্মীরা জানান, “আমরা ক্ষুব্ধচিত্তে লক্ষ করছি যে যেই রাজনৈতিক সংবেদনশীলতার সঙ্গে যৌন হয়রানির  মতো অভিযোগকে আমলে নেওয়ার কথা ছিল, বাসদ তা করেনি বরং শাসকগোষ্ঠীর ষড়যন্ত্র তত্ত্বের শরণাপন্ন হয়েছে। বাংলাদেশ ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের অভিযোগ উঠলে তারা যেভাবে প্রথমে অস্বীকার করে এবং পরে অভিযোগটিকে দলের বিরুদ্ধে একটি ষড়যন্ত্র হিসেবে ঘোষণা দেয়, বাসদও একইভাবে অভিযোগ নিষ্পত্তি না করে যিনি হুইসেলব্লোয়ার তার বিরুদ্ধেই সাংগঠনিক কাজে নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ এনে তাকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করেছে। বাসদ এবং তার অঙ্গসংগঠনের কাছে রাষ্ট্রীয় মদতপুষ্ট ছাত্রলীগের যৌন নিপীড়ন প্রতিবাদযোগ্য কিন্তু নিজ দলের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগকে সর্বোতভাবে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছেন তাদের নেতাদের ‘অযৌন’, ‘ত্যাগী’ আদর্শবাদী ভাবধারা কথা তুলে। এটি আমাদের ক্ষুব্ধ করেছে।”

এতে বলা হয়, ‘বাসদের একাধিক কর্মী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুক্তভোগী এবং তাদের পাশে যারা দাঁড়িয়েছে তাদের প্রতি যৌনবাদী মন্তব্য ছুড়ে দিয়েছেন। যেমন, অভিযোগকারী নারীরা অভিযুক্তকে প্রলুব্ধ (যৌন ইঙ্গিতময় আচরণ করেছে) করার চেষ্টা করেছে, অভিযোগকারী সমাজের নিয়ম মেনে চলা নারী নয় (নর্তকী, পার্টি অফিসে সিগারেট খায়) ইত্যাদি। এই ধরনের প্রতিক্রিয়া ভিক্টিম-ব্লেমিংয়ের ন্যক্কারজনক উদাহরণ এবং বাসদের পিতৃতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির লজ্জাজনক বহিঃপ্রকাশ। আমরা এ ধরনের আচরণ ও বক্তব্যের তীব্র নিন্দা জানাই।’

বিবৃতিতে বলা হয়, ‘বাসদের অনেকে তাদের নিজ দলে যৌন নিপীড়নবিরোধী নীতিমালা প্রণয়নের দাবিকে সমাজতান্ত্রিক দলের জন্য অপ্রয়োজনীয় বলে উল্লেখ করেছেন এবং বলেছেন, এ ধরনের নীতিমালা কেবল মাত্র বুর্জোয়া প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রযোজ্য। দলের কিছু কর্মীর দাবি, দলের অভ্যন্তরে এ ধরনের অভিযোগ অতীতে নিষ্পত্তি হয়েছে। আমাদের প্রশ্ন, অভিযোগ যদি সুষ্ঠুভাবে নিষ্পত্তি হয়ে থাকে তাহলে দলের প্রাক্তন নারী কর্মীরা কেন সাংগঠনিক চর্চায় লিঙ্গীয় নিপীড়ন ও যৌন দাসত্বের অভিজ্ঞতার কথা বলছেন? আমরা সুস্পষ্টভাবে বলতে চাই, স্থান-কাল-পাত্র ভেদে যৌন নিপীড়নের সংজ্ঞা বদলায় না। কী পরিবার হোক বা বিপ্লবী সংগঠন বা ক্যাম্পাস—ধর্ষণ বা যৌন নিপীড়ন সব ক্ষেত্রেই অবাঞ্ছনীয়, অন্যায় এবং গুরুতর অপরাধ। বাসদের নেতাকর্মীদের এ ধরনের বক্তব্য তাদের স্থূল পুরুষালী চিন্তা এবং লিঙ্গীয় ও যৌন রাজনীতি নিয়ে তাদের অমীমাংসিত রাজনৈতিক অবস্থানের স্মারক।’

বিবৃতিতে ক্ষুব্ধ নারীরা জানান, ‘আমরা বাংলাদেশের নারী আন্দোলনের কর্মী হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে জানতে চাই, সাম্প্রতিক সময়ে উত্থাপিত অভিযোগগুলো নিরসনে কালক্ষেপণ ও অভিযোগকারী সদস্যকে দল থেকে বহিষ্কার করা ছাড়া বাসদ সাংগঠনিকভাবে আর কী উদ্যোগ নিয়েছে? যৌন নিপীড়নবিরোধী নীতিমালাকে বুর্জোয়া বলে খারিজ করে দিয়ে এ ধরনের অভিযোগ নিষ্পত্তি করার জন্য কি বিপ্লবী পন্থা বাসদ অবলম্বন করছে? একইসঙ্গে আমরা সুস্পষ্টভাবে বলতে চাই, লিঙ্গীয় সমতার প্রশ্নকে পাশ কাটিয়ে, যৌন সহিংসতার ঘটনাকে কভারআপ করার মধ্য দিয়ে বাসদ তার বৈপ্লবিক আদর্শচ্যুত হয়েছে এবং জনগণের সংগ্রামে নেতৃত্ব দেওয়ার রাজনৈতিক বৈধতা হারিয়েছে।

এমতাবস্থায় বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের কাছে আমাদের আহ্বান, অভিযুক্ত নেতাদের সাংগঠনিক পদ থেকে সাময়িক অব্যাহতি দিয়ে সুষ্ঠু তদন্তের পথ তৈরি করুন, এছাড়া এই রাজনৈতিক সংকট উত্তরণের আর কোনও গ্রহণযোগ্য বিকল্প নেই।’

/আরআইজে/এমওএফ/
সম্পর্কিত
ধর্ষণের শিকার শিশু ৪ মাসের অন্তঃসত্ত্বা, থানায় মামলা
শিশুকে যৌন নির্যাতনের অভিযোগে একজনকে পিটিয়ে থানায় সোপর্দ
ছাত্রী ও শিক্ষিকাদের উত্ত্যক্ত করায় এনসিপি নেতাকে জুতাপেটা!
সর্বশেষ খবর
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
বাসায় ফিরে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন আ.লীগের আইভী
বাসায় ফিরে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন আ.লীগের আইভী
বিদ্যুতের দাম বাড়ায় শিল্প ও জ্বালানি খাতে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে
বিদ্যুতের দাম বাড়ায় শিল্প ও জ্বালানি খাতে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম