বাংলা ট্রিবিউনকে তাবিথ আউয়ালদলীয় পদ-পদবির চেয়ে মনোনয়নের দিকে আমার আগ্রহ বেশি

Send
সাদ্দিফ অভি
প্রকাশিত : ১৮:০১, জানুয়ারি ১৭, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২২:৫৭, জানুয়ারি ১৮, ২০২০

২৩রাজনীতিতে অনেক ধারা রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দলটির মনোনীত মেয়রপ্রার্থী তাবিথ আউয়াল। তিনি বলেন, ‘রাজনীতির অনেক ধারার একটি দলীয় ধারা, যে ধারায় দলীয় পদ-পদবির জন্য অনেকে চেষ্টা করেন। আরেকটি হলো—মনোনয়নের ধারা। যেখানে মনোনয়নের জন্যই অনেকে কাজ করেন। আমার আগ্রহ মূলত দলের পদের চেয়ে মনোনয়নের দিকে বেশি।’ বাংলা ট্রিবিউনকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন।

বাংলা ট্রিবিউনের পাঠকদের জন্য তাবিথ আউয়ালের সাক্ষাৎকারটি তুলে ধরা হলো।

বাংলা ট্রিবিউন: নির্বাচন ছাড়া আপনাকে রাজনীতিতে তেমন সক্রিয়ভাবে দেখা যায় না, এর কারণ কী?

তাবিথ আউয়াল: যদি দৃশ্যমানভাবে চিন্তা করি, তাহলে হয়তো অবশ্য একটু কম দেখা যায়। কিন্তু রাজনীতিতে অনেকভাবে অবদান রাখার উপায় আছে। ধরুন, যে নির্বাচনে আমি অংশ নেই, সেখানে আমি অবশ্যই দৃশ্যমান থাকি। এছাড়া, এর আগে স্থানীয় সরকার ও জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি যতবার অংশ নিয়েছে, এর প্রত্যেকটি নির্বাচনে আমি কোনও না কোনোভাবে অবদান রেখেছি।  

বাংলা ট্রিবিউন:  আপনি একজন ব্যবসায়ী, এখন মেয়র হতে চান। এর পেছনে আপনার উদ্দেশ্য কী?

তাবিথ আউয়াল: অনেক কারণের একটি হচ্ছে, এই শহরে আমি বড় হয়েছি। আমার জীবনের সবচেয়ে ভালো সময় কাটিয়েছি এই শহরে। বর্তমানে সবচেয়ে খারাপ সময় কাটাচ্ছি। আমি কমপক্ষে ২০০টি শহর দেখেছি। কোনও উত্তর পাইনি, কেন ঢাকা পৃথিবীর অন্য যেকোনও শহরের মতো উন্নত হতে পারবে না?   

ঢাকা একটি অনিরাপদ শহর হয়ে গেছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশগুলোতেও কিন্তু ঢাকার চেয়ে নিরাপদ শহর আছে। সবকিছু মিলিয়ে আমরা দেখলাম, আমাদের একটি সামাজিক প্রতিশ্রুতি আছে। এখন মনে হচ্ছে, আমার মতো একজনকে দায়িত্ব নেওয়া উচিত। আমার যে চিন্তা, তা অন্যদের চেয়ে অনেক ভিন্ন বলে মনে করি। আমি পারবো কাজটা।    

বাংলা ট্রিবিউন: আপনারা অভিযোগ করেছেন, বিগত নির্বাচনগুলোয় অনিয়ম হয়েছে। নির্বাচন কমিশন (ইসি)-এর ভূমিকা, ইভিএম নিয়ে প্রশ্ন আছে। তাহলে এবারের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন কেন?

তাবিথ আউয়াল:  সবকিছু নিশ্চিত করেই কেউ কিন্তু নির্বাচনে যায় না, যেতে পারে না। ২০১৫ সালের অভিজ্ঞতা হলো—প্রচারণার সময় খুবই ভালো পরিবেশ ছিল, নির্বাচনের দিনের চিত্র পুরোপুরি বদলে যায়। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিকে একটু তাকালে জোরালোভাবে বলা যায়, বেশিরভাগ ভোট আগের রাতেই কিন্তু সিল মারা হয়েছে। যেগুলো আমরা সাধারণত আশঙ্কা করি, নির্বাচনের দিন ব্যালট চুরি হবে, কেন্দ্র দখল হবে, এগুলা সবসময় দেখে এসেছি। তো এই নির্বাচনে আমাদের প্রথম কথা সবকিছু জেনেশুনে আমরা নির্বাচনে নেমেছি। আমরা যদি গণতন্ত্র রক্ষা করতে চাই, ভোটের অধিকার রক্ষা করতে চাই, তার জন্য নির্বাচনই উপযুক্ত প্রক্রিয়া। নির্বাচনের মাধ্যমেই কিন্তু আমরা জনগণের সঙ্গে কথা বলবো, জনগণের কাছে যাবো। নির্বাচন করেই কিন্তু ভোটের অধিকার রক্ষা করতে হবে। নির্বাচন যদি না করি, তাহলে ভোটের অধিকার রক্ষা হলো কিনা, জানার কোনও উপায় নেই। আর ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, এই নির্বাচনে অবশ্যই ধানের শীষ জিতবে। একটি জেতার নির্বাচনে আমরা কেন অংশগ্রহণ করবো না?

বাংলা ট্রিবিউন: ধানের শীষ যে জিতে যাবে, এই বিশ্বাস জন্মালো কীভাবে?

তাবিথ আউয়াল: আত্মবিশ্বাস পাচ্ছি অনেকভাবেই। বিএনপি বিগত দিনগুলোয় যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, সেসব নাগরিকদের জন্যই। আইনের দিকে দেখলে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বিরোধী কিন্তু আমরা সবাই। এছাড়া, নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে বিএনপির সমর্থন ছিল। বিএনপি’র অভিজ্ঞতা বলে, তারা কখনও অর্থনীতিক কোনও দুর্যোগ আসতে দেয়নি। এখন আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দেখা যায়, শেয়ার মার্কেটে কেলেঙ্কারির জন্য মার্কেট নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। অনেক ঋণখেলাপির কারণে ব্যাংকগুলো ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। এই যে নেতিবাচক প্রভাবগুলো রয়েছে, তার বিপক্ষে সবসময় বিএনপির  অবস্থান। জনগণ এমন রাজনৈতিক দলকেই চায়। দলের ভূমিকা, আমার ব্যক্তিগত সফলতা ও অতীতের প্রতিশ্রুতি—সবমিলিয়ে বুঝতে পেরেছি, আমরা জনগণের পক্ষে কথা বলছি। এ কারণে জয়ের ব্যাপারে আমি আত্মবিশ্বাসী।        

১২

বাংলা ট্রিবিউন: ইশতেহার কবে দিচ্ছেন? সেখানে মুখ্য বিষয় কী কী?

তাবিথ আউয়াল: ইশতেহার প্রকাশ করবো ২১ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে। ইশতেহারের বেশকিছু অংশ ইতোমধ্যে আমাদের বক্তব্যে এসেছে। আমি জোরালোভাবে বিশ্বাস করি, আমি যে ১২টি ইস্যু চিহ্নিত করেছি ‘অদম্য ঢাকা’ প্ল্যাটফর্মে, ১২টি চিহ্নিত সমস্যার সমন্বয় করেই সমাধানের পথে এগিয়ে যেতে হবে। আমরা যখনই এক সমস্যাকে প্রাধান্য দেবো, বাকি সমস্যাগুলো কিন্তু আরও খারাপের দিকে এগিয়ে যাবে। সুনির্দিষ্ট করে বলতে গেলে, ডেঙ্গু রোগ একটি বড় ক্রাইসিস হয়ে গেছে বাংলাদেশে। দূষণের ক্ষেত্রে আমরা এখন পৃথিবীর সেরা হয়ে গেছি। পানি-শব্দ-বায়ুদূষণের প্রতি খুব কড়া নজর রাখতে হবে। ঢাকা সিটি করপোরেশনকে দুর্নীতি ও দুঃশাসন থেকে মুক্ত করতে আমাদের একটি কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। এই ৩-৪টি বিষয়ে আমি শুরুতেই প্রাধান্য দেবো। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, বর্জ্যব্যবস্থা, জলাবদ্ধতা, ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা, গণপরিবহনের যে অবস্থা, এগুলো প্রাধান্য পাবে না। তাই আমি বলছি, একটি মাত্র সমস্যাকে বড় করে চিহ্নিত করা যাচ্ছে না। এটি একটি শহর, চক্রাকার অর্থনীতি। তাই প্রত্যেকটি ইস্যুকেই সমানভাবে দেখতে হবে।   

বাংলা ট্রিবিউন: ১২টি চিহ্নিত ইস্যু সম্পর্কে একটু সুনির্দিষ্ট করে বলা যাবে?

তাবিথ আউয়াল: এগুলোর মধ্যে পাবলিক টয়লেট আছে, শহরের অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধি, সড়ক ব্যবস্থা, সব ধরনের দূষণ রয়েছে। বাসস্থান একটি সমস্যা, হাউজিং বেড়ে যাচ্ছে, আবার অনেকেই ভাড়া নিতে পারছেন না। নারীদের জন্য আলাদা বাসা নেওয়া একটি বড় সমস্যা। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী যারা, তাদের সুযোগ সুবিধার কী প্রয়োজন, তা দেখা হবে। আমরা চিহ্নিত করেছি মাদক একটি খুবই বড় সমস্যা। আমাদের পার্ক কিংবা উন্মুক্ত জায়গা নেই বললেই চলে। নিরাপদ পানি নিশ্চিতের পাশাপাশি পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থাকেও গুরুত্ব দিতে হবে।

গণপরিবহন সবচেয়ে বড় ইস্যু। জলাবদ্ধতার সঙ্গে মশাকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করেছি। মশা থেকে ডেঙ্গু কিংবা অন্য রোগও হতে পারে। আমাদের মূল কাজ হবে মশা নিয়ন্ত্রণ করা। বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কোনও শৃঙ্খলা নেই। এখান থেকে আরও অনেক সমস্যা বাড়ছে। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এগুলোর সমাধান করা হবে।     

বাংলা ট্রিবিউন: বর্তমানে ক্ষমতায় রয়েছে আওয়ামী লীগ। কিন্তু আপনি সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলের মনোনীত প্রার্থী। নির্বাচিত হলে কাজ কীভাবে করবেন বলে মনে করেন?

তাবিথ আউয়াল: রাজনীতির কথা বলতে গেলে বর্তমান সরকার জনবিচ্ছিন্ন। যেকোনও মেয়র ক্ষমতাসীন হবেন মানুষের ভোটে, জনগণের রায় নিয়ে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন। তখন কিন্তু একটি সামাজিক ক্ষমতা চলে আসে। সেটা অত্যন্ত জরুরি, যেকোনও প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করার জন্য। প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের জন্য সিটি করপোরেশনের যথেষ্ট দায়িত্ব-কর্তৃত্ব আছে। বাকিগুলোর সহযোগিতা করার জন্য ৫৪টি সংস্থা আছে। যেখানে সুস্পষ্টভাবে সমন্বয় দরকার। ওই সমন্বয় কখনোই আসবে না, যদি কেউ ভোটের মাধ্যমে জনগণের সমর্থন নিয়ে দায়িত্ব পালন না করেন। যদি নির্বাচিত হই, তাহলে আমার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের জন্য সবাই সহযোগিতা করবেন।

বাংলা ট্রিবিউন: প্রতিপক্ষকে কীভাবে দেখছেন?

তাবিথ আউয়াল: প্রতিপক্ষের বিষয়ে কোনও মন্তব্য করি না। আমি মনে করি না, কোনও মন্তব্য করার অধিকার এই মুহূর্তে আমার আছে। আমি প্রতিপক্ষকে প্রতিপক্ষ হিসেবেই দেখি। কারণ আমি মনে করি, আমাদের চ্যালেঞ্জ হলো ভোটারদের কাছে যাওয়া, তাদের আশ্বস্ত করে তাদের ভোট নিয়ে আগামী দিনে জয়লাভ করা। 

বাংলা ট্রিবিউন: প্রচারণার জন্য সামাজিকমাধ্যমে কিছু ভিডিও দেখছি আপনার, এটি ভিন্ন কোনও কৌশল?

তাবিথ আউয়াল: পুরো পৃথিবী এখন ইন্টারনেটনির্ভর। ডিজিটাল যুগে মানুষ অ্যাপস ব্যবহার করে, সফটওয়্যার ব্যবহার করে। আমরা দেখেছি, ঢাকার যে ভোটার, তাদের বেশিরভাগেরই বয়স ৩৫-এর নিচে। তাদের শতভাগই অনলাইননির্ভর। এই ভোটারদের কাছে আমার বার্তা পৌঁছানোর জন্য সোশ্যাল মিডিয়া, মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন ও অন্যান্য ইন্টারনেটনির্ভর ডিভাইস ব্যবহারকে প্রাধান্য দিয়েছি।

দ্বিতীয়ত আমি মনে করি, ‘ই-প্রচার’ যত বেশি করা যাবে, ততই সাধারণ মানুষ বুঝবে যে, আমি শতভাগ প্রস্তুত এই নির্বাচনে লড়াই করার জন্য। পরে যখন অভিযোগ করবো, ভোটচুরি কিংবা নির্বাচন নিয়ে কেউ যেন মনে না করেন, এটি একটি অজুহাত। মানুষ যেন মনে করে, এরকম প্রস্তুতি নিয়ে, আন্তরিকতার পরেও কোনও যুক্তি না আসে।        

বাংলা ট্রিবিউন: ২০১৫ সালের সিটি করপোরেশন নির্বাচনে শেষ মুহূর্তে সরে এলেও এবার শেষটা দেখে যাবেন বলেছেন, বিজয়ী  হলে প্রথম কাজ কী হবে আপনার?

তাবিথ আউয়াল: আমরা গত বছর দেখেছি যে দুটি ক্রাইসিসে ঢাকাবাসী ঢুকে গেছে, সেগুলো হলো ডেঙ্গু ও বায়ুদূষণ। এই দুটি ক্রাইসিস মোকাবিলা করতে হবে। এই দুটি ইস্যু ধরে প্রথম ঘণ্টায় কাজ শুরু করবো।      

বাংলা ট্রিবিউন: নির্বাচনে পরাজিত হলে বিজয়ীকে সহযোগিতা করবেন, নাকি বিভিন্ন ইস্যুতে আন্দোলন করবেন?

তাবিথ আউয়াল: যদি দেখি, নির্বাচন সুষ্ঠু হচ্ছে না, নির্বাচনে ব্যাপক চুরি হয়ে গেছে, হামলা-মামলা বেড়ে গেছে, সেক্ষেত্রে আমি যথাযথ আইনি ব্যবস্থার আশ্রয় নেবো। নানা ধরনের প্রবল আন্দোলন গড়ে তুলবো। আমরা এখনও চাই, সুষ্ঠু নির্বাচন পরিচালনায় ভোটের অধিকার রক্ষা করা।

যদি সাধারণ জনগণের রায়ের মাধ্যমে সুষ্ঠু নির্বাচনে হেরে যাই, তাহলে সেই রায় আমি অবশ্যই মেনে নেবো। এরপরও আমি চেষ্টা করবো, আমাদের যে আধুনিক চিন্তাগুলো রয়েছে, সেগুলো নিয়ে সিটি করপোরেশনকে সহযোগিতা করা যায় কিনা। আর যদি সিটি করপোরেশন দুঃশাসন বজায় রাখে, তাহলে পুরো ৫ বছরই প্রতিবাদ করবো। 

প্রসঙ্গত, ঢাকা সিটি করপোরেশন দুই ভাগ হওয়ার পর ২০১৫ সালে প্রথম নির্বাচনে উত্তর সিটিতে মেয়র নির্বাচিত হন প্রয়াত আনিসুল হক। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন বিএনপি মনোনীত প্রার্থী তাবিথ আউয়াল। ওই সময় ভোটগ্রহণের দিন দুপুরের পর তিনি অনিয়মের অভিযোগ তুলে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেন। এরপরও ওই নির্বাচনের তিনি তিন লাখেরও বেশি ভোট পেয়েছিলেন। এরপর আনিসুল হকের মৃত্যুর পর ২০১৮ সালের উপনির্বাচন বিএনপি প্রত্যাখ্যান করে।

ছবি: নাসিরুল ইসলাম  

/এমএনএইচ/এমএমজে/

সম্পর্কিত

লাইভ

টপ