‘বাংলাদেশ এখন ধ্বংসস্তূপের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে’ এবং বিগত সরকারের রেখে যাওয়া ঋণের কারণে সামনের দিনে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন দেওয়াও কঠিন হয়ে যেতে পারে—সম্প্রতি এমন মন্তব্য করেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু।
সরকারের মেয়াদের মাত্র ছয় মাসের মাথায় একজন দায়িত্বশীল মন্ত্রীর এমন বক্তব্য নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গন ও বিশ্লেষক মহলে নানা আলোচনা তৈরি হয়েছে। কেউ মনে করছেন, এ বক্তব্য দেশের আর্থিক সংকটের একটি বাস্তব চিত্র তুলে ধরছে। আবার কেউ বলছেন, আগের সরকারের দায় সামনে এনে বর্তমান সরকারের ব্যর্থতা আড়াল করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের কারণে দেশের বিভিন্ন স্থানে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তাতেও উদ্বেগ বাড়ছে। বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করেন, নির্বাচনের আগে বর্তমান সরকার এসব সমস্যা সম্পর্কে অবগত ছিল এবং সমাধানের প্রতিশ্রুতি দিয়েই জনগণের কাছে ভোট চেয়েছে। ফলে এখন সংকটের কথা জানানোর পাশাপাশি দ্রুত সমাধানের পথ বের করাই সরকারের দায়িত্ব।
তাদের মতে, রাষ্ট্রীয় ব্যয় ও বিলাসিতা কমানোর পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ প্রাকৃতিক সম্পদের পরিকল্পিত ব্যবহার, বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে সংকট মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
কী বলেছিলেন টুকু?
গত ১৪ আগস্ট নিজ জেলা সিরাজগঞ্জে পৌরসভার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ এখন ধ্বংসস্তূপের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকার এত ঋণ করে গেছে যে, ঠিকমতো পরিকল্পনা না করলে একদিন সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন দেওয়াও কঠিন হয়ে যেতে পারে।
মন্ত্রী বলেন, সরকার এমন একটি বাজেট প্রণয়ন করেছে, যাতে সাধারণ মানুষের ওপর অতিরিক্ত করের বোঝা না পড়ে। তবে বাজেট সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়নের জন্য জনগণ ও প্রশাসনকে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
দায় চাপিয়ে ব্যর্থতা আড়ালের চেষ্টা?
একজন দায়িত্বশীল মন্ত্রীর মুখে দেশের আর্থিক পরিস্থিতি নিয়ে এমন বক্তব্যের পর বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা শুরু হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কেউ মনে করেন, অতীত সরকারের ব্যর্থতার ফিরিস্তি তুলে ধরে বর্তমান সরকার নিজেদের দুর্বলতা আড়াল করার চেষ্টা করতে পারে। আবার সংকটের বাস্তবতা যদি গুরুতর হয়, তাহলে সরকারকে সতর্ক ও সংযত পদক্ষেপ নিতে হবে বলেও মনে করেন তারা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও লেখক মহিউদ্দিন আহমদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, সরকারের ছয় মাসের মাথায় সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন নিয়ে অনিশ্চয়তার কথা মন্ত্রীর কেন বলতে হয়েছে, তার কারণ বলা কঠিন। তবে এর নিশ্চয়ই একটি তাৎপর্য রয়েছে।
তিনি বলেন, বিশেষ করে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের এই সময়ে সরকার হয়তো আর্থিক দৈন্যতার বিষয়টি উপলব্ধি করতে পারে। তবে এ ব্যাপারে সরকারকে অবশ্যই সতর্ক পদক্ষেপ নিতে হবে। সামগ্রিক সমস্যা সমাধানে অংশীজন ও বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।
বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশিদ ফিরোজ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, বর্তমান সরকার অনিয়ম ও জনগণের স্বার্থবিরোধী পদক্ষেপ দূর করার চ্যালেঞ্জ নিয়েই রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছে। এসব সমস্যা জেনেই তারা মানুষের কাছে ভোট চেয়েছে। জনগণও সমস্যার সমাধান হবে—এই প্রত্যাশা থেকেই তাদের ভোট দিয়েছে।
তিনি বলেন, এখন ‘এটা পারা যাচ্ছে না, সেটা করা যাচ্ছে না’—এ ধরনের কথা বলার সুযোগ নেই। সরকার প্রথমে ছয় মাস সময় চেয়েছে, এখন আবার প্রধানমন্ত্রী দুই বছর সময় চাইছেন। এর মধ্যে জ্বালানি মন্ত্রী সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন নিয়েও অনিশ্চয়তার কথা বলছেন। এসব না বলে সরকারের উচিত সমস্যার সমাধানের পথ বের করা।
বজলুর রশিদ ফিরোজ আরও বলেন, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট সমাধানে সরকার কার্যকর উদ্যোগ নিতে পারছে না। দেশের অভ্যন্তরীণ গ্যাস সম্পদ অনুসন্ধান ও উত্তোলনেও তেমন উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।
তিনি বলেন, ভোলায় বিপুল গ্যাসের মজুত থাকার কথা বলা হলেও তা জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। আবার গ্যাস আমদানি করা যাবে না বলা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞ ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে পরামর্শ করে এসব সমস্যার সমাধানে উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। সরকার একা এ ধরনের সংকটের সমাধান করতে পারবে না।
বেতন অনিশ্চয়তা ও পে-স্কেল নিয়ে ভিন্ন প্রশ্ন
সরকারের আর্থিক সংকট নিয়ে মন্ত্রীর বক্তব্যের মধ্যেই সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন কাঠামো নিয়ে ইতিবাচক বার্তা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আবদুস সাত্তার।
রবিবার (১৬ আগস্ট) সাংবাদিকদের তিনি জানান, নতুন পে-স্কেল বিবেচনাধীন রয়েছে এবং যেকোনো সময় তা ঘোষণা করা হতে পারে।
একদিকে দায়িত্বশীল মন্ত্রীর পক্ষ থেকে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন নিয়ে অনিশ্চয়তার আশঙ্কা, অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে নতুন পে-স্কেল ঘোষণার কথা—দুই বক্তব্যের মধ্যে সামঞ্জস্য কোথায়, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
রাজনৈতিক মহলের কেউ কেউ মনে করছেন, সরকারের সামগ্রিক আর্থিক পরিস্থিতি নিয়ে একটি পরিষ্কার ব্যাখ্যা দেওয়া প্রয়োজন।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য ড. হামিদুর রহমান আযাদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, সরকার মুখে অনেক বড় কথা বললেও বিদ্যুৎ মন্ত্রীর বক্তব্যেই ভেতরের চিত্র ফুটে উঠেছে বলে তারা মনে করেন।
তিনি বলেন, কোন সরকার ঋণ রেখে যায়নি? সব সরকারই কমবেশি ঋণ রেখে যায়। এর দোহাই দিয়ে দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। মন্ত্রীর বক্তব্যে সরকারের নিজেদের ব্যর্থতাই ফুটে উঠেছে।
তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী বলছেন পে-স্কেল বাস্তবায়ন করবেন, আর মন্ত্রী বলছেন আর্থিক সংকটের কথা। কোন বক্তব্যটি বিশ্বাসযোগ্য, সেটিও প্রশ্নের বিষয়।
ক্ষমতাসীনদের ব্যাখ্যা
সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন নিয়ে মন্ত্রীর বক্তব্যের পর নানা প্রশ্ন ওঠার বিষয়ে ক্ষমতাসীন দলের একাধিক নেতা বলেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকার দেশের অর্থনীতি দুর্বল করে গেছে এবং বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের নামে বড় ধরনের ঋণের বোঝা রেখে গেছে। বর্তমান সরকার উত্তরসূরি হিসেবে সেই পরিস্থিতি পেয়েছে। মন্ত্রী সম্ভবত সে বিষয়টিই বোঝাতে চেয়েছেন।
এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন নিয়ে মন্ত্রী কী বলেছেন, সে ব্যাখ্যা তিনিই ভালো দিতে পারবেন। তবে আওয়ামী লীগ সরকার দেশের আর্থিক অবস্থাকে ভঙ্গুর করে রেখে গেছে—এটি সত্য।
তিনি বলেন, যত সংকটই থাকুক, সরকার নিজস্ব কৌশলে সব সমস্যার সমাধান করবে।

পে-স্কেল নিয়ে ‘সুখবর’ দিলেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব







