আ.লীগের ত্রাণ তৎপরতায় দলীয় তহবিল থেকে ব্যয় হয়নি, নেতাকর্মীরা নিজেরাই দিয়েছেন

Send
এমরান হোসাইন শেখ
প্রকাশিত : ১৮:৩০, মে ২৬, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২০:১২, মে ২৬, ২০২০

আওয়ামী লীগকরোনা পরিস্থিতিতে দেশের কর্মহীন অসহায় ও দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। দলের নেতাকর্মী, সংসদ সদস্যসহ জনপ্রতিনিধি এবং সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা দেশব্যাপী নিয়মিত খাদ্য ও নগদ অর্থ সহায়তা হিসেবে দিচ্ছেন। এ পর্যন্ত কোটির বেশি পরিবারকে খাদ্য এবং ১০ কোটির বেশি নগদ অর্থ দিয়েছে ক্ষমতাসীন এ দলটি। তবে, এই বিপুল কর্মযজ্ঞে দলটি নিজের তহবিল থেকে কোনও অর্থ ব্যয় করেনি। নেতাকর্মীরা ব্যক্তিগতভাবে ও শুভানুধ্যায়ীদের মাধ্যমে সংগ্রহ থেকে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হচ্ছে। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় ও মাঠপর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
দেশে করোনার প্রাদুর্ভাব হওয়ার পরপরই দলীয় সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তৃণমূল নেতাকর্মীদের সব পর্যায়ে সরকারি ত্রাণ কার্যক্রমে সহযোগিতার জন্য ত্রাণ কমিটি গঠনের নির্দেশনা দেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রী দলের সংসদ সদস্য, নেতৃবৃন্দকে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোরও নির্দেশ দেন। তবে, ওই সময় ত্রাণ বিতরণের তথ্য তৃণমূলের কাছে চাওয়া হয়নি। পরে মে মাসের শুরুতে দলীয় সভাপতির নির্দেশে সারা দেশে দলীয়ভাবে কী পরিমাণ খাদ্য ও অর্থ সহায়তা করা হয়েছে তার তথ্য চেয়ে জেলা কমিটিকে চিঠি দেওয়া হয়। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় একটি টিমকে দলের ত্রাণ কার্যক্রম তদারকিরও দায়িত্ব দেওয়া হয়।
জানা গেছে, তৃণমূল থেকে খাদ্যসামগ্রী ও অর্থ বিতরণের প্রাপ্ত তথ্য সমন্বয় করে কেন্দ্রীয়ভাবে ইতোমধ্যে তিন দফায় তা গণমাধ্যমের কাছে প্রকাশ করা হয়েছে। সর্বশেষ ১৫ মে তারা তথ্য প্রকাশ করেন। ওই সময়ের তথ্য অনুযায়ী আওয়ামী লীগ এ পর্যন্ত এক কোটি ২০ লাখ পরিবারকে খাদ্যসামগ্রী ও কর্মহীন অসহায় মানুষদের নগদ ১০ কোটিরও বেশি টাকা অর্থ সহায়তা করেছে বলে জানানো হয়।

দলের ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ উপ-কমিটিও নিজস্ব উদ্যোগে মাস্ক, পিপিই, হ্যান্ড স্যানিটাইজার, জীবাণুনাশক ও সাবানসহ সুরক্ষাসামগ্রী বিতরণ করেছে। আওয়ামী লীগের এই সহায়তা অব্যাহত রয়েছে এবং ধারাবাহিকভাবে তার হিসাব কেন্দ্রীয় কমিটিকে পাঠানো হচ্ছে। এসব তথ্য সমন্বয় করে ঈদের পরে আবারও প্রকাশ করার কথা রয়েছে।
মাঠপর্যায়ের নেতারা জানিয়েছেন, ত্রাণ কার্যক্রমের জন্য কেন্দ্রীয়ভাবে তাদের অর্থ বা খাদ্যসামগ্রী দিয়ে সহযোগিতা করা হয়নি। তারা নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় এই সহায়তা চালিয়ে যাচ্ছেন। নিজেরা পকেট থেকে এগুলো ব্যয় করছেন। দলের সামর্থ্যবান অনুসারীরা সহযোগিতা করছেন। এসব ব্যয়ের পর তার হিসাব কেন্দ্রের চাহিদা অনুযায়ী জমা দেওয়া হচ্ছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাগেরহাট জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান টুকু জানান, দলীয়ভাবে তারা যেসব খাদ্য ও অর্থ সহায়তা দিচ্ছেন তারা সেটা নিজেরা ব্যয় করছেন। স্থানীয় সংসদ সদস্যরাই এর সিংহভাগ দিচ্ছেন। এছাড়া আর্থিকভাবে সামর্থ্যবান দলের শুভাকাঙ্ক্ষীরাও অনুদান দিচ্ছেন। দলীয়ভাবে আমরা যেটা ব্যয় করছি তার তথ্যই কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগকে পাঠিয়ে দিচ্ছি।
রংপুর জেলা আওয়ামী লীগ নেতা রেজাউল করিম রাজুও একই তথ্য জানান। তিনি বলেন, নিজেরা যতদূর পারছেন তা সংগ্রহ করে দরিদ্র ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছেন।
চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোসলেম উদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, তারা দরিদ্র এবং কর্মহীনদের দলীয়ভাবে যে খাদ্য ও অর্থ সহায়তা দিচ্ছেন, সেটা নিজস্ব উদ্যোগে করছেন। এর জন্য আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে কোনও সহযোগিতা করা হয়নি। তবে, তাদের কার্যক্রম কেন্দ্র তদারকি করছে। কেন্দ্রের কাছে সহায়তার হিসাব জানানো হচ্ছে।
আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা এবিএম রিয়াজুল কবীর কাওছার বলেন, ত্রাণ কার্যক্রমে দলের তহবিল থেকে খরচ করতে হবে বিষয়টি তা নয়। আমরা তহবিলে হাত না দিয়েই এই সংকটকালে আমাদের নিজস্ব অনুদান দিয়ে এবং অর্থ সংগ্রহ করে ত্রাণ ও নগদ অর্থ বিতরণ করছি। এই সময় যেটা সংগ্রহ ও ব্যয় হচ্ছে আমরা সেটা দলীয় আয়-ব্যয়ের সঙ্গে দেখিয়ে দেবো। নির্বাচন কমিশনে আমরা যে অডিট রিপোর্ট দেই সেখানেও এটার উল্লেখ থাকবে। অতীতেও ত্রাণ কার্যক্রম এভাবে হয়েছে বলে জানান তিনি। কাওছার আওয়ামী লীগের যে উইং নির্বাচন কমিশনে দলের আয়-ব্যয়ের হিসাব প্রদান করে থাকে তার সঙ্গে সম্পৃক্ত।
আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ এইচ এন আশিকুর রহমান জানান, আওয়ামী লীগের দলীয় ফান্ড দলের কাছেই আছে। এ ফান্ড দলের অনেক কাজেই ব্যয় করতে হয়। দলীয় কার্যক্রমে আমরা এই ফান্ড খরচ করি। আমাদের অনেক স্টাফ রয়েছে, তাদের বেতন ভাতা দিতে হয়। এজন্য তো সব জায়গায় হাত দেওয়া যাবে না।
দলের ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ বিষয়ক সম্পাদক সুজিত নন্দী বলেন, ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ উপ-কমিটি থেকে তারা যেসব ত্রাণ ও স্বাস্থ্য সুরক্ষাসামগ্রী বিতরণ করছেন, কমিটির সদস্যরা এক্ষেত্রে আর্থিক সহায়তা দিয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন ফার্মাসিউটিক্যাল ও নিত্যপণ্য সামগ্রী উৎপাদনকারী কোম্পানিসহ বিভিন্ন পার্টনার প্রতিষ্ঠান সহযোগিতা করছে। আর তৃণমূল থেকে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠন এবং সংসদ সদস্যসহ জনপ্রতিনিধিরা নিজস্ব অর্থ ও শুভানুধ্যায়ীদের থেকে সংগ্রহ করে ত্রাণসামগ্রী ও নগদ অর্থ বিতরণ করছেন। পরে সেই হিসাব তারা কেন্দ্রের কাছে পাঠিয়ে দিচ্ছে এবং কেন্দ্রীয়ভাবে তা সংরক্ষণ করা হচ্ছে।
আওয়ামী লীগকে ত্রাণ সহায়তা দিতে দলীয় তহবিলে হাত দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়া এ দলকে সহযোগিতা করার বা অনুদান দেওয়ার জন্য অনেকেই প্রস্তুত রয়েছে। কারও কাছে আমাদের অনুদানের জন্য হাত পাততে হয় না। দলীয় নেতাকর্মী ও শুভানুধ্যায়ীরা স্বেচ্ছায় অনুদান দিয়ে থাকেন।
আওয়ামী লীগের দফতর সম্পাদক ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, স্থানীয় পর্যায়ে দলীয়ভাবে ত্রাণ হিসেবে যে খাদ্য ও অর্থ সহায়তা দেওয়া হচ্ছে তার হিসাব কেন্দ্রীয়ভাবে সংরক্ষণ করা হচ্ছে। সর্বশেষ ১৫ মে’র হিসাব অনুযায়ী এক কোটি ২০ লাখ পরিবারকে খাদ্য সহায়তা দেওয়া হয়েছে। নগদ ১০ কোটির বেশি টাকা সহায়তা হিসেবে দেওয়া হয়েছে। দলের এই সহায়তা অব্যাহত রয়েছে। ঈদের পর আবারও সমন্বয় করে আমরা এটা গণমাধ্যমকে জানিয়ে দেবো।
নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, আওয়ামী লীগের দলীয় তহবিলে বর্তমানে (১ জানুয়ারি ২০১৯) ৩৭ কোটি ৫৭ লাখ ৭৮ হাজার ৫৮৭ টাকা রয়েছে। গত বছর ৩১ জুলাই দলটি নির্বাচন কমিশনে এই হিসাবটি জমা দেয়। হিসাব মতে, ২০১৮ সালের পঞ্জিকা বছরে দলের আয় হয়েছে ২৪ কোটি ২৩ লাখ ৪২ হাজার ৭০৭ টাকা। ব্যয় হয়েছে ১৮ কোটি ৮৭ লাখ ৮০ হাজার ৫৫৭ টাকা। ওই বছরে দলটির উদ্বৃত্ত ছিল পাঁচ কোটি ৩৫ লাখ ৬২ হাজার ১৫০ টাকা। পূর্বের স্থিতিসহ ২০১৯ সালের ১ জানুয়ারি দলটির তহবিলে ৩৭ কোটি ৫৭ লাখ ৭৮ হাজার ৫৮৭ টাকা দাঁড়িয়েছিল। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুযায়ী ২০১৯ সালের হিসাব আগামী ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে নির্বাচন কমিশনে জমা দিতে হবে আওয়ামী লীগকে।
আওয়ামী লীগ ও নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, গত কয়েক বছর ধরে দলটির আয় বেড়েই চলেছে। ২০১২ সালের ডিসেম্বরে দলটির হাতে ১০ কোটি টাকার মতো নগদ অর্থ ছিল। গত সাত বছরে দলটির ২৭ কোটির মতো নগদ অর্থ বেড়েছে। এই সময়ে দলটি বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয় ভবন নির্মাণ ও ওই ভবন লাগোয়া কিছু জমি এবং ধানমন্ডিতে দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কার্যালয়ের পাশে একটি ভবন কিনেছে।

/টিটি/এমওএফ/

লাইভ

টপ