বিএনপির সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা বলেছেন, সীতাকুণ্ডের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা দুর্ঘটনা নয়, একটি হত্যাকাণ্ড। এতগুলো জীবন ঝরে গেছে কন্টেইনার ডিপোর মালিকের চরম উদাসীনতায়।
সোমবার (৬ জুন) জাতীয় সংসদে অনির্ধারিত আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এ দাবি করেন। রুমিন ওই ঘটনায় ডিপো মালিকের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি করেন।
রুমিন বলেন, ‘সীতাকুণ্ডের ঘটনা কোনও দুর্ঘটনা নয়, এটি হত্যাকাণ্ড। চট্টগ্রামের বিস্ফোরক পরিদফতর বলেছে—ওই ডিপোতে দাহ্য পদার্থ রাখার বিষয়টি তাদের জানানো হয়নি। এ ধরনের পণ্য সংরক্ষণে বিশেষ ধরনের অবকাঠামো দরকার। কিন্তু ওই ডিপোতে সেই ধরনের কোনও ব্যবস্থা ছিল না।’
তিনি বলেন, ‘ফায়ার সার্ভিসও বলেছে ডিপোর মালিকপক্ষের কেউ সেখানে কেমিক্যাল রাখার বিষয়টি জানায়নি। সেটা তাদের জানা থাকলে অগ্নিনির্বাপণের জন্য ভিন্ন ব্যবস্থা হতো। তাতে বিস্ফোরণ হওয়ার আশঙ্কা কমে যেতো। ফায়ার কর্মীদের মৃত্যুর ঘটনা হয়তো এত হতো না। এই জীবনগুলো ঝরে গেছে কন্টেইনার ডিপোর মালিকের চরম উদাসীনতায়।’
বিএনপির এই এমপি বলেন, ‘সীতাকুণ্ডের বিএম কন্টেইনার ডিপোর ম্যানেজিং ডিরেক্টর চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ মুজিবুর রহমান দলের এমন একটি পদে থেকে কেন নিয়ম-কানুন মানার প্রয়োজনীয়তা বোধ করেননি।
রুমিন ফারহানা বলেন, ‘তিনি (মালিক) অনুমোদন ছাড়া ডিপো তৈরি করেছেন, সেই ডিপোতে অনুমোদন না নিয়ে কেমিক্যাল রেখেছেন। এমনকি যখন সেখানে আগুন লেগেছে, তখন অগ্নিনির্বাপণের জন্য যারা গেছেন, তাদের কেমিক্যালের বিষয়ে কোনও রকম অবহিত তিনি করেননি। এই খুঁটির জোর তিনি কোথা থেকে পেলেন? এই খুঁটির জোর তিনি পেলেন এই কারণেই যে এই কোম্পানির ম্যানেজিং ডিরেক্টর মুজিবুর রহমান চট্টগ্রাম দক্ষিণ আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ। ক্ষমতাসীন দলের এমন একটি পদে থেকে কোনও নিয়ম-কানুন মানার প্রয়োজনীয়তা সম্ভবত তিনি বোধ করেননি।’
তিনি বলেন, ‘আশুলিয়ার তাজরিন ফ্যাশনে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ২০১২ সালে মারা যায় ১১১ জন পোশাক কর্মী। সেই ঘটনার মূল আসামি তাজরিনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) দেলোয়ার হোসেন। ওই মামলার ১০ বছর হয়ে গেলো, এ পর্যন্ত কোনও সুরাহা হয়নি। বরং এই দেলোয়ার হোসেনকে সম্প্রতি ঢাকা মহানর উত্তর আওয়ামী মৎস্যজীবী লীগের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়েছে। দুদিন পার হয়ে গেছে, কিন্তু এখনও বিএম কন্টেইনার ডিপোর মালিকের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। অথচ আইন ভঙ্গ করে তিনি ডিপোতে হাইড্রোজেন পার-অক্সাইডের মতো দাহ্য পদার্থ বিশেষ কোনও অবকাঠামো ছাড়াই স্টোর করেছিলেন। ফায়ার সার্ভিসের কাউকে জানানো হয়নি এখানে দার্জ্য পদার্থ আছে। তাহলে অগ্নিনির্বাপণের জন্য ভিন্ন ব্যবস্থা নেওয়া হতো। এত প্রাণ আমাদের হারাতে হতো না। আমি আপনার মাধ্যমে অনুরোধ জানাবো, যাতে অবিলম্বে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়।’
রাজধানীর নিমতলী অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে রুমিন ফারহানা বলেন, ‘২০১০ সালে এই দিনে ঘটা অগ্নিকাণ্ডে মারা যায় ১২৪ জন। শুনতে খুব অবাক লাগলেও সত্য যে এই বীভৎসতম দুর্ঘটনায় যেখানে ১২৪ জন মারা গেছে, সে ঘটনায় কোনও মামলা দায়ের হয়নি। একটি জিডি হয়েছিল, যার তদন্ত এখনও চলমান।’
তিনি বলেন, ‘নিমতলীর ঘটনায় কোনও পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি, কোনও মামলা হয়নি। যার ফলশ্রুতিতে চুরিহাট্টায় ঘটে একই ঘটনা। এ দুটি ঘটনার কারণ একটাই, কেমিক্যাল গুদাম। ওই ঘটনার পর সরকার বলেছিল, কেমিক্যাল গুদাম সরিয়ে দেওয়া হবে। কিন্তু এখনও পুরনো ঢাকা থেকে সেই গুদাম সরানো হয়নি। সেখানে ১৫ হাজার কেমিক্যাল গুদাম ও দোকানের নামে বারুদ রয়েছে। মানুষ বসবাস করছে এর মধ্যে।’
জাতীয় পার্টির সৈয়দ আবু বলেন, ‘সীতাকুণ্ডের নিষ্ঠুর ও ভয়াবহ ঘটনাটিকে কি আমরা দুর্ঘটনা হিসেবে সান্ত্বনা নেবো? নাকি এর পেছনে কোনও নাশকতা রয়েছে। নিশ্চয়ই সরকার তদন্ত করে তা বের করবে বলে আশা রাখি। যদিও এসব ঘটনা তদন্তের আলোর মুখ আমরা দেখি না।’
তিনি বলেন, ‘এই দুর্ঘটনার পর অনেক প্রশ্ন সামনে আসছে। টেলিভিশন টকশোতে সরকার পক্ষের সব বক্তব্য দেখি পজিটিভ, আর বিরোধী পক্ষের বক্তব্য পাই নেগেটিভ। জানতে চাই, একটি জনবহুল এলাকায় কীভাবে ডিপোর মধ্যে রাসায়নিক দ্রব্য থাকে। আমরা ৬ লাখ কোটি টাকার বাজেট দেই, কিন্তু কেন ফায়ার সার্ভিসের জন্য আধুনিক যন্ত্রপাতি আনতে পারি না। জনগণের ট্যাক্সের টাকায় আমরা পদ্মা সেতুর মতো বড় প্রকল্প সম্পন্ন করি, তখন বিশ্বদরবারে আমাদের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়। বিশ্বগণমাধ্যমে আমাদের প্রশংসা করে খবর হয়। কিন্তু এর বিপরীতে এই আগুনে নির্মমভাবে মৃত্যুবরণ করতে হয়, সেই লজ্জা আমরা রাখি কোথায়? ফায়ার কর্মীদের হাতে আধুনিক যন্ত্রপাতি দিতে পারলে, সীতাকুণ্ডের ট্র্যাজেডির গল্পটা পজিটিভভাবে বিশ্বের কাছে আসতো। কিন্তু সেটা হলো না।’









