বিএনপি মনে করে, দেশের একটি আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং এর সাবেক ও বর্তমান শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার সম্পূর্ণ দায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের। পাশাপাশি মার্কিন এই নিষেধাজ্ঞার কারণে জাতিসংঘ, বিশ্বব্যাংক, আইএমএফসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হবে বলে মন্তব্য দলটির। বুধবার (১৫ ডিসেম্বর) সকালে ঢাকার গুলশানে বিএনপি চেয়াপারসনের কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে স্থায়ী কমিটির পক্ষ থেকে নিজেদের এই অবস্থান তুলে ধরেন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ইস্যুতে বাংলাদেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থা র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) কয়েকজন জ্যেষ্ঠ সদস্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ বিষয়ে বিএনপির বক্তব্য’ শিরোনামে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন বিএনপি মহাসচিব। তার কথায়, ‘ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করার লক্ষ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বেআইনিভাবে ব্যবহারের সকল দায়িত্ব সরকারকেই নিতে হবে। বাংলাদেশে নির্বাচনহীন দিনের ভোট রাতে লুটের সংস্কৃতি অব্যাহত রাখতে র্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অত্যন্ত নগ্নভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। র্যাবের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ কার্যত রাজনৈতিক সরকারের দায়। তাই র্যাবের বিরুদ্ধে যে নিষেধাজ্ঞা তা এক অর্থে বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধেই নিষেধাজ্ঞার শামিল। কারণ গণতন্ত্রহীন আওয়ামী লীগ সরকার নিজেদের টিকিয়ে রাখতে র্যাবকে বিভিন্ন আইনবিরোধী সংস্কৃতির অংশ হতে বাধ্য করেছে।’
লিখিত বক্তব্যে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘যারা ইতোমধ্যে সরকারের এ ধরনের অবৈধ ক্ষমতাকে টিকিয়ে রাখতে নিজেদের অংশীদার পরিণত করে বিভিন্ন ধরনের বিচারবহির্ভূত সংস্কৃতি চালু করতে ভূমিকা রেখেছে, তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করে বিচারের আওতায় আনতে হবে এবং সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে পুলিশ বা অন্য যেকোনও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ বাহিনী, সামরিক ও বেসামরিক বাহিনীর কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় নিয়ে আসতে হবে।’
বিএনপি মহাসচিবের দৃষ্টিতে, ‘র্যাব, এর সাবেক ও বর্তমান শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আমাদের প্রধানতম বন্ধুপ্রতীম অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং রাজনৈতিক কৌশলগত অংশীদার যুক্তরাষ্ট্রের তরফে এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা অত্যন্ত বিব্রতকর ও উদ্বেগজনক। তবে এটি ছিল নিঃসন্দেহে অবশ্যম্ভাবী। কারণ একদশক ধরে বিএনপিসহ গণতন্ত্র চর্চায় বিশ্বাসী বাংলাদেশের প্রায় সকল রাজনৈতিক দলকে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম, খুন ও ভয়াবহ নির্যাতন করার বিষয় দেশের ভেতরে ও বহির্বিশ্বের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে ব্যাপকভাবে আলোচিত। মূলত সরকারের বিচারবহির্ভূত হত্যাকে অস্বীকার করার ফলই হচ্ছে মার্কিন কর্তৃপক্ষ থেকে আসা নিষেধাজ্ঞা।’
বাংলাদেশের মতো পোশাকসহ অন্যান্য পণ্য, শ্রমশক্তি, নিরাপত্তা সেবা রফতানিনির্ভর দেশের জন্য মার্কিন সরকার কর্তৃক দেশের অন্যতম প্রধান আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের মধ্যে সুদূরপ্রসারী প্রভাব রয়েছে বলে দাবি মির্জা ফখরুলের। তিনি বলেছেন, ‘এর ফলে বহির্বিশ্বে আমাদের দেশ ও নাগরিক সম্পর্কে ভুল বার্তা যাবে, যা বিদেশি বিনিয়োগসহ বিভিন্ন রকম আর্থনৈতিক ও দৈনন্দিন সহযোগিতা কার্যক্রমকে ব্যাহত করবে।’
বিএনপি মহাসচিবের অভিযোগ, “মানবাধিকার ও মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনকারী বর্তমান অবৈধ সরকারের মন্ত্রীরা র্যাবের বিরুদ্ধে অভিযোগকে ‘কাল্পনিক’ বলে উড়িয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা চালাচ্ছেন। এমনকি এক্ষেত্রে তারা সম্পূর্ণ অযাচিতভাবে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ মানবাধিকার পরিস্থিতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে মূল সমস্যাকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার গতানুগতিক অপচেষ্টা চালাচ্ছে। প্রতিবছর আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবসেই যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশ ও সংস্থার পক্ষ থেকে বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম, নির্যাতন সম্পর্কে রিপোর্ট প্রকাশিত হয় এবং বাংলাদেশের পক্ষ থেকে যথারীতি তা প্রত্যাখান করে এ ধরনের অপরাধকে অধিক হারে উৎসাহিত করা হয়।’
গত ১২ ডিসেম্বর দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটিতে সিদ্ধান্ত হয়েছে, আগামী ২২ ডিসেম্বর থেকে ৩০ ডিসেম্বর সারা দেশের সকল জেলায় বিক্ষোভ সমাবেশ করবে বিএনপি। সংবাদ সম্মেলনে এই তথ্যও জানানো হয়। এ সময় আরও ছিলেন দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, নজরুল ইসলাম খান, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুসহ দলের কয়েকজন নেতা ছিলেন।









