পঞ্চগড়ের প্রত্যন্ত অঞ্চলের কৃষক বাবার ঘরে জন্ম শরিফুল ইসলামের। বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক বাস্তবতায় এরকম পরিবারের সন্তানদের ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্ন দেখা একটু বাড়াবাড়িই । তারপরও স্বপ্নটা দেখেছিলেন দীর্ঘদেহী শরিফুল। আর তাতে বিস্ময়করভাবে বাবা দুলাল মিয়ার সায়ও পেয়ে যান । স্বপ্ন এবং তাতে বাবার সমর্থন; এই দুই মিলে শরিফুলের পথটা মসৃণ হতে তেমন সময় লাগেনি। সময় লাগেনি বুকপকেটে বিশ্বসেরার স্বপ্ন লালন করতেও।
স্বপ্নটার বয়স অবশ্য বেশি নয়। ২০১৫ সালে মোস্তাফিজুর রহমান যখন মিরপুরে ভারতের বিপক্ষে একের পর এক উইকেট নিয়ে নিস্তব্ধ করে দিচ্ছিলেন প্রতিবেশি দেশের শতকোটি ক্রিকেটপ্রেমীকে, শরিফুলের চোখ তখন ছিলো টেলিভিশনের পর্দায়। মোস্তাফিজের বোলিং-বীরত্ব তার রক্তে তোলে নাচন- 'হতে হবে তার মতো পেসার'। গ্রামে বিদ্যুৎ নেই, টেলিভিশন নেই। মোস্তাফিজের সেই বোলিং-বীরত্ব শরিফুল দেখেছিলেন বাড়ি থেকে ২০ মিনিট দূরের মউমারি বাজারের এক দোকানে।
২০১৬ সালের জেএসসি পরীক্ষায় কৃতকার্য হতে পারেননি। এই ব্যর্থতাই শরীফুলের জন্য শাপেবর হয়ে আসে। 'লেখাপড়ায় দুর্বল' ভাগ্নেকে দিনাজপুরের এক ক্রিকেট একাডেমিতে ভর্তি করে দেন শরিফুলের মামা। সেখানে তার ওপর চোখ পড়ে রাজশাহীর কোচ আলমগীর কবিরের। থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থাসহ শরিফুলকে কিছুদিন অনুশীলন করান তিনি। তাতেই নজর কাড়েন শরিফুল। তার জায়গা হয় রাজশাহী ক্লেমন ক্রিকেট একাডেমিতে। সেখান থেকে সাবেক বাংলাদেশ অধিনায়ক খালেদ মাসুদ ও জহুরুল ইসলামের কল্যাণে শরিফুল চলে আসেন ঢাকায়, খেলেন লিস্ট-এ ও প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট এবং অব্যাহত রাখেন নজরকাড়া পারফরম্যান্স।
দৃষ্টি কাড়তে কাড়তে শরিফুল এখন বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দলের প্রধান পেসার। দক্ষিণ আফ্রিকা যুব বিশ্বকাপে বাংলাদেশের সাফল্য-ব্যর্থতার অনেকখানি নির্ভর করছে শরিফুলের ওপর। বাবা-মাকে গর্বিত করার স্বপ্ন বুকে নিয়েই বিশ্বকাপের বিমানে উঠেছেন শরিফুল।
অনূর্ধ্ব-১৯ যুব বিশ্বকাপে বাংলাদেশের ১৫ যোদ্ধাকে নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হচ্ছে বাংলা ট্রিবিউনে । আজ থাকছে পেসার শরিফুল ইসলামের একান্ত সাক্ষাৎকার−
বাংলা ট্রিবিউন: শুনেছি আপনার কৃষক বাবাই আপনার মধ্যে ক্রিকেট নিয়ে স্বপ্নের বীজ বুনে দেন…
শরিফুল: আমার কৃষক বাবা অনেক কষ্ট করে আমাকে ক্রিকেট খেলার সুযোগ করে দিয়েছেন । অনেক কষ্ট করে আমাকে টাকা দিয়েছেন। সেসব আমি হিসেব করে খরচ করেছি, অনুশীলন করেছি। সবসময় ফোকাসটা ধরে রেখেছি যে একদিন আমাকে ভালো খেলোয়াড় হয়ে তাদের দায় শোধ করতে হবে। বাবা-মায়ের ঋণ তো শোধ করা যায় না। তবুও চেষ্টা করবো বাবাকে আর্থিক কষ্ট থেকে মুক্তি দিতে। আমি চাই না আমার বাবা আরও কষ্ট করুক। তাদের সুখে রাখতে চাই।
বাংলা ট্রিবিউন: দিনাজপুরে কিভাবে ভর্তি হলেন?
শরিফুল: আমি গ্রামের একটা স্কুলে পড়তাম। ছোট থেকেই আমার ক্রিকেটের প্রতি অন্যরকম একটা আকর্ষণ । জেএসসি পরীক্ষার ফেল করার পর আমার মামা আমাকে ২০১৬ সালে দিনাজপুরের একটি একাডেমিতে ভর্তি করে দেন। সাতদিন অনুশীলনের পর রাজশাহীর ক্লেমন ক্রিকেট একাডেমিতে ভর্তি করে দেন আলমগীর কবির স্যার। ওখান থেকে অনূর্ধ্ব-১৮ জেলা দলে ভালো খেলি। স্যারই আমাকে ২০১৭ সালে তৃতীয় বিভাগে সুযোগ করে দেন। সেবারই প্রথম ঢাকায় আসি। এরপর পাইলট ভাই, অমি ভাইদের মাধ্যমে ২০১৮ সালে প্রিমিয়ার লিগ ও জাতীয় ক্রিকেট লিগে খেলার সুযোগ পাই।
বাংলা ট্রিবিউন: টিভিতে মোস্তাফিজের খেলা দেখেই নাকি পেসার হয়ে ওঠার অনুপ্রেরণা পান?
শরিফুল: ঠিক তাই। আমাদের এলাকায় এখনও বিদ্যুতের সংযোগ নেই। তাই মউমারি বাজারে পাকিস্তানের বিপক্ষে মুস্তাফিজ ভাইয়ের অভিষেক ম্যাচটি দেখতে গিয়েছিলাম। যা আমার বাড়ি থেকে ২৫-৩০ মিনিট দূরের পথ। তারপর ভেবে দেখলাম চেষ্টা করলে আমিও তার মতো একজন ফাস্ট বোলার হয়ে উঠতে পারবো।
বাংলা ট্রিবিউন: যাওয়ার আগে মোস্তাফিজের সঙ্গে আলাপ হয়েছে?
শরিফুল: হ্যাঁ । উনি নির্দিষ্ট একটি পরিকল্পনা নিয়ে বোলিং করতে বলেছেন। কন্ডিশন সম্পর্কে ধারনা দিয়েছেন। আমাকে অনুপ্রেরণা দিয়েছেন ।
বাংলা ট্রিবিউন: প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে উঠে এসেছেন, পেছনের সংগ্রাম মনে পড়লে কেমন লাগে?
শরিফুল: আমি সবসময় ভাবি কোথায় ছিলাম, আর কোথায় আছি। স্বপ্নটা অনেক বড়, হারিয়ে যেতে চাই না। আমাকে আরও বড় হতে হবে। জাতীয় দলে খেলতে হবে। একজন বোলারের ডিসিপ্লিন হতে হয়। আমি চেষ্টা করবো সুশৃঙ্খল জীবন যাপন করতে।
বাংলা ট্রিবিউন: বাবা-মাকে নিয়ে আপনার ভাবনা কী?
শরিফুল : বাবাকে নিয়ে গর্ব হয়। আমার বাবা এত কষ্ট করে আমাকে ক্রিকেটার বানানোর চেষ্টা করছেন, তাকে নিয়ে সত্যিই আমি গর্বিত। আমি যখন পঞ্চগড় থেকে আসছিলাম, বাবা আমাকে ১৮ কিলোমিটার বাসে করে এগিয়ে দিয়ে গেছেন। আমাকে বলেছেন পরিবারের কথা, বাইরের কোনও কথা মাথায় নেবে না। তুমি তোমার মতো খেলে যাও। তোমাকে বিশ্বকাপে ভালো খেলতেই হবে। আমরা টিভিতে তোমার খেলা দেখবো। এমনিতে অবশ্য সবাই আমার বাবা-মাকে সম্মান করে । হয়তো ক্রিকেট খেলছি বলেই এই সম্মান পাচ্ছি। বিষয়টি ভাবতে ভালো লাগে।
বাংলা ট্রিবিউন: আর কয়েকদিনের মধ্যেই শুরু হচ্ছে বিশ্বকাপ, আপনি কতখানি প্রস্তুত?
শরিফুল: আমি মানসিক ও শারীরিকভাবে পুরোপুরি প্রস্তুত। বিশ্বকাপে একটা কিছু করে দেখাতে চাই। আমাদের দল চ্যাম্পিয়ন হবে এই বিশ্বাস নিয়েই আমরা বিশ্বকাপের মাঠে নামবো। আমরা যতগুলো সিরিজ খেলেছি সবগুলোতে ভালো করেছি। বিশ্বকাপকে আমরা একটি সিরিজ মনে করেই খেলবো।
বাংলা ট্রিবিউন: বোলিংয়ে আপনার শক্তির জায়গা কোনটা?
শরিফুল: আমার শক্তির জায়গা লাইন-লেন্থে হিট করা। গুডলেন্থে হিট করা। ওখানে হিট করলে সুইং ও বাউন্স পাওয়া যায়। নতুন বলে সব দেশের বোলাররা চায় দ্রুত উইকেট নিতে। আমিও নতুন বলে সেই কাজটা করতে চাই।
বাংলা ট্রিবিউন: আপনার প্রিয় ক্রিকেটার কে?
শরিফুল: সাকিব ভাই ও মিচেল স্টার্ক। সাকিব ভাইয়ের আছে ক্ষুরধার ক্রিকেট মতিষ্ক । ক্রিকেটারদের মতিষ্ক এমন হওয়া উচিত। মাঠে তার আক্রমণাত্মক মনোভাব আমাকে মুগ্ধ করে। তবে আমি মিচেল স্টার্কের মতো পেসার হতে চাই। তার মতো মাঠ কাঁপাতে চাই।
প্রোফাইল
নাম : শরিফুল ইসলাম
ডাক নাম : শরিফুল
জন্ম : ৩ জুন ২০০১
জন্মস্থান : কালিগঞ্জ, পঞ্চগড়
উচ্চতা : ৬ ফুট সাড়ে তিন ইঞ্চি
লেখাপড়া : এইচএসসি দ্বিতীয় বর্ষ
প্রথম ক্লাব : শেখ রাসেল
বর্তমান ক্লাব : শাইনপুকুর ক্রিকেট ক্লাব
বোলিং স্টাইল: বাঁহাতি পেসার
প্রিয় ডেলিভারি : ইনসুইং
প্রিয় মানুষ : মুশফিক
প্রিয় ক্রিকেটার : সাকিব আল হাসান, মিচেল স্টার্ক
প্রিয় বন্ধু : রাকিবুলসহ এলাকার কিছু বন্ধু
ক্যারিয়ারের সেরা মুহূর্ত : নিউজিল্যান্ডে ৫ উইকেট শিকার
ছবি: সাজ্জাদ হোসেন।







