বাংলা ট্রিবিউনকে নাঈমুর রহমানের সাক্ষাৎকার

খেলোয়াড়দের মানসিকতার পরিবর্তন দরকার

রবিউল ইসলাম
২৬ জুন ২০২০, ১৯:৪৪আপডেট : ২৬ জুন ২০২০, ২৩:২০

নাঈমুর রহমান, বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট অধিনায়ক ২০ বছর আগে টেস্ট মর্যাদা পাওয়া বাংলাদেশ হাঁটি হাঁটি পায়ে দুই দশক পূর্ণ করেছে। ২০০০ সালে জুনের  ২৬ তারিখে টেস্ট স্ট্যাটাস পেলেও বাংলাদেশ তাদের প্রথম টেস্ট খেলে ১০ নভেম্বর। ওই টেস্টে বাংলাদেশ দলকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন নাঈমুর রহমান (দুর্জয়) । টেস্ট ক্রিকেটে দুই দশক পূর্তির দিনে বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে কথা বলেছেন বর্তমানে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের নির্বাচিত পরিচালক। সংসদ সদস্য, জাতীয় সংসদে জনতার ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধি।  অতীত-বর্তমান মিলিয়ে অনেক কিছুই উঠে এলো তার কথায়-

বাংলা ট্রিবিউন: ২৬ জুন, ২০০০ সালে লন্ডন থেকে টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার খবরে নিশ্চয়ই আনন্দে ভেসেছিল গোটা দেশ?

নাঈমুর রহমান : অবশ্যই। ওই খবরটা আমাদের জন্য খুবই আনন্দের ছিল। ‘৯৭ সালে আইসিসি ট্রফি জয়ের পর ‘৯৯ বিশ্বকাপে স্কটল্যান্ড ও পাকিস্তানকে হারানোর পর টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার দাবিটা আরও জোরালো হয়। দর্শকদের কারণে বাণিজ্যিকভাবে আইসিসিরও নজর ছিল আমাদের দেশের প্রতি। আমরা যখন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলি, তখন টেস্ট ক্রিকেট স্বপ্নেও চিন্তা করিনি। সত্যি কথা এটাই। আমাদের স্বপ্ন ছিল জাতীয় দলে ভালো খেলে আবাহনী কিংবা মোহামেডানের মতো বড় টিমে খেলবো। বাস্তব অর্থেই টেস্ট খেলার স্বপ্নটা ছিল আকাশ-কুসুম কল্পনার মতো। তারপরও আইসিসি ট্রফি জয়, বিশ্বকাপের সাফল্য, দর্শক সব মিলিয়ে আমাদের টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়া সহজ হয়। ওই সময় বোর্ডে যারা ছিলেন তাদের পাশাপাশি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভূমিকাও ছিল টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার ক্ষেত্র তৈরি করতে। সবকিছুরই একটা শুরু থাকে। ওই সময় যদি আমরা টেস্ট স্ট্যাটাস না পেতাম, তাহলে আমাদের ক্রিকেট আরও পিছিয়ে থাকতো।

বাংলা ট্রিবিউন: টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার পেছনে কূটনৈতিক ভূমিকা ছিল। কিন্তু বর্তমান সময় দেখা যায় কূটনৈতিকভাবে আমরা অনেক দিক থেকেই পিছিয়ে যাচ্ছি, এটা কেন?

নাঈমুর : এখনকার প্রেক্ষাপটের সঙ্গে আগের প্রেক্ষাপট মেলানো যাবে না! অন্য দেশগুলোর এত বেশি ব্যস্ত থাকতে হয়, কূটনৈতিক সম্পর্ক ভালো হলেও সব সময় মনের মতো করে কিছু পাওয়া কঠিন। এখন তো আইসিসি ভবিষ্যৎ ট্যুর প্রোগ্রাম করে। ফলে ওই সূচির বাইরে গ্যাপ বের করে দুই দেশের জন্য দ্বি-পাক্ষিক কোনও সিরিজ আয়োজন করা খুব কঠিন। এখন আগের মতো কূটনৈতিক জোর দিলেই যে অন্য দেশগুলো সুযোগ করে দিতে পারবে, ব্যাপারটা তেমন নয়। টেস্ট স্ট্যাটাসের কথা যদি বলেন, ওই সময়ে বোর্ডে যারা ছিলেন সবার জোর ছিল। এছাড়া মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জগমোহন ডালমিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। কারণ ভারতের সাপোর্টটা খুব পুয়োজন ছিল। সেটা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিজে হ্যান্ডেল করেছেন।

বাংলা ট্রিবিউন: টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার পর নাঈমুর রহমানের টেস্ট ক্রিকেট নিয়ে ব্যক্তিগত ভাবনা কী ছিল?

নাঈমুর: ভাবনা ছিল, টেস্ট খেলতে নামলে আসলে কীভাবে হ্যান্ডেল করবো। প্রতিপক্ষরা অনেক অভিজ্ঞ, তারা দীর্ঘদিন ধরেই টেস্ট খেলছে। আমরা একেবারেই নতুন। টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার আগে, আমরা লংগার ভার্সন ক্রিকেটও ওভাবে খেলি না। আগে আমাদের লংগার ভার্সন ক্রিকেটের অবকাঠামো ছিল দুর্বল। টেস্টের প্রস্তুতির জন্য কোনও কিছুই পারফেক্ট ছিল না। ওর মধ্যেই নিজেদের সামর্থ্য, ইচ্ছে নিয়ে যতটুকু ভালো করা যায়, এগিয়ে যাওয়া যায়, সেই চেষ্টাটাই ছিল সবার মধ্যে।

 বাংলা ট্রিবিউন : আপনি বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট অধিনায়ক। কিন্তু তখনও আপনি জানতেন না, প্রথম টেস্টে আপনিই নেতৃত্ব দেবেন। অধিনায়কত্ব নিয়ে বিশেষ কোন ভাবনা কী ছিল?

 নাঈমুর: টেস্টের অধিনায়ক হবো, হতে পারি-এমন কিছু আমি কখনোই ভাবিনি। তবে আমার চারপাশের মানুষদের কাছ থেকে এমন ভাবনার কথা শুনতাম। আমাকে বলতো, ভবিষ্যৎ অধিনায়ক। এই চিন্তাটা নিজের থেকে কখনো করিনি। তারপরও দেশকে নেতৃত্ব দেওয়ার ইচ্ছে তো সবারই থাকে। যদি দিতে পারি, সেটা তো অবশ্যই গর্বের। আমার আমার খেলোয়াড়ি জীবনে বিভিন্ন জায়গায় নেতৃত্ব দিয়েছি। ওই অভিজ্ঞতা তো ছিল আমার।

বাংলা ট্রিবিউন: টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের প্রথম অধিনায়ক হিসেবে আপনার নাম লেখা থাকবে। এই ভাবনা যখন মাথায় আসে, কতখানি তৃপ্তি পান?

নাঈমুর: এটা আমার ক্যারিয়ারের বিশেষ প্রাপ্তি। যারা আমাকে নিয়ে ভেবেছেন, আমার ওপর আস্থা রেখেছেন তারা অবশ্যই আমার তরফ থেকে ধন্যবাদ পাবেন। এই প্রাপ্তিগুলো মনে আলোড়ন তোলে। মনে হয়, সত্যিই দেশের জন্য কিছু করতে পেরেছি। খেলোয়াড়দের মানসিকতার পরিবর্তন দরকার

বাংলা ট্রিবিউন: টেস্ট ক্রিকেটে দুই দশক পেরোলো বাংলাদেশ, কতখানি প্রত্যাশা পূরণ হয়েছে?

নাঈমুর : অগ্রগতিই বেশি। কারণ ২০ বছরই একরকম ছিল না। টেস্ট স্ট্যাটাস প্রাপ্তির আগে-পরে আমাদের অবকাঠামোগত উন্নতি তেমন ছিল না। তারপরও আমরা ভালো খেলেছি এই ফরম্যাটে। আরও ভালো করা উচিত ছিল, এটা আমরা সবাই জানি। আরও ভালো করলে আরও ভালো লাগতো। শুরুর কয়েক বছর এই ফরম্যাট রপ্ত করতে করতেই আমাদের সময় গেছে। এরপর বর্তমান ব্যাচের সিনিয়র ক্রিকেটাররা আসার পর এই ফরম্যাটে আমরা কিন্তু বেশ ভালো কিছু জয় পেয়েছি। গত ২০ বছরের মধ্যে শেষের কয়েক বছরে আমাদের টেস্টের সংখ্যা বেড়েছে। বাকি ১৫ বছর আমরা বছরে কয়টি টেস্টই আর খেলতাম! তারপরও র‌্যাঙ্কিংয়ে আরও একধাপ এগিয়ে থাকতে পারলে সবচেয়ে ভালো হতো।

বাংলা ট্রিবিউন: টেস্টের উন্নতির জন্য কী করা উচিত?

নাঈমুর : আমরা সংক্ষিপ্ত ফরম্যাটের ক্রিকেটটা ভালো খেলছি। এই ফরম্যাটে ক্রিকেটারদের মনোযোগ বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বোর্ডের কিছু ভূমিকা আছে। বোর্ড চেষ্টা করছে এই ফরম্যাটে দলের উন্নতি করার। লংগার ভার্সন এখন দারুণ প্রতিদ্বন্ধিতাপূর্ণ হচ্ছে। অনেক সময়ই দেখা যায় আমরা জাতীয় দলের সেরা খেলোয়াড়দের পাই না লঙ্গার ভার্সনে। তাদেরও আন্তরিকতা বাড়াতে হবে। বাধ্যতামূলক করা থাকলেও সেটা হচ্ছে না। অনেকেরই ব্যক্তিগত এন্ডোর্সমেন্ট বা প্রয়োজনীয় সময় হিসেবে ঘরোয়া ক্রিকেটের এ সময়টাকে ব্যবহার করতে চায়। এটা একটা বড় প্রতিবন্ধকতা।

বাংলা ট্রিবিউন: অনেকের অভিযোগ, ঘরোয়া ক্রিকেটের ক্যালেন্ডার, ক্রিকেট কাঠামো ও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার অভাবে টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশ এগোতে পারছেন না? আপনি কী বলবেন?

 নাঈমুর : এসবের কিছু ভূমিকা আছে। কিন্তু অনেক সময় ক্যালেন্ডার করেও কোনও লাভ হয় না। দেখা গেল বোর্ড ক্যালেন্ডার করলো, ক্লাবগুলো রাজি হলো না। ক্লাবগুলো রাজি হলে স্পনসর আবার রাজি হয় না। সব ঠিক থাকলেও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ব্যস্ততার কারণে জাতীয় দলের ক্রিকেটারদের আবার পাওয়া যায় না। সবকিছু মিলিয়ে আসলে ক্যালেন্ডার বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় না। টেস্ট ক্রিকেটের প্রস্তুতির জন্য প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটের কোনও বিকল্প নেই। ফলে এর কাঠামো শক্তিশালী হওয়াটা গুরুত্বপূর্ণ। এই কাঠামোর সঙ্গে সংগঠক, বোর্ড, খেলোয়াড় সবাই জড়িত। খেলোয়াড়দেরও কিন্তু লংগার ভার্সনের প্রতি আন্তরিকতা কম। অনেক সময় দেখা যায় ফ্রি থাকার পরও অন্য ব্যস্ততার কারণে খেলোয়াড়েরা প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট খেলতে চান না। আমি মনে করি খেলোয়াড়দের মানসিকতার পরিবর্তন দরকার।

বাংলা ট্রিবিউন: করোনার কারণে অনেকগুলো টেস্ট স্থগিত হয়ে গেছে। পরবর্তী সময়ে অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে টেস্টগুলো আয়োজন করতে কূটনৈতিক ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ?

নাঈমুর : স্থগিত হওয়ার পেছনে কারোরই কোনও হাত নেই। ভবিষ্যতে দুই দেশ আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে ম্যাচগুলো ঠিক করবে। এখানে আমাদের ভূমিকা তো নিতেই হবে। আমরা কোনও দেশকে তো চাপ দিয়ে আনতে পারবো না। ওদের মাথায়ও থাকবে বিষয়টি। যেহেতু এটা টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের অংশ, এখানে কেউ চাইলেও অবহেলা করতে পারবে না। ম্যাচগুলো পরে সুবিধাজনক সময়ে হলেও খেলতে হবে।

 

/আরআই/পিকে/
সম্পর্কিত
২০০ টাকায় দেখা যাবে বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়া সিরিজ
টেইটের জায়গায় তালহা জুবায়ের, প্রশংসায় ভাসালেন হান্নান সরকার 
পদত্যাগ করেছেন শন টেইট
সর্বশেষ খবর
হবিগঞ্জে নারীর মুখে এসিড নিক্ষেপ, আশঙ্কাজনক অবস্থায় ঢাকায় প্রেরণ
হবিগঞ্জে নারীর মুখে এসিড নিক্ষেপ, আশঙ্কাজনক অবস্থায় ঢাকায় প্রেরণ
বগুড়ায় দই বিক্রি করে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা গুনলেন ব্যবসায়ী 
বগুড়ায় দই বিক্রি করে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা গুনলেন ব্যবসায়ী 
৩৮ বছর বাড়ি ফিরে বিপদে জবেদ, স্ত্রী বললেন স্বামী হিসেবে মেনে নেওয়া সম্ভব নয়
৩৮ বছর বাড়ি ফিরে বিপদে জবেদ, স্ত্রী বললেন স্বামী হিসেবে মেনে নেওয়া সম্ভব নয়
বিপর্যয়ের মুখে সুন্দরবন
বিপর্যয়ের মুখে সুন্দরবন
সর্বাধিক পঠিত
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
আপা ডাকায় নয়, বাসি মিষ্টি পাওয়ায় জরিমানা করেছি
সংবাদ সম্মেলনে ইউএনও মুনমুন নাহার আশাআপা ডাকায় নয়, বাসি মিষ্টি পাওয়ায় জরিমানা করেছি