গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি বলেছেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের পরিবার এবং আহতদের দায়িত্ব নিতে অন্তর্বর্তী সরকার কেন ব্যর্থ হয়েছে, তার ব্যাখ্যা আগামী ৫ আগস্টের মধ্যে জানাতে হবে। তিনি বলেন, ‘আমরা অনেক লক্ষণ দেখছি, যেন পুরনো ব্যবস্থাই আবার আমাদের মধ্যে জায়গা করে নিচ্ছে। আমরা দেখলাম, শহীদদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদা এখনও দেওয়া হয়নি। আহতদের চিকিৎসা এখনও হয়নি।’
শুক্রবার (১ আগস্ট) গণসংহতি আন্দোলন কেন্দ্রীয় কমিটির উদ্যোগে মাসব্যাপী কর্মসূচির অংশ হিসেবে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে অনুষ্ঠিত গণসমাবেশে এসব কথা বলেন তিনি।
গণসমাবেশে সভাপতিত্ব করেন গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি।
জুলাই গণসমাবেশ উদ্বোধন করেন বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনের ঢাকা মহানগরের সাংগঠনিক সম্পাদক শহীদ জুলফিকার আহমেদ শাকিলের মা ফাতেমা বেগম। শহীদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করে শুরু হয় সভা।
বক্তব্য রাখেন আহত জুলাইযোদ্ধা আমিনুল ইসলাম ইমন, জামাল হোসেন, লিটন হোসেন, শহীদ ওসমান পাটোয়ারির বাবা আব্দুর রহমান প্রমুখ।
সমাবেশে আরও বক্তব্য রাখেন গণসংহতি আন্দোলনের নির্বাহী সমন্বয়কারী আবুল হাসান রুবেল, রাজনৈতিক পরিষদের সদস্য ও সংবিধান সংস্কার কমিশনের সদস্য ফিরোজ আহমেদ, দেওয়ান আব্দুর রশিদ নীলু, বাংলাদেশ গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতির কেন্দ্রীয় সভাপ্রধান তাসলিমা আখতার, হাসান মারুফ রুমী, কেন্দ্রীয় সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য মনির উদ্দীন পাপ্পু এবং বাংলাদেশ বহুমুখী শ্রমজীবী ও হকার সমিতির সভাপতি বাচ্চু ভুঁইয়া, দীপক রায়, নারায়ণগঞ্জ জেলার সমন্বয়কারী তরিকুর সুজন, কেন্দ্রীয় সদস্য জুলাই আহত যোদ্ধা মিজানুর রহমান মোল্লা, কেন্দ্রীয় সদস্য ও ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশনের সহসাধারণ সম্পাদক আলিফ দেওয়ান, কেন্দ্রীয় সদস্য এবং নারায়ণগঞ্জ জেলার নির্বাহী সমন্বয়কারী অঞ্জন দাস।
সভাপতির বক্তব্যে জোনায়েদ সাকি বলেন, যে জীবন শেখ হাসিনা আমাদের দিয়েছিলেন, বেঁচে থেকেও মরে যাওয়ার মতো, সে জীবন আবু সাঈদ ও শহীদরা মেনে নিতে প্রস্তুত ছিলেন না। তাই বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন পুলিশের গুলির সামনে।
তিনি বলেন, "৭১-এর শহীদদের রক্তের ঋণ বাংলাদেশ শোধ করতে পারেনি গত ৫৪ বছরে। আমরা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি ৭১ এবং ২৪-এর শহীদদের ঋণ পরিশোধের সংগ্রাম আমরা করবো।"
তিনি বলেন, "মানুষের ঐক্য ফ্যাসিবাদের পতন ঘটিয়েছে। শহীদের রক্তের ঋণ শোধ করার বাংলাদেশ আমরা গড়ে তুলতে পারবো।"
তিনি বলেন, "এক বছর পরেও কেন শহীদ ও আহতদের আর্তচিৎকার শুনতে হবে।"
তিনি বলেন, শেখ হাসিনা লুটপাটের বন্দোবস্ত করতে গিয়ে পুরো রাষ্ট্রকেই দুর্নীতিগ্রস্ত করে ফেলেছিল। এখন নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত প্রতিষ্ঠা করতে হলে এই দুর্নীতির পথ বন্ধ করতে হবে।
নির্বাহী সমন্বয়কারী আবুল হাসান রুবেল বলেন, গণসংহতি আন্দোলন জন্ম থেকেই সংবিধান সংস্কার, নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত কিংবা বাংলাদেশপন্থি রাজনীতির কথা বলে আসছে যা গণঅভ্যুত্থানের ভেতর দিয়ে নতুন করে সামনে এসেছে। বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষের স্বার্থের বাইরে আমাদের আর কোনও স্বার্থ নাই। তিনি আরও বলেন, জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবায়ন করার জন্য মমতাময়ী মায়ের মতো করে যত্ন নিয়ে জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করতে হবে।
ফিরোজ আহমেদ বলেন, ১২ বছর আগে রানা প্লাজা ধ্বসের পরে গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতি ১১৭৫ জন নিহত ও নিখোঁজ শ্রমিকদের ছবিসহ তালিকা তৈরি করেছিল। সাধ্যমতো অর্থ সাহায্য করেছে এবং অনুদান পাইয়ে দিতে সহায়তা করেছে। কিন্তু জুলাই অভ্যুত্থানের ১ বছর পরেও রাষ্ট্র এখনও এ কাজ সম্পন্ন করতে পারে নাই।
তিনি বলেন, সকল সংস্কারের জন্য এত অপেক্ষার দরকার নাই। পুলিশ সংস্কার বা আমলাতন্ত্রের সংস্কার করার জন্য সরকারের নির্বাহী আদেশ যথেষ্ট ছিল।
তাসলিমা আখতার বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের এক বছর পরে এসে দেখতে হচ্ছে অভ্যুত্থানের কৃতিত্বের দাবিদার কে হবেন তা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। তিনি বলেন, এ অর্জন আমাদের সামষ্টিক।
সভায় আরও বক্তব্য রাখেন, ছাত্র ফেডারেশনের সভাপতি মশিউর রহমান খান রিচার্ড, কেন্দ্রীয় সহসাধারণ সম্পাদক এবং টাঙ্গাইল জেলা ছাত্র ফেডারেশন সভাপতি ফাতেমা রহমান বিথী, কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক জুলাই আন্দোলনে কারানির্যাতিত নেতা খুলনার যোদ্ধা শেখ আল আমিন হোসেন, জুলাই আন্দোলনে নারায়ণগঞ্জ জেলার অন্যতম প্রতিরোধ যোদ্ধা এবং ছাত্র ফেডারেশন নারায়ণগঞ্জ জেলার সভাপতি ফারহানা মানিক মুনা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আহ্বায়ক আরমানুল হক।
ছাত্র নেতারা বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের অসমাপ্ত কাজ শেষ করার জন্য তরুণদেরকে প্রধান ভূমিকা পালন করতে হবে। বিপ্লব সম্পন্ন করতে হবে, বৈষম্যের অবসান করতে হবে।
নারী সংহতির সভাপ্রধান জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শ্যামলী শীল বলেন, এ আন্দোলনের অন্যতম প্রধান শক্তি ছিল নারীরা, মায়েরা। মায়েরা পিঠ চাপড়ে আন্দোলনে ঠেলে দিয়েছে— এটাই ছিল আন্দোলনের অন্তর্গত শক্তি। তিনি বলেন, সঠিক রাজনীতি নির্ধারণ করতে হবে।
প্রবাসী সংহতির পক্ষ থেকে বক্তব্য রাখেন নৃবিজ্ঞানী ও অধ্যাপক সায়মা খাতুন।
তিনি বলেন, এক বিরাট ত্যাগ ও বলিদানে ভেতর দিয়ে ফ্যাসিবাদ মুক্ত হওয়ার যে অর্জন তা অনেকখানি ম্লান হয়ে যায় যখন দঙ্গলের রাজত্ব সৃষ্টি হয়, মাজার ভাঙা হয়, নারীদের ওপর হামলা হয়। তিনি আরও বলেন ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনে প্রবাসীদের অসাধারণ সমর্থন ও ভূমিকা ছিল।
যুব ফেডারেশনের সম্পাদক এবং ছাত্র ফেডারেশনের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাহিদ সুজন বলেন, তরুণ যুবাদের প্রাণশক্তি, দক্ষতা ও প্রতিশ্রুতিকে কাজে লাগাতে হবে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত নির্মাণ করতে।









