X
শনিবার, ২৯ জানুয়ারি ২০২২, ১৫ মাঘ ১৪২৮
সেকশনস

বিএনপিকে ‘পাকিপ্রেম’ ছাড়তে বললেন মেনন

আপডেট : ২৮ নভেম্বর ২০২১, ২০:৫৯

ক্রিকেট খেলাকে কেন্দ্র করে পাকিস্তানের পতাকা ওড়ানোর পক্ষে যুক্তি দাঁড় করানোর চেষ্টা করছে বিএনপি, তাই তাদের পাকিপ্রেমটা দূরে রাখার পরামর্শ দিয়েছেন বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি ও সংসদ সদস্য রাশেদ খান মেনন।

রবিবার (২৮ নভেম্বর) জাতীয় সংসদে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে তিনি এসব কথা বলেন।

রাশেদ খান মেনন বলেন, ‘আমি গতকাল (শনিবার) ফ্লোর চেয়েছিলাম একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে। কারণ, এই হাউজে ক্রিকেট খেলাকে কেন্দ্র করে বিএনপির সংসদ সদস্য হারুনুর রশিদ যে বক্তব্য বলেছিলেন, সেটা কেবল অসত্যই নয়, তিনি তার বক্তব্যে চালাকির সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর ১৯৭৪ সালের জাতিসংঘের বক্তব্যকেও টেনে এনেছিলেন। এটা গুরুত্বপূর্ণ এই যে গণমাধ্যমে এসেছে, তিনি পাকিস্তানি ক্রিকেট দল নিয়ে কথা বলায় সংসদে হইচই হয়েছে। বরং তিনি (এমপি হারুন) যেটা করতে চেয়েছিলেন, সেটা হচ্ছে পাকিস্তানি পতাকা ওড়ানোর পক্ষে যৌক্তিকতা দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছেন।’

শনিবার (২৭ নভেম্বর) সংসদে বিএনপির সংসদ সদস্য হারুনুর রশিদ বলেছেন, ‘বর্তমানে বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট টুর্নামেন্ট হচ্ছে। পাকিস্তান এবং বাংলাদেশ। পাকিস্তান ক্রিকেট টিম বাংলাদেশের সঙ্গে খেলছে। বাংলাদেশ যা-ই খেলুক না কেন, পাকিস্তানের সমর্থকেরা তাদের পতাকা ওড়াচ্ছে। এটাকে কেন্দ্র করে একটা বিব্রতকর অবস্থা তৈরি হয়েছে। এটা নিয়ে বিদ্বেষমূলক কথা বলা হচ্ছে।’

এরকম ঘটনা এখন শুধু নয়, বাংলাদেশ সৃষ্টির পরেও হয়েছিল বলে জানান মেনন। ১৯৭৪ সালে পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোর সফর ঘিরে পরিকল্পিত ঘটনা ঘটানো হয়েছিল বলেও জানান তিনি। মেনন বলেন, ‘আজকে আবার ক্রিকেট খেলাকে কেন্দ্র করে পাকিস্তানের পতাকা ওড়ানোর চেষ্টা হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের দুর্ভাগ্য আজকে স্বাধীনতার ৫০ বছর পার করছি। কিন্তু আজ পর্যন্ত বিএনপি তাদের পাকিস্তানি প্রেম দেখিয়েই যাচ্ছে। আজকেও বক্তৃতায় পাকিস্তান প্রেম দেখলাম। খালেদা জিয়া অসুস্থ, তাকে নিয়ে কথা বলতে চায় না। পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তা জানজুয়ার মৃত্যুতে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শোক প্রস্তাব পাঠিয়েছিলেন। এটা তিনি পারেন না।’

মেনন বলেন, ‘পরিকল্পিতভাবে আমাদের গৌরবের অধ্যায়কে ধ্বংস করার জন্য যে চক্রান্ত চলছে, এর বিরুদ্ধে আমাদের এক হতে হবে। বিএনপিকে বলবো—এখনও সময় আছে, আপনাদের পাকিপ্রেমটা দূরে রাখুন, বাংলাদেশের খেলার মাঠে। খেলা নিয়ে পক্ষ-বিপক্ষ থাকবে। কিন্তু বাংলাদেশে অন্য দেশের পতাকা উড়বে না। তারা উদাহরণ দিয়েছেন—অন্য দেশের খেলার মাঠে বাংলাদেশের পতাকা ওড়ে। হ্যাঁ তোলে, সেখানে কিন্তু বাংলাদেশিরা তোলে। এখানে পাকিস্তানিরা তুললে আমার কোনও কথা ছিল না। এখানে বাংলাদেশের তরুণদের বিভ্রান্ত করা হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘আমি আমার সুবর্ণজয়ন্তীর বক্তব্যে বলেছিলাম—পাকিস্তানের পতাকা ওড়ানোর ঘটনা পরিকল্পিত কিনা, আমি জানি না। আজকে দেখছি, এটা পরিকল্পিত। গত পরশু দিন ভারতের মুম্বাইয়ে সন্ত্রাসী হামলার বার্ষিকীর অনুষ্ঠানে আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রধান অতিথি ছিলেন। তার সামনে বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক বলেছিলেন, মাঠে যে পাকিস্তানি পতাকা ওড়ানোর ঘটনা, তার সঙ্গে পাকিস্তান হাইকমিশন জড়িত। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জঙ্গি উত্থান নিয়ে বলেছিলেন, পাকিস্তানি গোয়েন্দারা জঙ্গি দমন নিয়ে আমাদের বিব্রত করেছেন।’

তিনি বলেন, ‘দেশে বর্তমানে যে জঙ্গি উত্থান রয়েছে, তার সঙ্গে পাকিস্তানের গোয়েন্দারা জড়িত রয়েছে কিনা, আমরা জানি না। ক্রিকেট প্রেম এক জিনিস, জাতীয় প্রেম, গৌরব ও পতাকা আরেক জিনিস। খেলার মাঠে তাদের সমর্থন করতে পারি। কিন্তু তার জন্য তরুণরা পাকিস্তানের পতাকা নিয়ে মাঠে যাবে, তাদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা হচ্ছে। এটা পরিকল্পিত করা হচ্ছে।’

১৯৫ জন পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধীর মুক্তি নিয়ে বঙ্গবন্ধুকে উদ্ধৃতি দিয়ে হারুন যে বক্তব্য দিয়েছিলেন, সেটার সমালোচনা করে মেনন বলেন, ‘এটার একটা প্রেক্ষাপট রয়েছে। সেখানে তিন দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন। সেখানে ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীর প্রসঙ্গ যখন আসে, তখন পাকিস্তানের পক্ষ থেকে প্রস্তাব আসে এবং বলা হয়—আপনারা ফিরিয়ে দিন, আমরা এর বিচার করবো। তখন ড. কামাল হোসেন বলেছিলেন, আপনারা এটা প্রকাশ্য ঘোষণা দিন, তারপর আমরা করবো। তখন পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলন করে বলেছিলেন, সেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হবে। কিন্তু আজ পর্যন্ত সেগুলোর বিচার দূরে থাক, আমাদের এখানে যেসব যুদ্ধাপরাধীর বিচার হয়েছে, তার বিরুদ্ধে তাদের সংসদে নিন্দা প্রস্তাব পাস করেছে। এখন পর্যন্ত যুদ্ধাপরাধীদের আশ্রয় দিয়েই যাচ্ছে।’

সুবর্ণজয়ন্তীর এই সময়ে মুক্তিযুদ্ধের গৌরববোধকে ধ্বংসের প্রচেষ্টা লক্ষ করছি। প্রথমে দেখলাম, বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা একই দিনে করা হয়েছে। আজকে যখন আবারও সংসদে সুবর্ণজয়ন্তীর প্রস্তাব দিচ্ছি, সেই সময়ে ঢাকার মাঠে পাকিস্তানি পতাকা তোলে।’

তিনি বলেন, ‘এখনও পাকিস্তানের সঙ্গে আমাদের অনেক বিষয়ে অমীমাংসিত রয়ে গেছে। তারা আমাদের সম্পদ ফেরত দেয়নি। আমাদের হিসাব দেয়নি।  তাদের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে, এতে সন্দেহ নেই। কিন্তু পাকিস্তান হাইকমিশন যে কাজ করছে, সেটা যথাযথ নয় বলে মনে হয়।’

পাকিস্তান হাইকমিশনের অনুষ্ঠান দেশের শিল্প প্রতিষ্ঠান স্পন্সর করে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের দুর্ভাগ্য হচ্ছে, পাকিস্তান হাইকমিশনে যে অনুষ্ঠান হয়, সেখানে আমাদের শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো স্পন্সর করে। তাদের সেই কার্ডের মধ্যে প্রতিষ্ঠানগুলোর নাম আপনারা দেখতে পারেন। আমরা দেখেছিলাম যুদ্ধাপরাধী সাকা চৌধুরীর বিচারের সময় সাফাই গাওয়ার জন্য লোক দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। বহু কষ্টে তা ঠেকানো গিয়েছিল। এগুলো তো ইতিহাস।’

এর আগে টেরিটোরিয়াল ওয়াটার অ্যান্ড মেরিটাইম বিল-২০২১ নিয়ে জনমত যাচাই-বাছাইয়ের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে বিএনপির দলীয় সংসদ সদস্য হারুনুর রশিদ বলেন, ‘সীমান্ত হত্যা আজকে নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। ভারতের সঙ্গে আমাদের এত বন্ধুত্বের সম্পর্ক, স্বামী-স্ত্রী, রক্তের সম্পর্ক, কেন প্রতিনিয়ত সীমান্ত হত্যা হচ্ছে?’

পরে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেন জাতীয় পার্টির মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু । তিনি বলেন, ‘আমাদের একজন সংসদ সদস্য বলেছেন, ভারতের সঙ্গে আমাদের কীসের রক্তের সম্পর্ক। আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা। সেই সময় প্রশিক্ষণের জন্য ভারতে গিয়েছিলাম। যারা মুক্তিযুদ্ধ দেখে নাই, তাদের দেশটি সম্পর্কে ধারণা নাই। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চে পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বর হামলার পর আমরা ভারতে যাই। ভারত যদি প্রশিক্ষণ, অস্ত্র না দিতো, তাহলে কীভাবে আমরা যুদ্ধ করতাম। তাই দেশটির সঙ্গে আমাদের রক্তের সম্পর্ক কথাটি ঠিক। রক্ত মানে শুধু পৈতৃকভাবে জন্ম নেওয়া নয়। যে আমার জন্য রক্ত দেয়, আমিও তার জন্য রক্ত দিই। এটাই রক্তের সম্পর্ক।’

তিনি বলেন, ‘ভারত সীমান্তে অনেক সময় খুব ছোটখাটো কারণে আমাদের মানুষের ওপর গুলি চালায়, হত্যা করে। এটার প্রতিবাদ আমরা করি। বার্মার সঙ্গে ভারত রোহিঙ্গা ইস্যুতে আমাদের সমর্থন করে না, কোনও পদক্ষেপ নেয় না। সেটার সমালোচনা করি। কিন্তু একাত্তর সালে পাকিস্তানের চেহারা যারা দেখেননি, তারাই পাকিস্তানের প্রেমে পড়ে। যারা পাকিস্তানের প্রেমে কথা বলে, তাদের প্রতি ঘৃণা হয়।’

পরে হারুন তার সংশোধনী বক্তব্যে বলেন, ‘আমি বলেছি স্বামী-স্ত্রী, রক্তের সম্পর্ক। এখানে পাকিস্তান প্রীতির কথা কোথা থেকে এলো। ভারত কর্তৃক আমাদের সীমান্তে মানুষ হত্যা হচ্ছে, কিন্তু সেটার বিচার হয় না।’

সংসদে বিরোধী দলের সংসদ সদস্য বলেছিলেন, যেভাবে আমরা সরকারের পক্ষে কথা বলছি, আমাদের দালাল বলা হয়। এভাবে যদি কথা বলা হয়, তাহলে মানুষের ধারণা হবে—বাংলাদেশে এরা সব ভারতের দালাল।

 

/ইএইচএস/এপিএইচ/এমওএফ/
সম্পর্কিত
গণতান্ত্রিক সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান নব্বইয়ের স্বৈরাচার বিরোধী ছাত্র ঐক্যের
গণতান্ত্রিক সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান নব্বইয়ের স্বৈরাচার বিরোধী ছাত্র ঐক্যের
সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্তির আহ্বান গণঅধিকার পরিষদের
সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্তির আহ্বান গণঅধিকার পরিষদের
জাতিসংঘের অধীনে জাতীয় সরকার গঠনের দাবি ‘বিজেপি’র
জাতিসংঘের অধীনে জাতীয় সরকার গঠনের দাবি ‘বিজেপি’র
গণফোরামের এমপি মোকাব্বিরের মায়ের ইন্তেকাল
গণফোরামের এমপি মোকাব্বিরের মায়ের ইন্তেকাল
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
গণতান্ত্রিক সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান নব্বইয়ের স্বৈরাচার বিরোধী ছাত্র ঐক্যের
গণতান্ত্রিক সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান নব্বইয়ের স্বৈরাচার বিরোধী ছাত্র ঐক্যের
সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্তির আহ্বান গণঅধিকার পরিষদের
সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্তির আহ্বান গণঅধিকার পরিষদের
জাতিসংঘের অধীনে জাতীয় সরকার গঠনের দাবি ‘বিজেপি’র
জাতিসংঘের অধীনে জাতীয় সরকার গঠনের দাবি ‘বিজেপি’র
গণফোরামের এমপি মোকাব্বিরের মায়ের ইন্তেকাল
গণফোরামের এমপি মোকাব্বিরের মায়ের ইন্তেকাল
‘সুষ্ঠু নির্বাচনের সংকট সংবিধানেই’
‘সুষ্ঠু নির্বাচনের সংকট সংবিধানেই’
© 2022 Bangla Tribune