খালেদা জিয়ার কারামুক্তি-আন্দোলন নিয়ে হতাশা বিএনপির তৃণমূলে

Send
আদিত্য রিমন
প্রকাশিত : ২০:৫৫, ডিসেম্বর ০৫, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২১:৩৯, ডিসেম্বর ০৫, ২০১৯

৮ ফেব্রুয়ারি রায়ের পর আদালতে খালেদা জিয়াবিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মেডিক্যাল রিপোর্ট না পাওয়ায় জামিন শুনানির তারিখে পেছানোকে কেন্দ্র করে দলীয় কোনও কর্মসূচি ঘোষণা না করায় আশাভঙ্গ হয়েছে দলটির তৃণমূল নেতাকর্মীদের। তারা খালেদা জিয়ার জামিন আবেদনকে কেন্দ্র করে বৃহস্পতিবার (৫ ডিসেম্বর) সকাল থেকে দলের নয়াপল্টনে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে জড়ো হতে থাকেন। এরপর সকাল ১১টায় খালেদা জিয়ার জামিন শুনানির তারিখ পেছানোর পর তারা আশা করেছিলেন, সংবাদ সম্মেলন থেকে দলের চেয়ারপারসনের মুক্তির দাবিতে এবার কঠোর কর্মসূচির ঘোষণা আসবে। কিন্তু সংবাদ সম্মেলন থেকে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কোনও কর্মসূচি ঘোষণা না করায় বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতাদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তৃণমূল নেতাকর্মীরা। তারা বলছেন, কেন্দ্রীয় নেতারা আদৌ খালেদা জিয়ার কারামুক্তি বা জামিন চান কিনা, তা নিয়েও সন্দেহ আছে। বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে তাদের এমন মনোভাবের কথা জানা গেছে।

এদিকে, সকাল থেকে বিএনপির নয়াপল্টন কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের পাশে শতাধিক পুলিশ সদস্যকে সতর্ক অবস্থানে থাকতেও দেখা গেছে। এছাড়া, সাদা পোশাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও ছিলেন। খালেদা জিয়ার জামিন শুনানির তারিখ পরিবর্তনের পর বেলা সাড়ে ১১টার দিকে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে বিএনপির নেতাকর্মীরা বিক্ষোভ মিছিল করার চেষ্টা করলে পুলিশ ধাওয়া দিয়ে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এ সময় দলের ৩ জন নেতাকর্মীকে আটক করা হয়েছে বলেও দাবি করা হয় বিএনপির পক্ষ থেকে।

বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়েল সামনে পুলিশের অবস্থান

প্রসঙ্গত, খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্য পরীক্ষার প্রতিবেদন ৫ ডিসেম্বরের মধ্যে দাখিল করতে গত ২৮ নভেম্বর (বৃহস্পতিবার) নির্দেশ দিয়েছেন আপিল বিভাগ। একইসঙ্গে জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় তার জামিন চেয়ে করা আবেদনের শুনানির জন্য একই তারিখ নির্ধারণ করেন আদালত। কিন্তু এদিন মেডিক্যাল রিপোর্ট আদালতে জমা না হওয়ায় খালেদা জিয়ার জামিন আবেদন শুনানি না করে ১২ ডিসেম্বর পরবর্তী তারিখ নির্ধারণ করেছেন আপিল বিভাগ।

বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মী বলছেন, এর আগে খালেদা জিয়ার জামিন আবেদন খারিজ হলে দলের পক্ষ থেকে কর্মসূচি দেওয়া হতো। সেটি কখনও হতো বিক্ষোভ মিছিল, কখনও মানববন্ধন। এবার কোনও কর্মসূচিই দেওয়া হয়নি। আর কেন কোনও কর্মসূচি দেওয়া হলো না, এর কোনও ব্যাখ্যাও দেননি বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা।
বিএনপির নয়াপল্টন অফিসের একজন স্টাফ বলেন, ‘এবার আশা ছিল খালেদা জিয়া এই মামলায় জামিন পেয়ে যাবেন। আগামী সপ্তাহে অন্য মামলায় জামিন পেলে মুক্তি পেতেন, কিন্তু হলো না। জানুয়ারিতে নাইকো দুর্নীতি মামলার শুনানি শুরু হবে। তার মানে তিনি শিগগিরই মুক্তি পাচ্ছেন না।’
এই কর্মী আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, ‘হয়তো হাসপাতাল থেকে খালেদা জিয়াকে লাশ হয়ে বের হতে হবে।’
নাম না প্রকাশ করার শর্তে বিএনপির সম্পাদকমণ্ডলীর এক নেতা বলেন, ‘বিএনপিতে লিডারশিপের অভাব রয়েছে। কর্মী আছেন। কর্মীরা জীবন দিতে প্রস্তুত। অথচ তাদের নিয়ে রাস্তায় নামার মতো কোনও নেতা নেই।’

বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়েল সামনে দলীয় নেতাকর্মীদের অবস্থানবিএনপি চেয়ারপারসনের কারামুক্তি ইস্যুতে দলের সিনিয়র নেতাদের বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে বিএনপির এই নেতা বলেন, ‘‘আগে আমাদের রাজশাহী অঞ্চলে কেউ মারা গেলে ভাড়া করে লোক এসে কান্নাকাটি করা হতো। এরপর তারা চলে যেতেন। এখন খালেদা জিয়ার জন্য সিনিয়র নেতারা মায়াকান্না করছেন। কোনোদিন তিনি মুক্তি পেলে এই সিনিয়র নেতারা দাবি করবেন, তারাই খালেদা জিয়ার কারামুক্তির জন্য কথা বলেছেন।’
খালেদা জিয়ার জামিনের শুনানিতে কী হয়—তা শুনতে সোনারগাঁও থেকে এসেছেন বিএনপির ৫ জন কর্মী। তাদের মধ্যে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নেতা বলেন, ‘সকালে কোর্টে ছিলাম। শুনানির তারিখ পরিবর্তন করায় নয়াপল্টন কার্যালয়ে এসেছি। এখান থেকে কী কর্মসূচি দেয় তা শুনতে। কিন্তু মহাসচিব তো কোনও কর্মসূচি দেননি। আমার তো সন্দেহ হয় বিএনপির সিনিয়র নেতারা আসলেই খালেদা জিয়ার মুক্তি চান কিনা!
তৃণমূলের এই নেতা আরও বলেন, ‘এখন বাসায় যেতে পারছি না। কারণ, পার্টি অফিসের নিচে পুলিশ দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের ৫ জনের মধ্যে একজনকে এরইমধ্যে ধরে নিয়ে গেছে সিভিল পোশাকের লোকজন।’
নাম না প্রকাশ করার শর্তে ছাত্রদলের একজন নেতা বলেন, ‘সরকারের ওপর বিএনপি চাপ সৃষ্টি না করলে খালেদা জিয়া কোনোদিনও ছাড়া পাবেন না। তার মুক্তির জন্য দলের উচিত—হয় আন্দোলন করা, না হয় সরকারের সঙ্গে সমঝোতা করা। এছাড়া, ভিন্ন কোনও পথ আছে বলে আমার মনে হয় না।’ তিনি আরও বলেন, ‘‘প্রেসক্লাব বা দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে সাংবাদিকদের সামনে ফটোসেশন করে খালেদা জিয়াকে মুক্ত করা যাবে না। তাকে মুক্ত করতে হলে ‘ডু অর ডাই’ আন্দোলন করতে হবে।’’

খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে বিএনপির নেতাকর্মীদের মিছিলের উদ্যোগ

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান বলেন, ‘আমরা সব সময় জামিনের ওপর নির্ভর করে আসছি। আজ খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যের প্রতিবেদন জমা হলে তিনি জামিন পেতেন। কিন্তু সরকার হার্ডলাইনে গেছে। তার প্রমাণ সরকার প্রধানের গতকালের বক্তব্য।’ তিনি আরও বলেন, ‘সরকার যেহেতু হার্ডলাইনে, সেহেতু আমরা বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছি। আমরা কর্মীদের হতাশার কথা বুঝি। কিন্তু ১২ তারিখের শুনানিটা আমরা দেখতে চাই। এরপর পরবর্তী করণীয় ঠিক করবো।’

বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদ জিয়ার মিডিয়া উইংয়ের সদস্য শায়রুল কবির খান বলেন, ‘‘এই মুহূর্তে বিএনপির প্রতিটি নেতাকর্মীদের একেকজনকে ‘জিয়া’ হয়ে লড়তে হবে। আন্দোলনের মাধ্যমে খালেদা জিয়াকে মুক্ত করে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে দেশে ফিরিয়ে আনতে হবে।’’

সরকারবিরোধী এই দলটির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট আব্দুস সালাম আজাদ বলেন, ‘বিএনপি গণতান্ত্রিক রাজনীতি ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। কিন্তু খালেদা জিয়াকে নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর গতকালের বক্তব্যে প্রমাণিত হয়েছে, খালেদা জিয়ার জামিন তার ইচ্ছার ওপরই নির্ভর করছে।’
দলের নেতাকর্মীদের আন্দোলনের প্রস্তুতি রয়েছে উল্লেখ করে আব্দুস সালাম বলেন, ‘সময়মতো আন্দোলনের ঘোষণা দেওয়া হবে।’ কর্মীদের প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানাবেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

/এমএনএইচ/এমওএফ/

লাইভ

টপ