দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে আন্দোলন জোরদার করছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। তবে এই আন্দোলনে কার্যত কোনও আলোচনায় নেই দলটির অন্যতম অঙ্গসংগঠন ও ভ্যানগার্ড খ্যাত জাতীয়বাদী ছাত্রদল। বরং অন্তঃকোন্দল, স্বজনপ্রীতি; জেলা, মহানগর ও থানা পর্যায়ে কমিটি দিতে না পারা; অশিক্ষিত-অছাত্রদের পদ দেওয়া এবং কেন্দ্রীয় নেতাদের কর্মকাণ্ড নিয়ে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে সংগঠনটির তৃণমূল নেতাকর্মীদের মনে। এ কারণে কেন্দ্রীয় যেকোনও কর্মসূচিতে ছাত্রদলের উপস্থিতি কম।
ছাত্রদলের বিভিন্ন থানা পর্যায়ের একাধিক নেতাকর্মীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেতাদের স্বজনপ্রীতি, জেলা, মহানগর ও থানায় পূর্ণাঙ্গ কমিটি করতে ব্যর্থতাসহ যোগ্যরা মূল্যায়িত না হওয়ায় আগ্রহ হারাচ্ছেন কর্মীরা। তারা বলছেন, ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটিতে মহানগর ও থানা কমিটি দেওয়ার ক্ষেত্রে ছাত্রদলের মূল নীতি শিক্ষা ও প্রগতির বদলে কথিত পেশিশক্তি রয়েছে, এমন সদস্যদের কমিটিতে দায়িত্বশীল পদ দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে বিবাহিত, সন্তানের বাবা ও অছাত্রও রয়েছে বলে অভিযোগ করেন তারা।
ছাত্ররাজনীতির ইতিহাস
ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধসহ নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের মতো ইতিহাসের সব বড় ঘটনার সূচনা ও সফলতা ছাত্ররাই রচিত করেছে উল্লেখ করে বঞ্চিত নেতাকর্মীরা বলেন, কথিত কোনও পেশিশক্তি বা পাড়ার মাস্তান দিয়ে আন্দোলন সফল হওয়ার ইতিহাস নেই বাংলাদেশে। ছাত্রদের কলম যেমন প্রতিবাদের ভাষা রচিত করে, দেশ ও জাতির প্রয়োজনে সেই হাতে অস্ত্রও তুলে নিতে পারে; যার বড় প্রমাণ একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ। তাই ছাত্রদলের নেতৃত্বে শিক্ষাকে প্রাধান্য দেওয়ার জোর দাবি রয়েছে তৃণমূলে। অন্যথায় মূলনীতি থেকে শিক্ষাকে বাদ দেওয়ার কথা বলেন তারা।
এসব অভিযোগের খোঁজ নিলে জানা যায়, ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদের ১ নম্বর সহসভাপতি তানজিন হাসান, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. মামুন হোসেন, মো. নুরনবী পলাশ, লিটন আর এ খান বিবাহিত বলে দলের ভেতরে অভিযোগ আছে। এ ছাড়া স্বজনপ্রীতিরও বিস্তর অভিযোগ রয়েছে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংসদের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে।
তাদের মধ্যে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংসদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মেহেদি হাসান, সহসাংগঠনিক সম্পাদক জাকারিয়া হোসেন ইমন, সহ-যোগাযোগ সম্পাদক জহিরুল ইসলাম রুবেলসহ অনেকেই বরিশাল ও পিরোজপুরের বাসিন্দা হওয়ায় সাধারণ সম্পাদক জুয়েলের মাধ্যমে পদ পেয়েছেন বলে জানান তৃণমূল কর্মীরা।
জানা যায়, রাজনীতিতে প্রবেশের মাত্র এক বছরের মাথায় ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংসদের সহসাংগঠনিক সম্পাদক হওয়া সৈয়দ ফয়সাল হোসেন ছাত্রদল সভাপতি শ্রাবণের বেয়াই। এ ছাড়া ব্যবসায়ী ও অন্য অঙ্গসংগঠন থেকেও অনেকেই ছাত্রদলে প্রবেশ করেছেন বলেও অভিযোগ ছাত্রদলের বঞ্চিত নেতাকর্মীদের।
অযোগ্যদের লম্বা তালিকা
২০১৯ সাল থেকে রাজনীতি শুরু করা ঢাকা মহানগর পূর্বের যুগ্ম আহ্বায়ক রাজীব পাটোয়ারীর বিরুদ্ধে বিবাহিত ও আর্থিক সুবিধা দিয়ে পদ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। একই আহ্বায়ক কমিটির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মো. হূমায়ন কবির স্বেচ্ছাসেবক দল থেকে ছাত্রদলে ঠাঁই পেয়েছেন। অভিযোগ আছে, পেশিশক্তির বলেই তিনি এই পদে জায়গা পান। এ রকম অভিযোগ রয়েছে আরও অনেকের বিরুদ্ধে।
একটি সূত্র জানায়, ইতোমধ্যে ছাত্রদলের অভিযুক্ত নেতাদের বিষয়ে লম্বা তালিকা তৈরি করা হয়েছে। তবে এসব নিয়ে হতাশ দীর্ঘ সময়ে মাঠে থাকা ছাত্রদলের ত্যাগী নেতাকর্মীরা। তবে এ বিষয়ে তৃণমূল ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের বক্তব্য, কেন্দ্রীয় সংসদের এসব আচরণে নতুন করে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ার মনোবল পাচ্ছেন না তৃণমূলের ত্যাগী কর্মীরা।
কমিটি আটকে আছে কেন্দ্রীয় নেতাদের হাতে
সম্প্রতি ঘটে যাওয়া কয়েকটি ঘটনায় সংগঠনটিতে অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ আরও স্পষ্ট হয়েছে। এর মধ্যে গত ২৭ মে রাতে নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দীর্ঘদিনেও ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রদলের থানা ও কলেজ শাখার কমিটি না হওয়ায় কর্মীদের তোপের মুখে পড়েন ছাত্রদল কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি কাজী রওনকুল ইসলাম শ্রাবণ ও সাধারণ সম্পাদক সাইফ মাহমুদ জুয়েল এবং বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক রকিবুল ইসলাম বকুল।
ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রদলের সভাপতি মেহেদী হাসান রুয়েলের নেতৃত্বে শতাধিক নেতাকর্মী তাদের অবরুদ্ধ করে রাখেন। এ সময় অবিলম্বে থানা ও কলেজ ইউনিট কমিটি গঠনের দাবিতে বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন নেতাকর্মীরা। একপর্যায়ে বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা বকুলের পথ অবরুদ্ধ করে রাস্তায় শুয়ে পড়েন। এরপর আগামী রবিবারের মধ্যে কমিটি গঠনের আশ্বাস দিলে মহানগর উত্তর ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা কার্যালয় ছেড়ে যান।
ছয় মাস ধরে মহানগর উত্তরের অধীনে থানা কমিটি করার কথা বলে দফায় দফায় মিটিং করেন ছাত্রদলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক। কিন্তু তাদের দ্বন্দ্বের জেরে তা এগোচ্ছে না বলে জানা যায়। এ ছাড়া বিএনপির জাতীয় পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে অশোভন আচরণের অভিযোগও রয়েছে ছাত্রদলের সভাপতি ও সম্পাদকের বিরুদ্ধে।
সাধারণ সম্পাদকের আচরণে বিব্রত সংগঠন
গত ১০ ডিসেম্বর ঢাকা বিভাগীয় গণসমাবেশে বিএনপির নির্দেশনা অনুযায়ী, দলটির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন থেকে একজন করে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ পান। এ ক্ষেত্রে ছাত্রদল সভাপতির নাম ঘোষণা করা হয়। তখন বক্তব্য দিতে না পেরে ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক সাইফ মাহমুদ জুয়েল গণসমাবেশের সঞ্চালনার দায়িত্বে থাকা ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সদস্য সচিব আমিনুল হক ও দক্ষিণের সদস্য সচিব রফিকুল আলম মজনুর সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে যান। এ সময় মঞ্চে থাকা বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতারা এমন আচরণে বিব্রত বোধ করেন।
পরে ১৩ ডিসেম্বর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে এক প্রতিবাদ কর্মসূচিতে কৃষক দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি কৃষিবিদ হাসান জাফির তুহিনের সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে পড়েন ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক।
এ ছাড়া ছাত্রদলের সভাপতি শ্রাবণের বিরুদ্ধেও রয়েছে বিস্তর অভিযোগ। নিজের অনুগত না হলে সাধারণ কর্মীদের এড়িয়ে চলাসহ জ্যেষ্ঠ নেতাকর্মীদের অনুপস্থিতিতে তাদের নিয়ে বিভিন্ন বাজে মন্তব্য করা এবং প্রকাশ্যে ছাত্রদলের কর্মীদের অস্রাব্য ভাষায় গালাগালি করার অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে।
ঢাকা মহানগর উত্তর ও পশ্চিম ছাত্রদলের কমিটি পূর্ণাঙ্গ না করা এবং অধীনে থানা ও কলেজ কমিটি করতে বাধা দেওয়ার জের ধরে কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের ওপর বিরক্ত পদপ্রত্যাশী ও বঞ্চিত নেতাকর্মী ও সমর্থকরা।
স্বজনপ্রীতির কারণে তৃণমূলেও ক্ষোভ
মহানগরে শ্রাবণ-জুয়েলের স্বেচ্ছাচারিতা, অর্থনৈতিক লেনদেন, স্বজনপ্রীতি, বিবাহিত ও অশিক্ষিত-অছাত্রদের প্রাধান্য দেওয়ার এসব কর্মকাণ্ডে তৃণমূলেও ক্ষোভ বিরাজ করছে। এ ছাড়া বিএনপির ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক বকুলের অঞ্চলপ্রীতি ও নীরব ভূমিকায় তৃণমূলে দীর্ঘদিন ধরে হতাশা বিরাজ করছে।
এত সব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক সাইফ মাহমুদ জুয়েল বলেন, ‘আমরা দীর্ঘদিন ধরে বিরোধী দল হিসেবে আছি। নানা অন্যায়-নিপীড়নের শিকার হওয়ার পরও ছাত্রদলের কর্মীরা মাঠ ছাড়েনি। দলের যেকোনও কর্মসূচিতে ছাত্রদল সবার আগে থাকে। এখানে আন্দোলনে ছাত্রদল ভূমিকা রাখছে না, এগুলো গৎবাঁধা অভিযোগ। এসব কথার কোনও ভিত্তি নেই। বরং ছাত্রদল শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে বিশ্বাসী। দলের যেকোনও প্রয়োজনে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা পিছপা হয়নি, সামনে হবেও না।’
মহানগর থানা কমিটি যেগুলো বাকি আছে, তা গঠন হচ্ছে না কেন, জানতে চাইলে কাজ চূড়ান্ত পর্যায়ে আছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রামের মাধ্যমে আমাদের প্রত্যেক কর্মীই এখন দক্ষ। এখন একজন পদ পেলে স্বাভাবিকভাবে আরেকজন মন খারাপ করবে। কিন্তু কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে আমরা অবশ্যই উদ্যমী, নেতৃত্বগুণসম্পন্ন প্রার্থীই বাছাই করি।’
বিবাহিত, অছাত্র ও পেশিশক্তিকে ছাত্রদলে জায়গা দেওয়া হয়েছে, এমন অভিযোগের বিষয়ে জুয়েল বলেন, ‘নানাজন পেছন থেকে নানা কথা বলে। কিন্তু বাস্তবতা হলো আমরা যে কারও সমস্যা ও অভিযোগের কথা বলার সুযোগ দিই। এমনকি আমরা কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অভিযোগ বক্স বসিয়েছি, যাতে পরিচয় গোপন করে হলেও দলে কোনও অসংগতি দেখলে যেন আমাদের জানানো হয়।’
বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সঙ্গে ছাত্রদলের সম্পর্ক ভালো জানিয়ে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘যে কয়েকটি ঘটনার কথা সবাই বলে, সেটা আসলে কিছুই না। একই পরিবারেও ভাইয়ে ভাইয়ে কিছুটা অভিমান হয়েই থাকে। এতে সম্পর্কের কোনও টান পড়েনি।
অভিযোগ বিষয়ে জানতে কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সভাপতি কাজী রওনকুল ইসলাম শ্রাবণকে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি। এসএমএস দেওয়া হলেও কোনও উত্তর দেননি।
যা বলছেন সাবেক ছাত্রনেতারা
বিএনপির সাবেক ছাত্রদল সভাপতি ও ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বলেন, সাংগঠনিক বিতর্ক বা অসন্তোষ সংগঠন পরিচালনার ক্ষেত্রে কম-বেশি ছিল সব সময়। এখন হয়তো একটু বেশি হতে পারে। ছাত্রদল বাংলাদেশের অন্যতম বৃহত্তর একটি ছাত্র সংগঠন। তাই এখানে রাজনীতি ছাড়াও সাংগঠনিক অনেক ব্যাপারে বিতর্ক থাকতে পারে। যারা প্রত্যাশা করে সংগঠনের নেতৃত্ব দেওয়ার এবং তারা যখন সুযোগ পায় না, স্বাভাবিকভাবেই তাদের মাঝে একধরনের কষ্ট ও অসন্তোষ কাজ করবে। এখন এটা যদি যথাযথ প্রক্রিয়ায় সমাধান করা যায়, তাহলে ছাত্রদল আরও অপ্রতিরোধ্য হবে, আরও সুসংগঠিত হবে, আরও ভালো করবে। আমি মনে করি না যে সংগঠনে একেবারে কোনও ধরনের সমস্যা নেই। কিছু সমস্যা হয়তো আছে। এগুলো যদি ঠিক করা যায়, সামনের দিনগুলোয় ছাত্রদল আরও ভালো করবে।
বাংলাদেশে এখন কর্তৃত্ববাদী ও স্বৈরশাসন বিদ্যমান। তাই ছাত্র ও যুবরা স্বাভাবিক রাজনীতির চর্চা করতে পারছে না মন্তব্য করে বিএনপির এই কেন্দ্রীয় নেতা বলেন, সাবেক ছাত্রদলের সভাপতি হিসেবে আমারও অনেক প্রত্যাশা ছাত্রদলের কাছে। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি, চলামান ঘটনাবলি, সরকারে নির্মম-নির্দয় ভূমিকা সবকিছু মিলেই প্রত্যাশাকে ধারণ করতে হবে। আশা করতে হয়। আর এভাবে চলতে পারে না। এ জন্য ছাত্র ও যুবসমাজকে এগিয়ে আসতে হবে। অর্থাৎ লড়াই-সংগ্রাম বর্তমান অবস্থায় পরিপ্রেক্ষিতে নিতে হবে। আমি আশাবাদী সেটা তারা নিতে পারবে।









