তিন সিটি করপোরেশন থেকে শুরু করে শেষ হতে যাওয়া ইউনিয়ন পরিষদসহ সব স্থানীয় সরকার নির্বাচনেই অংশ নিয়েছে বিএনপি। অনুষ্ঠিত এসব নির্বাচনে সংখ্যানুপাতিক হারে আওয়ামী লীগের কাছে হেরে গেলেও ‘রাজনৈতিকভাবে লাভবান’ হয়েছে বলেই মনে করে দলটি। তবে রাজনৈতিক হিসাবের বাইরে অর্থনৈতিকভাবেও বিএনপির নেতারা লাভবান হয়েছেন এসব নির্বাচনের কারণে। বিশেষ করে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন দলীয় প্রতীকে হওয়ায় মনোনয়নের বদৌলতে দলীয় প্রার্থীদের কাছ থেকে গড়পরতা ৫-১০ লাখ টাকার লেনদেন হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, নির্বাচনের প্রাপ্তি বিষয়ে ৪ জুনের পর আনুষ্ঠানিকভাবেই অবস্থান ব্যক্ত করবে দল। তখনই জানা যাবে আমাদের প্রাপ্তি কী।
মনোনয়ন বাণিজ্য সম্পর্কে দলের গুরুত্বপূর্ণ এই নেতা বলেন, পত্র-পত্রিকায় যেসব প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে, সে নিউজগুলোর ভাষা লাইন হুবহু এক। বুঝাই যায় এগুলো একই জায়গার নিউজ। খেয়াল করে দেখবেন- সরকার যখন বেকায়দায় ছিল ওই প্রতিবেদনগুলো তখনই ছাপা হয়েছে। অর্থাৎ গড়পরতা যে অভিযোগ, সেগুলো মিথ্যে। তবে কেউ যদি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দিতে পারেন, তাহলে দল অবশ্যই তদন্ত করবে।
রাজনৈতিক লাভ
ঢাকা উত্তর-দক্ষিণ ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচন, উপজেলা নির্বাচন, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদে ধারাবাহিকভাবে অংশ নেয় বিএনপি। সিটি নির্বাচনে দুপুরের দিকে নির্বাচন থেকে সরে আসে দলটি। এরপর পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে নানা অভিযোগ থাকলেও কার্যক্রম সম্পন্ন করে বিএনপি।
দলের নেতাদের যুক্তি- নির্বাচনের কারণে ন্যূনতম তিন বছর পর প্রকাশ্যে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে ফিরতে সক্ষম হয়েছে বিএনপি। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনোত্তর ও পরের বছর ৫ জানুয়ারি থেকে তিনমাস অবধি অবরোধ-আন্দোলনের পর ঘরে ফিরতেও পারেনি দলটির নেতাকর্মীরা। সেদিক থেকে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে মাঠে-ঘাটে, রাজনৈতিক দাবি ও বক্তব্য নিয়ে হাজির হতে সক্ষম হয় বিএনপি। এটিকে দলের প্রাথমিক বিজয় বলেই মনে করে শীর্ষস্থানীয় নেতারা। এছাড়া নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ভোট জালিয়াতি, দলীয় প্রার্থীদের মনোনয়ন জমা দিতে বাধাদান, ব্যালটবাক্স চুরি, মামলা-গ্রেফতার হয়রানিসহ নানা অসঙ্গতি বাংলাদেশসহ পৃথিবীব্যাপী প্রচারিত হওয়ায় আওয়ামী লীগ সরকার ও নির্বাচন কমিশনের ব্যর্থতা প্রমাণিত হয়েছে।
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান বলেন, দৃশ্যত স্থানীয় সরকার নির্বাচনে গিয়ে আসনের দিক থেকে বিজয়ী না হলেও আমরাসহ সারাদেশের মানুষ জানে কারা হেরেছে। এই সরকারের সময় ও নির্বাচন কমিশনের অধীনে যেকোনও নির্বাচনই সুষ্ঠু হয় না; এর প্রমাণ বিগত দিনের নির্বাচনে প্রমাণিত হয়েছে। ফলে এ সরকারের অধীনে আগামী দিনের জাতীয় নির্বাচনের যে পরিকল্পনা করছে আওয়ামী লীগ, সেটিও আর বাস্তবায়নের সুযোগ থাকল না। এই পথটা রুদ্ধ হয়েছে। এটিই সবচেয়ে বড় অর্জন।
বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ এই নেতা মনে করেন, সাবজেক্টলি হেরে গেলেও রাজনৈতিকভাবে ও সাংগঠনিকভাবে বিজয়ী হয়েছে বিএনপি। উনার ভাষ্য- আমরা যখন ইসিতে কমিশনারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছি, তখন তারা পাল্টা কোনও যুক্তি দেখাতে পারেননি। মিডিয়ায় হয়তো কিছু কিছু বলেছেন কিন্তু আমাদের সামনে চুপই থেকেছেন তারা।
নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, ফলাফলে প্রথম ধাপের ৭৩৮টি ইউপির মধ্যে ১১৪টিতেই প্রার্থী নেই বিএনপির। ইতোমধ্যে আওয়ামী লীগের ৫০ জন প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়ে গেছেন। দ্বিতীয় ধাপের ইউপি নির্বাচন বিএনপির প্রার্থী ছিল না ৬১ ইউনিয়নে, বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ১৩ জন নির্বাচিত হয়েছিল। তৃতীয় ধাপে অনুষ্ঠিত ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের ৪৬টি ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে বিএনপির কোনও প্রার্থী ছিল না। চতুর্থ ধাপের ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে ৭২৭টির মধ্যে চেয়ারম্যান পদে ৫৫টিতে বিএনপির প্রার্থী ছিল না। সাংগঠনিক সম্পাদক এমরান সালেহ প্রিন্স জানান, নির্বাচন শেষ হলেই পরিপূর্ণ হিসাব গণমাধ্যমে তুলে ধরা হবে।
বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক এমরান সালেহ প্রিন্স বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে গিয়ে বিএনপির প্রাপ্তি হচ্ছে কয়েকটি। এর মধ্যে একটি হচ্ছে সরকার ও ইসির অধীনে কোনও নির্বাচন সুষ্ঠু হয় না- এটি আবারও প্রমাণিত হয়েছে। দ্বিতীয়ত, আমরা জনগণের কাছে ফিরতে পারছি, মানুষের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পেয়েছি। যেটি বিগত কয়েক বছর প্রায় অনুপস্থিত ছিল। হাজার-হাজার মামলা, গ্রেফতার-হয়রানির কারণে নেতাকর্মীরা তো ঘরেই থাকতে পারেনি।
চলমান দলের নির্বাচনি কাজে সম্পৃক্ত এমরান সালেহ আরও বলেন, গত ৫-৭ বছরে সরকারের লোকজন গ্রামে-গঞ্জে যে লুটপাটের নির্যাতন করেছে; মসজিদ-মন্দিরের বরাদ্দ টাকা মেরেছে, তাতে করে মানুষ অতিষ্ট। সুষ্ঠু নির্বাচন হলে অন্তত ৮০ ভাগ ভোট পেয়ে আমাদের প্রার্থীরা বিজয়ী হতেন। এটি পরিষ্কার হয়েছে।
অর্থনৈতিক লাভ
বিএনপির নেতারা মুখে রাজনৈতিক লাভের দিকটি নিয়ে আলোচনা করলেও নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দলের কয়েক স্তরের নেতারাই অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হয়েছেন। মনোনয়ন বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত ছড়িয়েছে প্রার্থী-বাণিজ্য। এক্ষেত্রে দলীয় সিদ্ধান্তই অনেকটা শাপে বর হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। এক অসমর্থিত সূত্রের দাবি- ইউপি নির্বাচনকে কেন্দ্র প্রায় ১০০ কোটি টাকার ট্রানজেকশন হয়েছে।
ইউনিয়ন নির্বাচনের আগে বিএনপি তিন দফায় মনোনয়ন প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করে। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই প্রাথমিকভাবে বাণিজ্যের পথটি সুগম করে দেওয়া হয়। কেন্দ্র ঘোষিত নিয়মে সংশ্লিষ্ট স্থানে সাবেক সংসদ সদস্যসহ উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক এবং ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদকেরা স্ব-সাক্ষরে প্রার্থীর নাম প্রস্তাব করেছেন। এরপর কেন্দ্র থেকে প্রার্থীকে প্রত্যয়ন করা হয়েছে।
বিএনপির নির্বাচন প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক সূত্র জানিয়েছেন, মনোনয়নের এই প্রক্রিয়ার জন্যই বাণিজ্য হয়েছে বেশি। এক্ষেত্রে স্থানীয় সম্ভাব্য এমপি পদপ্রার্থীর পছন্দের বাইরে কম সংখ্যক নেতাকর্মীরা ইউনিয়ন নির্বাচনে প্রার্থী হতে পেরেছেন। প্রথম দফায় স্থানীয়ভাবে উপজেলা ও ইউনিয়নের সুপারিশকারীদের উৎকোচ প্রদান করা হয়েছে। এরপর চূড়ান্ত অনুমোদন নিতে কেন্দ্রীয়ভাবে কয়েকজনকে অর্থ প্রদান করতে হয়েছে প্রার্থীকে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, লক্ষ্মীপুর জেলার রামগঞ্জ ৬নং লামচর ইউনিয়নে বিএনপির মফিজ উল্লাহ স্থানীয় নেতাদের ৪-৫ লাখ টাকা দিয়েছেন। জানতে চেয়ে যোগাযোগ করা হলে তার সেলফোন বন্ধ পাওয়া যায়। তবে তিনি নির্বাচনে হেরেছেন।
একই উপজেলার নোয়াগাঁও ইউনিয়নে প্রথম নমিনেশন পান বিল্লাল হোসেন। পরবর্তীতে ঢাকায় এসে তার প্রার্থিতা বাতিল করা হয়।
বিএনপির গুলশান কার্যালয়ের নির্ভরযোগ্য একাধিক ব্যক্তি অভিযোগ করে বলেন, কেন্দ্রীয়ভাবে গুলশান কার্যালয়ের একটি সিন্ডিকেট, বিএনপির দফতরের কয়েকজন দায়িত্বশীল মনোনয়ন বাণিজ্যে যুক্ত ছিলেন। এক্ষেত্রে নির্বাচনি সমন্বয়কের দায়িত্বরত সাবেক যুগ্ম-মহাসচিব মো.শাহজাহানের নামেও অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া সাইফুল ইসলাম টিপু, ফেনীর বিল্লাল হোসেনের নামও অভিযোগে আছে। তবে তাদের পাশাপাশি গুলশান কার্যালয়ের কর্মচারী ছাত্রদলেরসহ গণসংযোগ বিষয়ক সম্পাদক শাহাদাতের বিরুদ্ধে বেশি অভিযোগ।
বিএনপির নির্বাচনে কাজে যুক্ত দায়িত্বশীল এক নেতা জানান, মনোনয়ন বাণিজ্যের বাইরেও উপজেলা পর্যায়ে স্থানীয় ফান্ডে প্রার্থীরা ১ হাজার-২ হাজার করে টাকা দিয়েছেন। এ ব্যাপারে জানতে চেয়ে হবিগঞ্জ জেলার মাধবপুর থানার ধর্মঘর ইউনিয়নের নবনির্বাচিত বিএনপির চেয়ারম্যান শামসুল ইসলাম কামাল বলেন, উপজেলায় তো দলের ফান্ডে চাঁদা দিতে হয়। নির্বাচনের কারণে আলাদা কোনও ফান্ড দিতে হয়নি।
এ বিষয়ে চট্টগ্রামের হাটহাজারী, সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়াসহ কয়েকটি স্থানে যোগাযোগ করা হলেও বিএনপির প্রার্থীরা মন্তব্য করতে রাজি হননি।
বিএনপির নির্বাচনি কাজে সম্পৃক্ত সূত্রে জানা গেছে, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রে প্রত্যয়নপত্রের জন্য একটি ‘মূল্য’ ধরতে চেয়েছিলেন দায়িত্বশীলরা। কেন্দ্রীয় তহবিল সমৃদ্ধ করতেই এই প্রস্তাবনা ছিল তাদের। পরে খালেদা জিয়ার কাছে বিষয়টি উপস্থাপন করা হলে তিনি বাতিল করে দেন। বিষয়টি নিশ্চিত করেন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক (ময়মনসিংহ বিভাগ) ও নির্বাচনি কাজে যুক্ত এমরান সালেহ প্রিন্স। তিনি বলেন, তহবিল বাড়াতে চাঁদার প্রস্তাব দিলেও ম্যাডাম বাতিল করেন।
জানতে চাইলে বিএনপির ভাইস-চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, বিষয়টি আমরা সিরিয়াসলি খতিয়ে দেখছি। পত্রপত্রিকায় এসব অনেক তথ্য প্রকাশিত হচ্ছে। কিন্তু আমরা এখনও সুনির্দিষ্ট ব্যক্তি ধরে কাজ করছি। একটি রাজনৈতিক দলের জন্য এ ধরনের কর্মকাণ্ড অশনি সঙ্কেত। বেসিক জায়গাটা নষ্ট করে ফেললে তো চলবে না।
সাংগঠনিক সম্পাদক ডা. সাখাওয়াত হাসান জীবন বলেন, আমার সিলেট বিভাগের স্বচ্ছতা রেখে কাজ করার চেষ্টা করেছি। তবে অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেব। দলের হাইকমান্ড এ ব্যাপারে খুবই সচেতন।
/এসটিএস/এএইচ/
আরও খবর পড়ুন-








