নিজেদের পদ-পদবি ইংরেজিতে রেখে অন্যেরটা বাংলায়ন করছে ইসি: অভিযোগ বিএনপির

Send
বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট
প্রকাশিত : ২০:১৪, জুলাই ০১, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২১:৩১, জুলাই ০১, ২০২০

নির্বাচন কমিশন ও বিএনপিনির্বাচন কমিশন নিজেদের পদ-পদবি ও প্রতিষ্ঠানের নাম ইংরেজিতে বহাল রেখে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিনের প্রচলিত ইংরেজি শব্দের পরিবর্তে বাংলায় রূপান্তরকে অনৈতিক বলেছে বিএনপি। রাজনৈতিক দলের নিবন্ধনে খসড়া আইনের বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের চাওয়া মতামতের জবাব দিতে গিয়ে বিএনপি এ অভিযোগ তুলেছে। বিএনপির পক্ষে দলটির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বুধবার (১ জুলাই) নির্বাচন কমিশনে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের পাঠানো এ সংক্রান্ত চিঠি হস্তান্তর করেন। চিঠিতে এই আইন প্রণয়নের উদ্যোগকে স্থগিত করার দাবি জানিয়েছে বিএনপি।

যা আছে বিএনপির চিঠিতে

‘নির্বাচন কমিশন প্রচলিত আইনের মৌলিক বিধানাবলি অক্ষুণ্ন রেখে ইংরেজির পরিবর্তে বাংলায় আইন উন্নয়নের কথা বললেও রাজনৈতিক দলগুলোর ‘নিবন্ধন আইন ২০২০’ রূপে বাংলায় স্বতন্ত্র যে আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তাতে মৌলিক বিধানাবলি অক্ষুণ্ন রাখা হয়নি’, বলে দাবি করেছে বিএনপি। দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে— ‘এই খসড়া নতুন আইন কেবল এটি প্রণয়নের ঘোষিত উদ্যোগের পরিপন্থী নয়, বিশেষ উদ্দেশ্যমূলক।’

দলের মহাসচিবের পাঠানো চিঠিতে বলা হয়, ‘আমাদের দেশসহ সারা বিশ্ব যখন কোভিড-১৯ মহামারিতে বিপন্ন, সরকারি নির্দেশে অফিস-আদালত তথা কাজকর্ম বন্ধ কিংবা নিয়ন্ত্রিত, যখন আইন করে সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ রাখা হয়েছে এবং যখন প্রায় রাজনৈতিক দল সাংগঠনিক এবং

দৈনন্দিন কাজ বন্ধ রেখে আর্তমানবতার সেবায় নিমগ্ন এবং জনগণের সব চিন্তা চেতনায় যখন জীবন ও জীবিকা রক্ষায় নিবদ্ধ, সেই সময় প্রচলিত ইংরেজি শব্দগুলোকে বাংলায় রূপান্তরের নামে অতি গুরুত্বপূর্ণ কিছু নতুন শর্ত সংযোজন করে রাজনৈতিক দলগুলোর নিবন্ধন আইনের মতো একটি বিশেষ রাজনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ আইন প্রণয়নের উদ্যোগ কোনও বিবেচনাতেই স্বাভাবিক কিংবা সমালোচিত নয়। বরং অস্বাভাবিক, অনভিপ্রেত, অগ্রহণযোগ্য এবং মহলবিশেষের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের অপকৌশল বলে মনে করি।’

চিঠিতে আরও বলা হয়, ‘যেকোনও গুরুত্বসম্পন্ন নতুন আইন প্রণয়নে জনমত গ্রহণ সংশ্লিষ্টদের অবারিত মাঠ প্রদানের অধিকার এবং আইনের ভাষা ও শব্দচয়নে সতর্কতা গ্রহণ অতিশয় প্রয়োজনীয় পূর্ব শর্ত। অথচ বিদ্যমান সময়ে এর কোনোটি সম্ভব নয় জানা সত্ত্বেও যে আইন পরিবর্তনের বা স্বতন্ত্র আইন প্রণয়নের কোনও জন-দাবি নেই এবং যা আজ এখনই করা আদৌ জরুরি নয়, এমন একটি কাজ হাতে নেওয়ার জন্য কমিশনের উদ্যোগ অসময়োচিত, সামর্থ্যের অপব্যয় ও সন্দেহজনক।’

‘বিশেষ করে নিজেদের প্রতিষ্ঠানের নাম ‘কমিশন’ এবং পদবিতে ‘কমিশনার’-এর মতো ইংরেজি শব্দ অক্ষুণ্ন রেখে জনগণের কাছে পরিচিত এবং দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এবং যেসব প্রতিষ্ঠানের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নাম/পদবি পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে, তা অনৈতিক ও অপ্রয়োজনীয় বলে মনে করি।’

‘বাংলাদেশের সংবিধানে উল্লিখিত ইংরেজি শব্দের বাংলায়ন—স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, সুপ্রিম কোর্ট, হাইকোর্ট, কমিশন, কমিশনার, অ্যাটর্নি জেনারেল, জুডিশিয়াল কাউন্সিল, কোর্ট অব রেকর্ড, ট্রাইব্যুনাল জেনারেল ক্লজেস অ্যাক্ট ইত্যাদি ইংরেজি শব্দ বহাল রাখা হয়েছে।

নির্বাচন কমিশনের বিভিন্ন আইনেও অনেক ইংরেজি শব্দের বাংলায়ন রয়েছে, যেমন– কমিশন, কমিশনার, রিটার্নিং

অফিসার, প্রিজাইডিং অফিসার, পোলিং অফিসার, ভোট, ভোটার, ওয়ার্ড, ফরম, সিটি করপোরেশন, চেয়ারম্যান, মেম্বার, কাউন্সিলর, পোস্টার, ব্যানার, লিফলেট, হ্যান্ডবিল, ভোটের স্লিপ, হেলিকপ্টার, মাইক্রোফোন, ব্রিজ, কালভার্ট, পে-অর্ডার, ট্রেজারি চালান, রেস্ট হাউজ, রেক্সিন, ডিসপ্লে বোর্ড, রিটার্ন, ব্যালট পেপার, ব্যালট বাক্স, নোটিশ, ট্রেন, ট্রাক, সাইকেল, মোটরসাইকেল, কোর্ট ফি, প্যান্ডেল, ক্যাম্প, অফিস, লাউড স্পিকার, শোডাউন, সার্কিট হাউজ, ডাকবাংলো, ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন ইত্যাদি।’

‘বাংলাদেশের বহু রাজনৈতিক দলের নাম ভিন্ন ভিন্ন ভাষার রয়েছে, যেগুলোকে বাংলায়ন করা হয়নি। যেমন— ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি-ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টি, ওয়ার্কার্স পার্টি, ন্যাশনাল পিপলস পার্টি, আওয়ামী লীগ, অথবা পার্টি, লীগ, ফ্রন্ট, ফোরাম, ফেডারেশন ইত্যাদি। যেকোনও সচেতন নাগরিক সঙ্গতভাবেই প্রশ্ন তুলতে পারেন যে, নির্বাচন কমিশন কি এসব নাম এবং সংবিধান ও প্রচলিত অন্যান্য আইনের ভাষা অশুদ্ধ মনে করে?’

‘বাংলা একাডেমি ব্যবহারিক বাংলা অভিধানে প্রচলিত এসব ইংরেজি শব্দ বাংলা প্রতিশব্দরূপে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। যেমন—চেয়ারম্যান (পৃ. ৪২৫), কাউন্সিলর (পৃ. ২৩৬), সিটি (পৃ. ১১৫১), করপোরেশন (পৃ. ২২৯) ইত্যাদি। আইন প্রস্তাবে নির্বাচন কমিশন আমাদের মাতৃভাষাকে সমৃদ্ধ করার জন্য প্রতিষ্ঠিত ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমি প্রণীত বাংলা অভিধানকে অগ্রাহ্য করার অধিকার রাখে বলেও আমরা মনে করি না।’

নতুন এমন একটি আইন করার ফলে সারা দেশে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো এবং এসব প্রতিষ্ঠানের নির্বাচিত ব্যক্তিবর্গের পরিচিতি ফলক, প্যাড, সিল, সাইনবোর্ড বিভিন্ন ফরম ইত্যাদি পরিবর্তনের জন্য যে বিপুল অর্থ ব্যয় হবে, তা বরং এই সংকটকালে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা ও হতদরিদ্র মানুষের অন্ন জোগান দেওয়ার জন্য ব্যয় করা সুবিবেচনার কাজ হবে বলেও আমরা দৃঢ়ভাবে মনে করি।’

চিঠিতে বলা হয়, ‘প্রস্তাবিত স্বতন্ত্র আইন সম্পর্কে মতামত ৭ জুলাই, ২০২০-এর মধ্যে প্রদানের কথা উল্লেখ থাকলেও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের মহাসচিবকে প্রদত্ত পত্রে পত্র প্রাপ্তির ১৫ দিন অর্থাৎ ১ জুলাই, ২০২০-এর মধ্যে মতামত পাঠানোর কথা বলা হয়েছে, যা অসঙ্গতিপূর্ণ ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রতীয়মান হয়।’

‘আমরা মনে করি, দেশে বিদ্যমান সংকটময় সময় উত্তীর্ণ হওয়ার পর সংশ্লিষ্টজনদের সঙ্গে সময় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করে মতামত গ্রহণ এবং জনমত সংগ্রহ করার মতো পরিবেশ সৃষ্টি না হওয়া পর্যন্ত, এ বিষয়টি চূড়ান্ত করা উচিত হবে না বিধায় প্রাসঙ্গিক নতুন আইন প্রণয়নের কার্যক্রম স্থগিত রাখার জন্য আমরা জোর দাবি জানাচ্ছি।’

‘আশা করি দেশের এই সংকটকালে মোটেও জরুরি নয়, এমন বিষয়ে সময় অপব্যয় না করে কী করে দেশে সত্যিকারের গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পূর্বশর্ত হিসেবে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠান করা যায়, সে লক্ষ্যে নিজেদের সামর্থ্য বাড়ানোর দিকে নির্বাচন কমিশন মনোযোগ দেবে।’

/ইএইচএস/এপিএইচ/এমওএফ/

লাইভ

টপ