যে কারণে ভাঙলো জাসদ

পাভেল হায়দার চৌধুরী
১৩ মার্চ ২০১৬, ২০:১০আপডেট : ১৩ মার্চ ২০১৬, ২০:৩০

দুই ভাগ হলো জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু ও সাধারণ সম্পাদক শরীফ নুরুল আম্বিয়ার মধ্যে নেতৃত্বের লড়াইকে কেন্দ্র করে আবারও ভেঙে গেছে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ)। শনিবার রাতে বিগত কমিটির সাধারণ সম্পাদক শরীফ নুরুল আম্বিয়ার নেতৃত্বে পাল্টা কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। শনিবার দলটির কাউন্সিল অধিবেশন চলছিল। সেখানে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচন করা নিয়ে একমত না হওয়ায় দলটি আবারও দুই ভাগ হয়ে গেছে।
শনিবার কাউন্সিল অধিবেশন থেকে বের হয়ে যায় দলের একটি বড় অংশ। এরপর প্রেস ক্লাবে গিয়ে শরীফ নুরুল আম্বিয়াকে সভাপতি ও নাজমুল হক প্রধানকে সাধারণ সম্পাদক করে পৃথক কমিটি ঘোষণা করা হয়। এই কমিটির নির্বাহী সভাপতি মঈনুদ্দিন খান বাদল।
অপর দিকে শনিবার রাতে মহানগর নাট্যমঞ্চ সম্মেলন স্থল থেকে তথ্যমন্ত্রী ও জাসদ সভাপতি নিজেকে পুনরায় সভাপতি ও সংসদ সদস্য শিরীন আখতারকে সাধারণ সম্পাদক করে নতুন কমিটি ঘোষণা করেন। এই কমিটির কার্যকরী সভাপতি অ্যাডভোকেট রবিউল আলম।
নেপথ্যের কারণ অনুসন্ধানে জানা গেছে, ইনু ও আম্বিয়ার দীর্ঘদিনের জমাট বাঁধা ক্ষোভ জাসদকে দুই ভাগ করেছে। এক সময় বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকলেও নেতৃত্ব দিতে এসে দুজনের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়। কেউ কাউকে ছাড় দিতে চাননি। তাই সম্মেলনকে মোক্ষম সময় হিসেবে ধরে নিয়ে বিভক্ত হয়েছে জাসদ। ইনু সভাপতি থাকতে চেয়েছেন। আবার শরীফ নুরুল আম্বিয়াও চেয়েছেন সাধারণ সম্পাদক থাকতে। তবে আম্বিয়াকে কোনওভাবেই সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দেখতে চাননি ইনু। জাসদের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পদকে কেন্দ্র করেই মূলত শনিবার রাতে আরেক দফা ভেঙেছে জাসদ। জাসদের কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে। এছাড়া নেপথ্যে আর কিছু কারণ উঠে এসেছে এ ভাঙনের মূলে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে- বঞ্চনা, একনায়কতন্ত্র, অগণতন্ত্রিক আচরণ জাসদকে ভাঙনের মুখে ফেলেছে। আম্বিয়ার নেতৃত্বাধীন অংশটি অভিযোগ তুলেছে ‘পার্টি পলিসিতে’ তাদের অংশের নেতাকর্মীদের নিশ্চিহ্ন করার চক্রান্ত শুরু হয়েছে দীর্ঘদিন ধরেই। তাই দলের আদর্শকে সমুন্নত রাখা ও গণতন্ত্রের চর্চা অক্ষুণ্ন রাখতে সভাপতি ইনুর নেতৃত্ব থেকে বেরিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে তারা।

আম্বিয়ার নেতৃত্বাধীন একাধিক নেতা বলেন, ইনুর নেতৃত্বাধীন জাসদ দুর্বল হতে শুরু করেছে। সমাজতান্ত্রিক ধারণা থেকে বিচ্যুতি শুরু হয়েছে। দলের নেতাকর্মীরা জাসদের এ চেহারা দেখতে চায় না। দলটিকে বাঁচানোর তাগিদ থেকে নতুন নেতৃত্ব যাত্রা শুরু করেছে। এ নেতৃত্ব আবারও মশালের আলো জ্বালাবে।

বেরিয়ে পড়া অংশটি আরও মনে করে, ইনুর নেতৃত্বে জাসদে তারা বঞ্চনার শিকার। তাই ইনুর নেতৃত্বের প্রতি অনাস্থা প্রকাশ করে নতুন কমিটি গঠন করা হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে জাসদ একাংশের কার্যকরী সভাপতি মঈনুদ্দিন খান বাদল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘জাসদকে ভাঙতে চাইনি। হাসুনুল হক ইনু কাঁধের ওপর ভাঙন চাপিয়ে দিয়েছেন। দলীয় সভাপতি হিসেবে তিনি ব্যক্তিগত সম্পর্কের ভিত্তিতে কোনও সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। কিন্তু তিনি তা নিয়েছেন।’

বাদল বলেন, ‘জাসদের ৬ সংসদ সদস্যের ৪ জন আমাদের পক্ষে। এছাড়া দলের স্ট্যান্ডিং কমিটির ১৪ সদস্যের মধ্যে ১০ জনই আমাদের সঙ্গে আছেন।

তবে জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু বলেন, ‘পাল্টা যে কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে, তা গঠণতন্ত্রবিরোধী। তারা সাময়িক উত্তেজনায় গঠনতন্ত্র ভঙ্গ করে রহস্যজনক আচরণ করেছেন।’

তবে এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে একাংশের সভাপতি শরীফ নুরুল আম্বিয়া গঠনতন্ত্র লঙ্ঘনের পাল্টা অভিযোগ তোলেন সভাপতি হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে। তিনি বলেন, ‘অস্বচ্ছতা-অসততা, স্বেচ্ছাচারিতার ফলে জাসদকে ভাঙতে বাধ্য করেছেন তিনি।’

আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের অন্যতম জাসদ। গত জাতীয় নির্বাচনে এ দলটির ৬ জন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। শরীক দল হিসেবে জাসদের সভাপতি হাসানুল হক ইনুকে মন্ত্রিসভায় জায়গা করে দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ইনু মন্ত্রী হওয়ায় প্রথম দিকে জাসদের নেতারা খুশীও হন। কিছু দিন পরে মঈনুদ্দিন খান বাদলকে মন্ত্রিত্ব দিতে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে জাসদের একটি অংশ ইনুর ওপর চাপ প্রয়োগ করে। কিন্তু ইনু জাসদের এই অংশটির এ প্রস্তাব আমলে নেননি।
অভিযোগ আছে- প্রধানমন্ত্রী চাইলেও বাদলকে মন্ত্রিসভায় জায়গা দিতে ইনুর সম্মতি মেলেনি। জাসদের বেরিয়ে যাওয়া অংশটি ইনুর ওপর নাখোশ হয় মূলত এ কারণে। এর ফলে বাদলের বিরাগভাজন হয়ে ওঠেন ইনু। মন্ত্রী হতে না পেরে বাদল ইনুকেই পথের কাঁটা বলে মনে করতে থাকেন।

এদিকে প্রায় ৬ মাস ধরে জাসদের সাধারণ সম্পাদক পদ নিয়ে চরম বিরোধপূর্ণ সম্পর্ক চলছিল ইনু-আম্বিয়ার মধ্যে। শুধু তাই নয়, সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আম্বিয়াকে নিষ্ক্রিয় করতে থাকেন ইনু।
সূত্র মতে, সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দলের কার্যক্রম থেকে আম্বিয়াকে দূরে সরিয়ে রাখতে প্রায় সব কিছুই করেন ইনু। ফলে সাধারণ সম্পাদক পদ নিয়ে ইনু-আম্বিয়ার মধ্যে বিরোধপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি হয়। ধীরে ধীরে তা প্রকট আকার ধারণ করতে থাকে। এক পর্যায়ে আম্বিয়া ভেতরে ভেতরে সমর্থক গোছাতে শুরু করেন।

জানা গেছে, সর্বশেষ সম্মেলনে আম্বিয়াকে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে না রাখার ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন দলটির সভাপতি ও তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু। শিরীন আক্তারকে দলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে প্রায় চূড়ান্ত করেই রাখেন তিনি। ফলে বাদল ও আম্বিয়া দুজনই ইনুর ওপর চরম ক্ষুব্ধ হন। দুজনই একমত হয়ে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নাজমুল হক প্রধানকে জাসদের কাউন্সিল অধিবেশনে প্রার্থী করেন।

শিরীন আখতারকে জেতাতে সারাদেশে ইনুর অনুসারীদের কাউন্সিলর ও ডেলিগেট করা হয়। এসব বিষয় আগেই আঁচ করতে পারে আম্বিয়া গ্রুপ। শনিবার সম্মেলনের শেষ পর্যায়ে বিদ্রোহ প্রকাশ করে তারা বেরিয়ে গিয়ে রাতেই জাতীয় প্রেস ক্লাবে পৃথক কমিটি ঘোষণা করেন।

সূত্র আরও জানায়, আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের সঙ্গে থেকে দলটির অস্তিত্ব বিলীন হয়ে পড়ছে বলেও জাসদের বেরিয়ে পড়া অংশটি মনে করে। এসব বিষয় নিয়ে ইনুকে বার বার তাগিদ দিলেও সভাপতি হিসেবে ইনু তা আমলে না নিয়ে বরং নিজের মন্ত্রিত্ব টিকিয়ে রাখতে জাসদকে ব্যবহার করতে থাকেন। এতে করে বেরিয়ে পড়া অংশটির ভেতরে ক্ষোভ জমতে থাকে।

/এজে/

সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
যেখানে সকালে বারান্দায় এলেই দেখা মেলে জোড়া রংধনুর
যেখানে সকালে বারান্দায় এলেই দেখা মেলে জোড়া রংধনুর
সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরের আড়ালে কী
সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরের আড়ালে কী
গরমে শিশুর সুরক্ষা: সামান্য ভুলও ডেকে আনতে পারে বড় বিপদ
গরমে শিশুর সুরক্ষা: সামান্য ভুলও ডেকে আনতে পারে বড় বিপদ
থানার ভেতরে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে পিটিয়ে আহত, ৩ পুলিশ প্রত্যাহার
থানার ভেতরে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে পিটিয়ে আহত, ৩ পুলিশ প্রত্যাহার
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম