মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা নিরূপণ নিয়ে বিএনপি নেতাদের প্রশ্নে উৎফুল্লিত দলটির জোটবন্ধু জামায়াতে ইসলামী। এ নিয়ে দৃশ্যত কোনও মন্তব্য না করলেও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে বিএনপির চলমান অবস্থান নিয়ে স্বাধীনতাবিরোধী এই দলটিতে সন্তুষ্টি বিরাজ করছে। তবে, হঠাৎ করেই শহীদ-সংখ্যা নিয়ে নতুন বিতর্কে কোনও-কোনও জামায়াত নেতার মধ্যে বিরক্তিও দেখা গেছে। তারা বলছেন, মুক্তিযুদ্ধে যারা শহীদ হয়েছেন, তাদের উত্তরাধিকাররা যেন রাষ্ট্রীয় ভাতা পান, মূল্যায়িত হন। পাশাপাশি মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দণ্ডিত ও দণ্ডাদেশপ্রাপ্ত নেতাদের সন্তানরা বলছেন, এসব বিতর্ক তারা ছোটবেলা থেকেই শুনে আসছেন।
এ নিয়ে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের দুই সদস্য বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে কথা বলেন। তবে, দলীয়ভাবে প্রচার বিভাগের বাইরে গণমাধ্যমে মুখ খোলার নিষেধাজ্ঞা থাকায় নিজেদের পরিচয় উদ্ধৃত করতে রাজি হননি তারা। দুজনেই কাছাকাছি ধরনের মন্তব্য করেন। দুভাবে মূল্যায়নের বিষয়ে তারা বলছেন, প্রথমত, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে সংখ্যাতাত্ত্বিক বিতর্ক ওঠায় নতুন প্রজন্ম বিষয়টিকে নতুনভাবে বিচার করতে শিখবে। সরকারের পক্ষে যুৎসই কোনও জবাব না পেলে এ প্রজন্মের অনেকেই প্রশ্নটিকে ধারণ করে একমুখী ইতিহাস চর্চা থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হবে। এটি অদূর ভবিষ্যতে কাজে দেবে।
দ্বিতীয়টি হচ্ছে, আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে জামায়াত নেতাদের একের পর এক বিচার হলেও বিএনপি নেতারা এ নিয়ে কথা বলেননি। এখন নিজেরাই এ বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছেন। ফলে, অনেকটাই ইঁদুর-বিড়াল খেলা দেখার মতো ঘটনা মনে হচ্ছে জামায়াতের কাছে। এ নিয়ে ঘরোয়া পরিবেশে জামায়াতের নেতাকর্মীরা আনন্দ উপভোগ করছেন বলেই দাবি ঢাকা মহানগর জামায়াতের প্রভাবশালী এক নেতার সহচরের।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের সদস্য ও তামিরুল মিল্লাতের প্রিন্সিপাল মাওলানা যাইনুল আবেদিন মোবাইলে বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে কথা বলেন। প্রথমে তিনি এ নিয়ে মন্তব্য করতে অসম্মতি জানান। বলেন, ‘কেন এত কল করো? আমার কোনও দল নেই। অন্যদের সঙ্গে কথা বলো।’ এরপর তার দলীয় পরিচয় মনে করিয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘ফাও আলাপ। যা গেছে, তা গেছে। এখন তো ফিরে আসবে না। খালি-খালি বিতর্ক করে লাভ কী? ফাও আলাপ করে লাভ আছে? সংখ্যা নিয়ে আলাপ করলে সংখ্যা বাড়বে? না কমবে?’
তবে, শহীদদের মর্যাদা দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সিলেট দক্ষিণ জেলা আমির ও কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার সদস্য মাওলানা হাবিবুর রহমান। অনেকটা সিলেটের আঞ্চলিক ভাষায় তিনি বলেন, কত শহীদ হয়েছেন, এই বিতর্কে না জড়িয়ে শহীদদের মর্যাদা দেওয়া উচিত। তাদের সন্তানদের, উত্তরাধিকারদের মূল্যায়ন করা উচিত। তাদের ভাতা নিশ্চিত করা উচিত। মুক্তিযুদ্ধে যারা শহীদ হয়েছেন, তাদের জন্য কিছু করাই হচ্ছে কাজ। সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক তুলে তো লাভ নেই।’
এদিকে, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বিএনপি নেতাদের চলমান মন্তব্যে আগ্রহ নেই মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দণ্ডিত-দণ্ডাদেশপ্রাপ্ত জামায়াত নেতাদের সন্তানদের। তারা বলছেন, এসব বিতর্ক শুনে-শুনে তারা ছোটবেলা থেকে অভ্যস্ত। ফলে, নতুন করে এ নিয়ে কোনও অবস্থান নেই তাদের।
জানতে চাইলে জামায়াতের সাবেক সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের ছেলে আলী আহমদ মাবরুর বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এটা আমাদের দেশের সাধারণ রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। কিছুদিন বিতর্ক চলবে, সবাই এতে অংশ নেবেন। কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে আমার মনে হয়, এসব বিতর্ক ছোটবেলা শুনে-শুনে অভ্যস্ত। এ কারণে আর এসবে আগ্রহ নেই। আর আমি যেহেতু দল করি না, সেহেতু কোনও অবস্থানই নেই আমার।’
তবে, নাম প্রকাশ না করার শর্তে জামায়াতের আরেক দণ্ডিত নেতার সন্তান বলেন, ‘এটা এখন হয়তো বিতর্ক। কিন্তু ইতিহাস তো আছে। একদিন ঠিকই সত্যটা প্রকাশিত হবে। সেদিনের অপেক্ষা আমাদের প্রজন্মান্তরেও চলবে।
/এসটিএস/এমএনএইচ/








