জাতীয় পার্টির মহাসচিব ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী বলেছেন, ‘শুক্রবার (২৯ আগস্ট) কাকরাইলে গণঅধিকার পরিষদ ও জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষে আমাদের দলের ২৯ জন আহত হয়েছেন। গুরুতর আহত হয়েছেন কয়েকজন। আজও (শনিবার) আমাদের অফিসে আগুন দেওয়ার চেষ্টা করা হলো।’
শনিবার (৩০ আগস্ট) সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে আলাপকালে শামীম হায়দার পাটোয়ারী এ কথা বলেন। এ সময় তিনি প্রতিবেদকের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন।
মহাসচিব বলেন, ‘আজও আমাদের পার্টির কাকরাইল অফিসে আগুন দেওয়া হলো। ভাঙচুরের চেষ্টা করা হলো। আমরা মনে করি, এর মাধ্যমে দেশকে বিশৃঙ্খলার দিকে নিয়ে যাওয়ার পাঁয়তারা হচ্ছে। জাতীয় পার্টিকে ভিকটিম করা হচ্ছে। জাতীয় পার্টিকে টার্গেট করা হচ্ছে। এটা অবশ্যই দুঃখজনক।’
‘রাষ্ট্র ও সরকার এ বিষয়ে সতর্ক ভূমিকা নেবে বলে আমরা আশা করছি।’ বলেন ব্যারিস্টার শামীম।
এ ঘটনায় আইনগত কোনও ব্যবস্থা নেবেন কিনা, এমন প্রশ্নে মহাসচিব বলেন, ‘আমরা পার্টির ফোরামে এ বিষয়ে আলাপ করছি। আমরা চাচ্ছি পরিস্থিতি শান্ত হোক। পাশাপাশি ভিপি নুরুল হক অসুস্থ, আমরা তার সুস্থতা কামনা করছি। তার জন্য দোয়া করছি। তার সুস্থতাই আমাদের সর্বোচ্চ প্রায়োরিটি। আমরা আইনগত বিষয়গুলো যাচাই-বাছাই করছি।’
শুক্রবার সন্ধ্যার পর জাতীয় পার্টিকে নিষিদ্ধের দাবিসহ বিভিন্ন দাবিতে গণঅধিকার পরিষদের বিক্ষোভ ও মশাল মিছিলকে কেন্দ্র করে উভয়পক্ষের মধ্যে পরিস্থিতি সাংঘর্ষিক হয়। পরে এই ঘটনায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা লাঠিচার্জ করেন।
এ ঘটনায় পরিষদের পুরানা পল্টনের অফিসের গলিতে মারধরের শিকার হন সভাপতি নুরুল হক নুর। মাথা ও নাকে তিনি আঘাত পান। বর্তমানে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে তিনি চিকিৎসাধীন।
শনিবার এই ঘটনায় বিভিন্ন দল প্রতিবাদ ও সমাবেশ করে। সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন ও এবি পার্টি। ঘটনার তীব্র নিন্দা জানান বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকিসহ অনেক দলের নেতারা।
জামায়াত, এনসিপি ঘরানার দলগুলো অভিযোগ করছে, রাষ্ট্রীয় সংস্থার তত্ত্বাবধানে জাতীয় পার্টিকে আগামী নির্বাচনেও বিরোধী দল করার পরিকল্পনা চলছে। যদিও বিএনপি মনে করছে, আগামী নির্বাচনকে বানচাল করার চেষ্টার অংশ হিসেবেই জাতীয় পার্টিকে কেন্দ্র করে এই অস্থিরতা শুরু হয়েছে। দলের নেতা তারেক রহমান শনিবার সকালে এক বিবৃতিতে বলেছেন, গণতন্ত্রপন্থিদের অবশ্যই সংযম বজায় রাখতে হবে।
যদিও শনিবার সন্ধ্যায় আবারও জাপার কার্যালয় ভাঙচুর করতে যায় একদল জাপাবিরোধী লোকজন।
বাংলা ট্রিবিউনের সরেজমিন প্রতিবেদকরা জানাচ্ছেন, শনিবার (২৯ আগস্ট) সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় পুলিশের সামনেই কার্যালয়ে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করা হয়। এর আগে ফারুক ও রাশেদ খানের নেতৃত্বে বিক্ষোভ মিছিল শেষ হওয়ার পরপরই একদল নেতাকর্মী হামলার চেষ্টা চালান। এক পর্যায়ে জাপার কার্যালয়ে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়। এতে ভেতরের একটি কক্ষে থাকা বেশ কিছু প্রকাশনা সামগ্রী পুড়ে যায়। এ সময় জলকামান দিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে পুলিশ। অপরদিকে এইচ এম এরশাদের ছবির ফলক ভেঙে ক্ষত-বিক্ষত করা হয়।
জাতীয় পার্টির উচ্চপর্যায়ের একজন দায়িত্বশীল বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে আলাপকালে উল্লেখ করেছেন, তারা ইতোমধ্যে সরকার ও বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর পক্ষ থেকে জাপাকে ধৈর্য ধরার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে, নেতাকর্মীদের দিয়ে পাল্টা অবস্থান সৃষ্টি না করতে বলা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে জাপার নেতৃত্বকে পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের আচরণ ফলো করতে বলা হয়েছে।
শনিবার সন্ধ্যায় জাপার শীর্ষ পর্যায়ের একজন এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘আমাদের পক্ষ থেকে এখনই বলতে চাই না। পরিস্থিতি আরও শান্ত হোক। জাতীয় পার্টি কখনও দোসর ছিল না। শুরু থেকে দলের চেয়ারম্যান জিএম কাদের জুলাই আন্দোলনের পক্ষ অবলম্বন করেছেন। কোনও দল বিরোধী দল হতে চায় না, চায় ক্ষমতায় যেতে। জাতীয় পার্টিও তাই।’
বিএনপির সঙ্গে কোনও যোগাযোগ হয়েছে কিনা, এমন প্রশ্নে এই নেতার ভাষ্য, ‘এখনও এমন কিছু ঘটেনি। বিএনপি তো কিছু বলেনি। আমরা নিজেরা কিছু বলবো না।’
২০২৪-এ নির্বাচনে যেতে জাতীয় পার্টিকে যেতে বাধ্য করা হয়েছে। আর এই অংশগ্রহণ কোনও আইনত অপরাধও নয় বলে উল্লেখ করেন এই শীর্ষ পর্যায়ের নেতা। তিনি বলেন, ‘আরও অপেক্ষা করবো। তারপর দলের উচ্চ পর্যায়ের অবস্থান ব্যক্ত করবো।’
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় পার্টির মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘নির্বাচনের তফসিল তিন মাস আগে হওয়ার কথা। তিন মাস আগে কোনও পার্টির অফিসের মধ্যে এমন বিশৃঙ্খলা করলে অবশ্যই ভোটের পরিবেশকে ব্যাহত করে। ভোট না করাই পাঁয়তারা।’
তিনি আরও বলেন, ‘যারা এই বিশৃঙ্খলা করছে তাদের অ্যান্টি ভোট ফোর্স হিসেবেই আমরা মনে করি। সে ক্ষেত্রে সরকারের দেশের ওপর নিয়ন্ত্রণ নিতে হবে। বিশৃঙ্খলাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। ভোটের আগে যদি বিশৃঙ্খলাবাহিনী মাঠে থাকে, তাহলে তো সুষ্ঠু ভোট হবে না, ভোটের ব্যাপারে মানুষের আগ্রহ থাকবে না।’








