ফের আলোচনায় ৭০ অনুচ্ছেদ

আতিক হাসান শুভ
১০ আগস্ট ২০২৬, ২২:২৮ আপডেট : ১০ আগস্ট ২০২৬, ২২:৪৩

দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যজোট। ইতোমধ্যে জোটের অন্যতম শরিক লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদকে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী ঘোষণা করেছে তারা। জোটের নেতারা মনোনয়ন ফরমও সংগ্রহ করেছেন। সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায় সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের কারণে নির্বাচনে জামায়াত জোটের এই প্রার্থীর পরাজয় প্রায় নিশ্চিত।

তাহলে হেরে যাওয়ার সম্ভাবনা জেনেও কেন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থী দিয়েছে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট—এ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনসহ বিভিন্ন মহলে নানা আলোচনা চলছে। কেউ কেউ মনে করেন, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদকে আলোচনা আনতে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছে জামায়াত জোট। কেউবা একে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বিবেচনা করছেন।

জামায়াতসহ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কর্নেল (অব.) অলি আহমদ দলমত নির্বিশেষে সর্বজনীন শ্রদ্ধেয়। তিনি বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে দীর্ঘদিন জড়িত ছিলেন, জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার আস্থাভাজন ছিলেন, তিনবার মন্ত্রীও ছিলেন। বিএনপির সংসদ সদস্যরাও তাকে সম্মান করেন‌। যদি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সংসদ সদস্যরা নিজের ইচ্ছে মতো ভোট দিতে পারতেন—তাহলে এই মুহূর্তেই তার পরাজয় নিশ্চিতভাবে বলা যেতো না।

কী আছে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে

বাংলাদেশের সংবিধান নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয় হচ্ছে ৭০ অনুচ্ছেদ। বাহাত্তরের সংবিধান প্রণয়নের সময় থেকেই এই অনুচ্ছেদ নিয়ে নানা ধরনের তর্ক-বিতর্ক ও সমালোচনা চলে আসছে। সবশেষে জুলাই সনদে এই অনুচ্ছেদর সংস্কার নিয়ে আলোচনা হলেও শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়ন হয়নি।

সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে সুস্পষ্টভাবে বলা আছে, ‘‘কোনও নির্বাচনে কোনও রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরূপে মনোনীত হইয়া কোনও ব্যক্তি সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হইলে তিনি যদি- উক্ত দল হইতে পদত্যাগ করেন, অথবা সংসদে উক্ত দলের বিপক্ষে ভোটদান করেন, তাহা হইলে সংসদে তাহার আসন শূন্য হইবে। তবে তিনি সেই কারণে পরবর্তী কোনও নির্বাচনে সংসদ-সদস্য হইবার অযোগ্য হইবেন না।’’

অর্থাৎ সংসদ সদস্যরা যে রাজনৈতিক দলের মনোনয়নে নির্বাচিত হয়েছেন, সেই দলের প্রস্তাবিত যেকোনও নীতি বা সিদ্ধান্ত অকপটে মেনে নিতে বাধ্য করে এই ৭০ অনুচ্ছেদ। কেউ যদি এর ব্যত্যয় ঘটান বা না মানেন, তাহলে এর পরিণাম খুবই কঠোর। তাদের আসনই শূন্য হয়ে যায়।

সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৭০ ব্যক্তিকেন্দ্রিক ক্ষমতার মেরুদণ্ড

সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৭০ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা ধরনের আলোচনা চলছে। এ নিয়ে অনেকে ক্ষোভও প্রকাশ করেছেন। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম সদস্যসচিব ফরিদুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘বাংলাদেশের ১৯৭২ সালের যে সংবিধান, তার ক্ষমতাকাঠামোর বাকি সবকিছু ঠিক রেখে শুধু ৭০ অনুচ্ছেদ সংস্কার করলেই রাষ্ট্র গণতান্ত্রিক হবে না। রাষ্ট্রের সংস্কারের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক রূপান্তর করে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত তৈরি করা একটা সামগ্রিক কাজ। বিচ্ছিন্ন দুই-একটা কাজ করে কোনোভাবেই রাষ্ট্রকে গণতান্ত্রিক করা যাবে না।’’

তিনি বলেন, ‘‘যেসব জায়গায় সংস্কার করতে হবে, তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ৭০ অনুচ্ছেদ। কারণ, এই অনুচ্ছেদ হচ্ছে ব্যক্তিকেন্দ্রিক ক্ষমতার মেরুদণ্ড! এজন্য এর একটা সমাধান বা সংস্কার প্রস্তাবনা অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালে সংবিধান সংস্কার কমিশন প্রস্তাব করেছে। তারা বলেছে, অর্থবিল ব্যতীত মনোনয়নকারী দলের বিপক্ষে ভোট দেওয়ার পূর্ণ ক্ষমতা থাকবে। অর্থাৎ অর্থবিল বাদে সব ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যরা স্বাধীনভাবে মতামত দিতে পারবেন, এমনকি নিজ দলের বিপক্ষেও।’’

ফরিদুল হক আরও বলেন, ‘‘যেহেতু নিজ দলের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে ভোট দিলে দলের ভেতর চাপে পড়ার বা কোণঠাসা হওয়ার আশঙ্কা থাকে, তাই ভোটদানের পদ্ধতি প্রকাশ্যে মৌখিক ‘হ্যাঁ-না’–এর পরিবর্তে গোপন ব্যালট বা ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারে করা যেতে পারেও বলে প্রস্তাব করেছিল সংবিধান সংস্কার কমিশন। কিন্তু দিনশেষে বিএনপি সেটা বাস্তবায়ন করেনি। যার ফলে আবারও আলোচনায় এসেছে সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৭০। আমার প্রত্যাশা, এটা নিশ্চয়ই কোনও একসময় সংস্কার হবে।’’

৭০ অনুচ্ছেদ নিয়ে যা বলছে জামায়াত

রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচনে সংসদে এমপিরা স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারলে জামায়াত জোটের প্রার্থী এলডিপির চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বিজয়ী হতেন বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও এগারো দলীয় ঐক্যজোটের সমন্বয়ক ড এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ। 

তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘যদি সংস্কার হতো কর্নেল (অব.) অলি সাহেব নিশ্চিতভাবে বিজয়ী হতেন এবং সবার কাছে গ্রহণযোগ্য প্রার্থী হিসেবে তিনি আজকে নির্বাচিত হতেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য জাতির জন্য। বিএনপির দ্বিচারিতার কারণে, তাদের সংস্কারের ব্যাপারে ইতিবাচক মানসিকতা না থাকার কারণে জাতি বঞ্চিত হলো। একজন দক্ষ যোগ্য লোকের সার্ভিস থেকে রাষ্ট্র বঞ্চিত হলো।’’

জামায়াত জোটের মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করার কারণ হিসেবে আযাদ বলেন, ‘‘বিএনপির রাষ্ট্র ও জনগণের সঙ্গে যে দ্বিচারিতাটা করেছে, সেটা জাতির সামনে আনতে চাই। গণভোটের রায়, জনগণের রায়, বিএনপি বাস্তবায়ন করেনি। সেটা বাস্তবায়ন হলে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংস্কারের মধ্যেই চলে আসতো। এখন সংসদ সদস্যরা স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারবেন না। এখানে তাদের ভোটাধিকার দিয়ে তার অধিকারের ওপর আপনি হস্তক্ষেপ বা নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে গেছেন। আমরা এই জায়গা থেকেই জাতিকে মুক্ত করতে চেয়েছি। সংসদ সদস্যদের এই স্বাধীনতা, ভোটাধিকার যে নিয়ন্ত্রিত—সেই জায়গাটাকে মুক্ত করতে চেয়েছি। গণভোটের রায় বাস্তবায়ন হলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সঠিক গণতন্ত্রের প্রতিফলনটা ঘটতো।’’

হামিদুর রহমান আযাদ আরও বলেন, ‘‘এ রাষ্ট্রে ধাপে ধাপে যে বাধা, মানুষের অধিকার যে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, এটাকে আমরা উঠিয়ে দিতে চাই। এ জন্য আমরা সংস্কারের কথা বলেছি। সংসদেও বলেছি, সংসদের বাইরে আন্দোলন কর্মসূচির মাধ্যমে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।’’

সংস্কার বাস্তবায়ন না করার কারণ তুলে ধরে জামায়াতের এই নেতা বলেন, ‘‘এখানে সংসদ সদস্যরা স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারছেন না। যদি ভোট দিতে পারতেন, আমাদের প্রার্থী দিয়েছি একজন বর্ষীয়ান নেতা, খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা। জাতির পক্ষ থেকে জনগণের পক্ষ থেকেও প্রতিনিধিরা একটা যোগ্য প্রার্থী এখানে পেতেন। তার প্যারালাল কোনও প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আসতো না।’’

/এপিএইচ/এমওএফ/
সম্পর্কিত
পদ্মা ব্যারাজ থেকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, প্রধানমন্ত্রীর কাছে যত প্রত্যাশা রাজশাহীবাসীর
ইশরাকের পদত্যাগের পরই ‘ক্ষমতা’ নিয়ে স্ত্রীর বার্তা
দীর্ঘদিনের ভোগান্তি শেষে কৃত্রিম পা পেলেন ছাত্রদলের সাবেক নেতা সাইফুল
সর্বশেষ খবর
আজকের বাজারে স্বর্ণের ভরি কত?
আজকের বাজারে স্বর্ণের ভরি কত?
নেতানিয়াহুকে সমর্থন জানাতে অস্বীকৃতি জানালেন জেডি ভ্যান্স
নেতানিয়াহুকে সমর্থন জানাতে অস্বীকৃতি জানালেন জেডি ভ্যান্স
মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে টর্চলাইট জ্বালিয়ে সংঘর্ষ, ৫ পুলিশসহ আহত ৩০
মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে টর্চলাইট জ্বালিয়ে সংঘর্ষ, ৫ পুলিশসহ আহত ৩০
জাতীয় ছাত্রশক্তি ঢাকা মহানগর দক্ষিণের নেতৃত্বে নাঈম-ইমরান
জাতীয় ছাত্রশক্তি ঢাকা মহানগর দক্ষিণের নেতৃত্বে নাঈম-ইমরান
সর্বাধিক পঠিত
‘পাপের লাশ বাংলাদেশে আসুক তা চাই না’ মন্তব্যের জন্য ক্ষমা চাইলেন এমপি রতন
‘পাপের লাশ বাংলাদেশে আসুক তা চাই না’ মন্তব্যের জন্য ক্ষমা চাইলেন এমপি রতন
ইশরাকের পদত্যাগের পরই ‘ক্ষমতা’ নিয়ে স্ত্রীর বার্তা
ইশরাকের পদত্যাগের পরই ‘ক্ষমতা’ নিয়ে স্ত্রীর বার্তা
চট্টগ্রামে জন্ম, ঢাকায় বসবাস-এমপি হতে ঠাকুরগাঁওয়ে আলীম নিজামী
চট্টগ্রামে জন্ম, ঢাকায় বসবাস-এমপি হতে ঠাকুরগাঁওয়ে আলীম নিজামী
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর প্রসঙ্গে যা বললেন জামায়াত আমির
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর প্রসঙ্গে যা বললেন জামায়াত আমির
ইউএনওর সরকারি গাড়ি নিয়ে ভাড়া বাসায়, তিন নারীসহ আটক চালক
ইউএনওর সরকারি গাড়ি নিয়ে ভাড়া বাসায়, তিন নারীসহ আটক চালক