অল্প বয়সেই বিভিন্ন বন্দরে নোঙ্গর তুলেছিলেন অনূর্ধ্ব-১৯ দলের ওপেনার জয়রাজ শেখ ঈমন। ভর্তি হয়েছিলেন নাট্যদলেও। তবে কোনও কিছুই হওয়া হয়নি তার। কেননা মন-প্রাণ দিয়ে রেখেছিলেন ক্রিকেটে। সেখানেও চেষ্টা চালিয়েছেন পেসার কিংবা লেগ স্পিনার হওয়ার। কিন্তু শেষমেষ হয়েছেন টপ অর্ডার ব্যাটসম্যান। ২০১৩ সাল থেকে যতগুলো টুর্নামেন্টে খেলেছেন সবগুলোতেই ওপেনিং ব্যাটিং করেছেন জয়রাজ শেখ ঈমন। ঘরের মাঠে আসন্ন আইসিসি অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপকে জাতীয় দলে ঢোকার মঞ্চ হিসেবে দেখছেন তিনি।
বাবা-মায়ের নিষেধ অমান্য করে বড় ভাইয়ের ক্রিকেট খেলা দেখেই মূলত তার ক্রিকেটার হয়ে উঠা। তিনবার হাত ভেঙ্গে ক্যারিয়ারের অপমৃত্যু হয়েছে ঈমনের বড় ভাইয়ের। নিজের স্বপ্ন পূরণ না হলেও ছোট ভাইকে দিয়ে নিজের স্বপ্নটা ঠিকঠাক পূরণ করিয়ে নিতে বদ্ধপরিকর ছিলেন ঈমনের বড় ভাই। যদিও মাঝে একবার নাট্যদলে নিয়ে গিয়েছিলেন ছোট ভাইকে।
সেখানে গিয়েও ক্রিকেটেই পড়ে ছিল মন। তখনই বড় ভাই সিদ্ধান্ত নেন ছোট ভাইকে ক্রিকেটারই বানাবেন। মাঝে অবশ্য জয়রাজের বাবার ইচ্ছে ছিলো ছেলেকে কোরানের হাফেজ বানাবেন। শেষমেষ বড় ভাই বাবাকে বুঝিয়ে ঈমনকে নিয়ে যান জেলা স্টেডিয়ামে অনূর্ধ্ব-১৪ ট্রায়ালে। প্রথমবারেই টিকে যান যুব দলের এই ওপেনার।
তবে ব্যাটসম্যান হিসেবে নন, টিকেছিলেন পেসার হিসেবে। কিন্তু অনুশীলনে পেসার জয়রাজকে পছ্ন্দ হয়নি কোচের। তাইতো এবার লেগ স্পিনার হওয়ার চেষ্টা করেন তিনি। সেখানেও খুব একটা সফল হননি। এরপর শুরু হয় ব্যাটিংয়ে মনোনিবেশ। ২০০৯ সালে বিকেএসপিতে ভর্তি করিয়ে দেওয়া হয় জয়রাজ শেখ ঈমনকে। ব্যাটিং প্রতিভা দিয়েই অনূর্ধ্ব-১৫, অনূর্ধ্ব-১৭ জাতীয় দল হয়ে অনূর্ধ্ব-১৯ দলের দরজা খুলে যায় তার সামনে। ২০১৪ যুব বিশ্বকাপে খেলার অভিজ্ঞতা এবারে ঘরের মাঠের বিশ্বকাপে কাজে লাগাতে চান জয়রাজ শেখ ঈমন। তার বিশ্বাস ভাগ্যের সামান্যতম সহায়তা পেলেও ট্রফিটা নিজের দেশে রেখে দিতে পারবেন।
গত বিশ্বকাপে খেলার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের জয়ে ভূমিকা রাখতে চান তিনি। চেষ্টা করবেন এই টুর্নামেন্টে সেরা ৫ ব্যাটসম্যানদের একজন হতে। বিরাট কোহলি তার প্রিয় ক্রিকেটার; কারণ কোহলির আক্রমণাত্মক খেলা ঈমনের ভালো লাগে। অন্যদিকে লিটনের দাসের ব্যাটিং স্টাইলেও মুগ্ধ তিনি। যে বাবা চাননি তিনি ক্রিকেটার হন সেই বাবাই এখন স্বপ্ন দেখেন ছেলে জাতীয় দলে খেলবে। সেই স্বপ্ন ছুঁয়ে যায় জয়রাজ শেখ ঈমনকেও। তাইতো আসন্ন বিশ্বকাপে ভালো খেলে জাতীয় দলে ঢোকার রাস্তাটা তৈরি করে রাখতে চান তিনি।
আইসিসি অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে বাংলাদেশের ১৫ যোদ্ধাকে নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হচ্ছে বাংলা ট্রিবিউনে। আজ রবিবার থাকছে টপ অর্ডার ব্যাটসম্যান জয়রাজ শেখ ঈমনের একান্ত সাক্ষাৎকার :-
বাংলা ট্রিবিউন: কিভাবে ক্রিকেট এলেন?
জয়রাজ শেখ ঈমন: বাবার চাকরির কারণে টাঙ্গাইল থেকে আমাদের ময়মনসিংহে থাকতে হতো। ওখানে আমার বড় ভাই ক্রিকেট খেলতেন। তিনি অনূর্ধ্ব-১৬ পর্যন্ত খেলেছিলেন। এরপর হাত ভেঙ্গে যাওয়ার কারণে খেলা হয়নি তার। বড় ভাইয়ের খেলা দেখেই মূলত ক্রিকেটের প্রতি ভালোবাসা জাগে। যদিও বাবা চেয়েছিলেন আমাকে হাফেজ বানাবেন। বড় ভাই অবশ্য একবার ভেবেছিলেন অভিনেতা বানাবেন। পরে অবশ্য সপ্তম শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় টাঙ্গাইল স্টেডিয়ামে ট্রায়াল দিতে যাই। ওখানে ৪২ জনের মধ্যে আমি টিকে যাই। । এরপর ২০০৯ সালে বিকেএসপিতে ভর্তি হই। এরপর আস্তে আস্তে অনূর্ধ্ব-১৫ ও অনূর্ধ্ব-১৭ ক্রিকেট খেলে অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেট দলে আসা।
বাংলা ট্রিবিউন: আর মাত্র অল্প কয়েকদিন বাকি; প্রস্তুতিটা কেমন আপনাদের?
জয়রাজ শেখ ঈমন: দলের প্রস্তুতি অনেক ভালো। আমরা দল হিসেব খুব ভালো ক্রিকেট খেলছি। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সিরিজ জিতে আমাদের আত্মবিশ্বাসটা অনেক বেড়েছে। কোনও ম্যাচেই আমরা জয় ভিন্ন অন্য কোনও পরিকল্পনা করছি না। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে প্রত্যেকটি ম্যাচ ডমিনেট করে জিতেছি। এই সিরিজ থেকে আত্মবিশ্বাস নিয়ে আমরা বিশ্বকাপে ভালো কিছু করতে পারবো বলে আশাবাদী।
বাংলা ট্রিবিউন: নিজের প্রস্তুতি কেমন দেখছেন?
জয়রাজ শেখ ঈমন: দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে হোম সিরিজ আমি খেলতে পারিনি। তখন আমার এইচএসসি পরীক্ষা ছিলো। জাতীয় লিগ খেলার সময় আমি ইনজুরিতে পড়ি। আমার অ্যাঙ্কেলে ইনজুরি হয়। এরপর থেকে ব্যাটিংটা একটু এলোমেলো হয়ে গিয়েছিল। ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজেও ব্যাটিংটা সেভাবে ভালো হয়নি। আশা করি সামনে যে কয়দিন আছে চেষ্টা করবো সমস্যাগুলো সমাধান করার।
বাংলা ট্রিবিউন: ওপেনিংয়ে কি বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন?
জয়রাজ শেখ ঈমন: গত বিশ্বকাপের পর থেকে আমি সবগুলো ম্যাচেই ওপেন করেছি। তার আগে অবশ্য ৩ নাম্বারে আমাকে খেলতে হয়েছে। ওই জায়াগাতেই আমি বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। আশা করি দলের চাহিদা পূরণ করতে পারবো।
বাংলা ট্রিবিউন: ব্যক্তিগত কোনও লক্ষ্য স্থির করেছেন কিনা?
জয়রাজ শেখ ঈমন: এমন কোনও টার্গেট সেট করিনি। তবে চাই দলের স্কোরে ভূমিকা রাখতে। যেহেতু শেষ বিশ্বকাপে দলে ছিলাম কিছু অভিজ্ঞতা আমার আছে। চেষ্টা করবো ওই অভিজ্ঞতা এই বিশ্বকাপে কাজে লাগানোর। চেষ্টা করবো সেরা ৫ ব্যাটসম্যানদের তালিকায় থাকার।
বাংলা ট্রিবিউন: কী স্বপ্ন দেখেন?
জয়রাজ শেখ ঈমন: আমার বাবার খুব শখ জাতীয় দলের জার্সিতে তিনি আমার খেলা দেখবেন। স্বপ্ন দেখি যত তাড়াতাড়ি পারি তার এই স্বপ্নটা পূরণ করার।
বাংলা ট্রিবিউন: প্রতিবারই আমরা ভালো দল থাকি। এবারের দলটাও ভালো। কতটুকু প্রত্যাশা করেন এবারের শিরোপা জেতার?
জয়রাজ শেষ ঈমন: গতবারের বিশ্বকাপের দলটাও অনেক ভালো ছিল। অস্ট্রেলিয়ার কাছে হেরে গিয়ে রান রেটে বাদ পড়ে যাই। আমরা সিরিজগুলোতে ভালো খেলি কিন্তু বিশ্বকাপে গিয়ে হয় না। আশা করি এবার সেটা হবে না। আমরা সেভাবেই পরিকল্পনা করছি যাতে করে একটি ম্যাচও আমাদের হাত ছাড়া না হয়। আশা করি এবার নিরাশ করবো না কাউকে।
বাংলা ট্রিবিউন: ঘরের মাঠে খেলার ফলে চাপে পড়ার চান্স কতটুকু?
জয়রাজ শেখ ঈমন: দেশের মাটিতে খেলা হলে হয়তো কিছুটা চাপ থাকে। দর্শকদের চাপ, মিডিয়ার চাপ মিলিয়ে একটু চাপতো থাকেই। পেশাদার ক্রিকেটের হয়ে উঠতে হলে এগুলো এখন থেকেই শিখতে হবে আমাদের। তবে এটা কিন্তু আমাদের জন্য উৎসাহ হিসেবেও কাজ করবে। সবাই যদি আমাদের চাপ না দিয়ে সাপোর্ট করে তাহলে কিন্তু সম্ভব আমাদের আরও ভালো খেলা। সবার কাছে আমার অনুরোধ সবাই আমাদের সাপোর্ট করবেন, উৎসাহিত করবেন।
বাংলা ট্রিবিউন: কোচিং স্টাফদের কাছ থেকে কতটুকু মোটিভেশন পাচ্ছেন?
জয়রাজ শেখ ঈমন: বাবুল স্যার তার সর্বোচ্চটা দিয়ে আমাদের অনুশীলন করাচ্ছেন। আমাদের যত রকম সুযোগ সুবিধা দেওয়া সম্ভব, তিনি সব করছেন। মানসিক ভাবে উনি আমাদের অনেক সাপোর্ট করছেন। যার ফলে আমাদের ভালোটা বের হয়ে আসছে।
প্রোফাইল
নাম: জয়রাজ শেখ
ডাক নাম : ঈমন
জন্ম: ২১ সেপ্টেম্বর ১৯৯৬
জন্মস্থান: টাঙ্গাইল
উচ্চতা: ৫ ফুট ৭ ইঞ্চি
ওজন: ৬৮ কেজি
প্রথম ক্লাব: নর্থবেঙ্গল ক্রিকেট একাডেমি
বর্তমান ক্লাব: ওল্ডডিওএইচএস
ব্যাটিং স্টাইল: ডানহাতি ওপেনিং ব্যাটসম্যান
প্রিয় শটস : পুল
প্রিয় ক্রিকেটার : বিরাট কোহলি (ভারত) এবং লিটন কুমার দাস (বাংলাদেশ)
ক্রিকেট ছাড়া অন্য প্রিয় খেলা: ফুটবল
প্রিয় বন্ধু : হৃদয়, নিহাদ ও মীম
অবসর কিভাবে কাটান: গান শুনি এবং গাই
ক্যারিয়ারের সেরা মুহূর্ত : গত বিশ্বকাপে আফগানিস্তানের বিপক্ষে সাদমানের সঙ্গে ২১৬ রানের জুটি। ওই ম্যাচে আমরা দশ উইকেটে জিতেছিলেন।
ছবি : সাজ্জাদ হোসেন
/এমআর/







